১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান

সৈয়দ আহমদ খান ও আলীগড় আন্দোলন এবং আন্দোলনের আদর্শ ও উদ্দেশ্য
এই পাঠ শেষে আপনি
  • উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করতে পারবেন;
  • উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের কারণ ব্যাখ্যা করতে পারবেন;
  • গণ-অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত পর্ব সম্পর্কে বলতে পারবেন।

উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট

পাকিস্তানি শাসন-শােষণ, নির্যাতন ও নিষ্পেষণ পূর্ব বাংলার জনগণের উপর যতই বৃদ্ধি পেতে থাকে, ৬-দফা কর্মসূচিভিত্তিক আন্দোলন তত দ্রুত বিস্তার লাভ করে। এ আন্দোলন দমনে আইয়ুব সরকারের ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’র (১৯৬৮) আশ্রয় গ্রহণ এক বিস্ফোরণমুখ পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটায়। এ মামলায় বঙ্গবন্ধুকে এক নম্বর আসামী করা হয়। ঠিক এ সময়ে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র লীগ, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন ও মতিয়া উভয় গ্রুপ), সরকারি ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্র ফেডারেশনের ‘দোলন গ্রুপ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ঐক্যবদ্ধ হয়ে আইয়ুব বিরােধী মঞ্চ কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠনপূর্বক ৬-দফা কর্মসূচির প্রতি সর্বাত্মক সমর্থনসহ ১১-দফা কর্মসূচি ঘােষণা করে, যা আন্দোলনে নতুন গতির সঞ্চার করে।

কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার এবং বঙ্গবন্ধুসহ সকল রাজবন্দীর মুক্তির দাবিতে দেশব্যাপী ছাত্র আন্দোলন আরম্ভ করে। বস্তুত ১৯৬৮ সালের নভেম্বর মাস থেকে ১৯৬৯ সালের মার্চ পর্যন্ত, এ পাঁচ মাস সমগ্র পূর্ব বাংলায় গণবিদ্রোহ দেখা দেয়। একই সময় পশ্চিম পাকিস্তানেও আইয়ুব বিরােধী ছাত্র আন্দোলন গড়ে ওঠে। পূর্ব বাংলায় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হওয়ার পর ১৯৬৯ সালের ৮ জানুয়ারি ঢাকায় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ (৬-দফা পন্থী), ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ), নেজাম-ই-ইসলাম পাটি, জমিয়ত-উল-উলামা-ই-ইসলাম, নিখিল পাকিস্তান মুসলিম লীগ (মমতাজ দৌলতানা), ন্যাশনাল ডেমােক্রেটিক ফ্রন্ট, জামায়াত-ই-ইসলামি, পাকিস্তান আওয়ামী লীগ (নওয়াবজাদা নসরুলাহ খান) -এ ৮টি রাজনৈতিক দল ৮-দফা দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ডেমােক্রেটিক এ্যাকশন কমিটি (DAC-ডাক) গঠন করে। ৮-দফা দাবিনামার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাধীনে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রতিষ্ঠা, প্রাপ্ত বয়স্কদের ভােটাধিকারের ভিত্তিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান, অবিলম্বে জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবসহ সকল রাজনৈতিক বন্দীর মুক্তি ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত ছিল।

ক্ষমতাসীন আইয়ুব সরকারের বিরুদ্ধে এতদিন আন্দোলনে মূলত ছাত্র সমাজের প্রাধ্যন্য ছিল। কিন্তু ১৯৬৯ এর মাঝামাঝিতে অন্যান্য গােষ্ঠী বিশেষতঃ কৃষক, শিল্প শ্রমিক, রাজনৈতিক কর্মী সকলে আন্দোলনে নিজেকে সম্পৃক্ত করে। ফলে আইয়ুব বিরােধী গণ-আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানের রূপ পরিগ্রহ করে।

১৯৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থানের কারণ

গণতন্ত্রের পূর্ণ বাস্তবায়ন, পাকিস্তানি সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের কর্তৃত্ব বিলােপ, পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলের মধ্যকার বিরাজমান অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ, যাবতীয় গণবিরােধী শক্তির মূলােৎপাটন এবং সর্বোপরি স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি লক্ষ্যকে সামনে রেখে ১৯৬৯ সালে যে গণ-অভ্যুত্থানের সূচিত হয় তার প্রধান কারণগুলাে ছিল নিম্নরূপ:

  • ১৯৫৮ সালের ঘােষিত সামরিক শাসনের ফলে পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক মূল্যবােধ বিকাশের পথ রুদ্ধ হয়। পূর্ব বাংলার জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষা পর্যদুস্ত হয় পাকিস্তানি সামরিক বেসামরিক আমলাতন্ত্রের অগণতান্ত্রিক আচরণে। অবরুদ্ধ জনতা ক্ষোভে ফেটে পড়ে, সূচিত হয় গণ-অভ্যুত্থান।
  • পূর্ব বাংলার বাঙালিদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দাবি-দাওয়ার প্রতি পাকিস্তানি শাসকগােষ্ঠীর চরম ঔদাসীন্য ও বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গী বাঙালিদের প্রান্তিকীকরণ করে। ফলে সৃষ্টি হয় গণ-অভ্যুত্থানের।
  • পাকিস্তানে গণবিরােধী ও অশুভশক্তির বিশেষত মৌলিক গণতন্ত্রীদের ক্রমাগত ক্ষমতাবৃদ্ধি ও ক্ষমতার অপব্যবহার ‘রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় জনগণের সত্যিকার প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের সুযােগ বন্ধ ইত্যাদি গণঅভ্যুত্থানকে ত্বরান্বিত করে।
  • পাকিস্তান রাষ্ট্রে পূর্ব বাংলার বাঙালিদের সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে স্বকীয়তা বজায় রাখা দুরূহ হয়ে পড়ে, যা কার্যত উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মুখ্য কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
  • বাঙালিদের স্বার্থের আপােসহীন প্রতিনিধি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও অপর ৩৪ জনের বিরুদ্ধে আইয়ুব সরকারের ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের এবং বিশেষ ট্রাইবুনালে তাদের বিচার অনুষ্ঠান ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানকে অনিবার্য করে তােলে।

গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত পর্ব

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রাত্যহিক কার্যবিবরণী যতই বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত হতে থাকে, বাঙালিরা ততই বিক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে। পূর্ব বাংলার আপামর জনতা ১৪৪ ধারা লঙ্ঘন, কার্ফ ভঙ্গ, পুলিশ-ই.পি.আর-সেনাবাহিনী উপেক্ষা করে রাস্তায় ক্ষোভে ফেটে পড়ে।

চতুর্দিক প্রকম্পিত করে ধ্বনিত হতে থাকে গগনবিদারী শ্লোগান: ‘জেলের তালা ভাঙ্গবাে, শেখ মুজিবকে আনবাে’, ‘তােমার নেতা আমার নেতা, শেখ মুজিব, শেখ মুজিব’, ‘তােমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা ইত্যাদি। ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি পুলিশের গুলিতে ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান (আসাদ)-এর মৃত্যু, ২৪ জানুয়ারি পুলিশের বুলেটে নবকুমার ইনস্টিটিউটের দশম শ্রেণীর ছাত্র মতিউরের মৃত্যু, ১৫ ফেব্রুয়ারি বন্দী অবস্থায় ঢাকার সেনানিবাসে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামী সার্জেন্ট জহুরুল হকের গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হওয়া, ১৮ ফেব্রুয়ারি ই.পি.আর-এর গুলিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও রসায়ন বিভাগের শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহার শাহাদত বরণ ইত্যাদি মর্মান্তিক ঘটনা সমগ্র পূর্ব বাংলায় প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত বিদ্রোহের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে দেয়। আইয়ুব শাসন বিরােধী উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান পায় চূড়ান্তরূপ।

শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু উপাধি প্রদান

আইয়ুব বিরােধী গণঅভ্যুত্থান যখন চূড়ান্ত পর্বে উপনীত, তখন দিশেহারা হয়ে জেনারেল আইয়ুব প্রথমে শেখ মুজিবুর রহমানকে প্যারােল (Parole)-এ মুক্তিদানে তার সম্মতির কথা ঘােষণা করেন। কিন্তু শেখ মুজিব তাতে রাজী হননি।

অবশেষে ২২ ফেব্রুয়ারি জেনারেল আইয়ুব তাকে (শেখ মুজিবুর রহমানকে) নিঃশর্ত মুক্তিদানে ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারে বাধ্য হন। পরের দিন অর্থাৎ ২৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সােহরাওয়ার্দী উদ্যান) লাখাে ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে শেখ মুজিবুর রহমানকে এক ঐতিহাসিক গণসম্বর্ধনা দেওয়া হয়।

এ অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর সহ-সভাপতি তােফায়েল আহমদ কর্তৃক কারামুক্ত শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। অতঃপর ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ জেনারেল আইয়ুব ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হন।

সারকথা

১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৬-দফা কর্মসূচি ঘােষণা করলে বাঙালিদের মধ্যে দ্রুত আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। এর মােকাবেলা করতে আইয়ুব সরকার ১৯৬৮ সালে বঙ্গবন্ধুকে প্রধান আসামি করে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করেন। মামলার অভিযােগ ছিল ভারতের সহযােগিতায় সশস্ত্র পন্থায় পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করা। এ মামলার উদ্দেশ্য ছিল ৬-দফা ভিত্তিক বাঙালিদের স্বাধিকার আন্দোলন নস্যাৎ করা। আইয়ুব সরকারের এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে বাঙালিরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। পূর্ব বাংলার ছাত্র সমাজ ১১-দফা কর্মসূচি দিয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে আইয়ুব – বিরােধী আন্দোলনের অগ্রভাগে এসে দাঁড়ায়।

পুলিশের গুলিতে ছাত্রনেতা আসাদ ও দশম শ্রেণীর ছাত্র মতিউরের মৃত্যু, বন্দী অবস্থায় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামী সার্জেন্ট জহুরুল হককে গুলি করে হত্যা, ই পি.আর -এর গুলিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহার নিহত হওয়ার ঘটনা ইত্যাদি আন্দোলনের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ চতুর্দিকে ছড়িয়ে দেয়। সংঘটিত হয় ৬৯-এর গুঅভ্যুত্থান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সকল আসামীকে নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়াহয় এবং মামলা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। এর কিছুদন পর আইয়ুব সরকারের পতন ঘটে।

১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Scroll to top