সামাজিক সংহতি, সামাজিক বিশৃঙ্খলা, গােষ্ঠীর ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা

বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় শহিদমিনার, জাতীয় স্মৃতিসৌধ এবং সংসদ ভবনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব

সামাজিক সংহতি ও পুনর্গঠন

সমাজবিজ্ঞানীগণ সামাজিক সমস্যা বলতে সামাজিক বিশৃঙ্খলা, অসংগতিকে বুঝিয়েছেন। সামাজিক অসংগতি বা বিশৃঙ্খলার অর্থ ব্যক্তির ওপর সামাজিক রীতিনীতির প্রভাব হ্রাস পাওয়া। অর্থাৎ সামাজিক রীতিনীতি যখন ব্যক্তির আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয় তখন মানুষের নৈতিক অবনতি শুরু হয়। নীতিহীনতা যখন ব্যাপক আকার ধারণ করে তখন গােটা সমাজের ওপর প্রভাব পড়ে এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানে ভাঙন ধরে।

সামাজিক প্রতিষ্ঠানের ভাঙনের ফলে সামাজিক অসংগতি দেখা দেয়। সামাজিক বিশৃঙ্খলার বিপরীত ঘটনা হল সামাজিক শৃঙ্খলা। সামাজিক শৃঙ্খলা সমাজকে টিকিয়ে রাখে এবং সদস্যদের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সংহতি রক্ষা করে। সমাজবিজ্ঞানী কুঈন, বডেন হেপার এবং হাপার-এর মতে সামাজিক অসংগতি বলতে সামাজিক সংগঠনের অভাবকে বােঝায়। তাঁদের মতে সামাজিক সংগঠন সুষ্ঠুভাবে কাজ করলে সামাজিক সংহতি রক্ষিত হয় এবং সমাজের কার্য সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়।

অপরপক্ষে, সামাজিক অসংগতির অর্থ সামাজিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্ষমতায় অভাব ঘটা। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সাধারণ সমাজে নতুন শক্তি জন্ম নেয় যা সমাজের অনিবার্য ভাঙনকে রােধ করে এবং এ পুনর্গঠনের পথ সুগম করে। সামাজিক পুনর্গঠনের অর্থ ঘুণেধরা সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহের পুনরায় সঞ্জীবিত করা নয়; বরং পরিবর্তনশীল সমাজে নতুন নতুন চাহিদা পূরণের জন্য নতুন আচার-আচরণের প্রবর্তন করা বােঝায় যাতে মানুষ পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। এ তৎপরতাকে সমাজবিজ্ঞানীরা সামাজিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়া বলেন।

সামাজিক বিশৃঙ্খলা তথা সামাজিক সমস্যা মােকাবেলায় ব্যক্তি, গােষ্ঠী ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা

সামাজিক সমস্যা বা বিশৃঙ্খলা সমাজজীবনের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি হলেই ব্যক্তি বা গােষ্ঠী সেটা অনুভব করে। কারণ সামাজিক সমস্যা হল সমাজজীবনে এমন একটি অবাঞ্ছিত ঘটনা যা সমাজের বেশির ভাগ লােকের ওপর প্রভাব বিস্তার করে এবং সবাই যৌথভাবে এ থেকে পরিত্রাণ পেতে চায়।

সুতরাং সামাজিক সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে হলে সবারই একযােগে যৌথভাবে কার্যক্রম গ্রহণ করা উচিত। তা না হলে সমস্যা দূর করা একেবারেই অসম্ভব। এখন প্রশ্ন হল একজন ব্যক্তি সামাজিক সমস্যা মােকাবেলায় কতটক ভূমিকা রাখতে পারে ? সমাজের সদস্য হিসেবে একজন ব্যক্তি নিম্নলিখিত ভূমিকা পালন করতে পারে। যথা-

  • সামাজিক সমস্যা যাতে সৃষ্টি হতে না পারে তার জন্য একজন ব্যক্তি সচেতন থাকতে পারে।
  • সে ব্যক্তিগতভাবে সমাজের মূল্যবােধ পরিপন্থী কোনাে কাজে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে পারে।
  • অন্যকেও সামাজিক বিশৃঙ্খলা বা সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি করা থেকে দূরে রাখতে পারে।
  • সামাজিক সমস্যা যাতে সৃষ্টি না হয় সে ব্যাপারে ব্যক্তি সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারে।

গােষ্ঠীর ভূমিকা

কোনাে সমস্যাকেই সামাজিক সমস্যা বলা যাবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তা মােকাবেলার জন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়ােজনীয়তা অনুভূত না হবে। যেহেতু সামাজিক সমস্যা শুধু একজন ব্যক্তির নয়, সেজন্য দলগতভাবে সমাজবাসী তা মােকাবেলা করতে এগিয়ে আসে। এক্ষেত্রে দলীয় কার্যক্রম, দলীয় আন্দোলন, দলীয় পরিকল্পনা ইত্যাদিতে সমাজবাসী ঐক্যবদ্ধ হয়।

বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সমস্যাগুলাে হচ্ছে জনসংখ্যা সমস্যা, অপরাধ ও কিশাের অপরাধ, যৌতুক প্রথা, বেকারত্ব, নিরক্ষরতা ইত্যাদি। ব্যক্তিগতভাবে এসব সমস্যা সমাজ থেকে দূর করা সম্ভ নয়। তাই এসব সমস্যা নিরসনকল্পে দলীয় কার্যক্রম জোরদার করা উচিত। আমরা জানি “দশের লাঠি, একের বােঝা”।

সুতরাং দশ জন যা করতে পারে এক জন তা কিছুতেই পারে না। সুতরাং সামাজিক সমস্যার মােকাবেলায় গঠনমূলক দলীয় অভিজ্ঞতা ও দলীয় প্রচেষ্টার গুরুত্ব অপরিসীম।

প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা

বাংলাদেশের সামাজিক সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশে ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন- অপরাধ ও কিশাের অপরাধীদের সংশােধনের জন্য প্রবেশন, প্যারােল, রিম্যান্ডহােম, কিশাের আদালত, ট্রেনিং স্কুল এবং জেলখানা ইত্যাদি সৃষ্টি হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানগুলাে অপরাধী ও কিশাের অপরাধীদের চরিত্র সংশােধন করতে সাহায্য করে এবং তাদেরকে ভালাে হওয়ার শিক্ষা প্রদান করে। এছাড়া এসব প্রতিষ্ঠান তাদেরকে আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে।

বেকার সমস্যা সমাধানের জন্য তথা যুব উন্নয়নের জন্য যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, পল্লী উন্নয়ন বাের্ড, স্বনির্ভর বাংলাদেশ কার্যক্রম, ব্র্যাক, গ্রামীণ ব্যাংকসহ বিভিন্ন ধরনের বেসরকারি সাহায্য সংস্থা (N.G.0.) রয়েছে। জনসংখ্যা সমস্যা দুরীকরণের জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান, যেমন- পরিবার কল্যাণ ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, জনসংখ্যা শিক্ষা, উপানুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু রয়েছে।

এসব প্রতিষ্ঠানসমূহ সমাজের আর্থ-সামাজিক অবস্থা উন্নয়নের জন্য তাদের কার্যক্রম দিন দিন সম্প্রসারিত করছে। বর্তমানে অনেক বিদেশি সাহায্য সংস্থা বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য হল

  • ভূমিহীন, বেকার ও প্রান্তিক কৃষকদের আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তােলা।
  • সাক্ষরতা দান করা।
  • ঋণসুবিধা প্রদান করে প্রয়ােজনীয় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।
  • নতুন নতুন প্রযুক্তিবিদ্যা প্রয়ােগের মাধ্যমে ক্ষুদ্র প্রান্তিক কৃষকদের কৃষিক্ষেত্রে, হাঁস-মুরগি পালন, মৎস্য চাষ, গবাদিপশু পালন, তাঁত বােনা ইত্যাদিতে সাহায্য করা।
  • জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম পরিচালনা ও প্রশিক্ষণ দান।
  • বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দুঃস্থ অসহায় মহিলাদের জীবিকার পথ করে দেওয়া।
  • মা ও শিশুর স্বাস্থ্যরক্ষাসহ পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করা।
  • এভাবে বাংলাদেশের সামাজিক সমস্যা দূরীকরণে ব্যক্তি, গােষ্ঠী এবং প্রতিষ্ঠান কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারে।
সামাজিক সংহতি, সামাজিক বিশৃঙ্খলা, গােষ্ঠীর ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Scroll to top