সমাজ কাঠামাে, সমাজ কাঠামাের সংজ্ঞা ও সমাজ কাঠামাের উপাদান

বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় শহিদমিনার, জাতীয় স্মৃতিসৌধ এবং সংসদ ভবনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব

সর্ব প্রথম হারবার্ট স্পেনসার জীবদেহের কাঠামাের সঙ্গে সাদৃশ্য খুঁজতে “সমাজ কাঠামাে” প্রত্যয়টি ব্যবহার করেন। এটা একটি বিমূর্ত ধারণা। একে চোখে দেখা যায় না বা স্পর্শ করা যায় না। তবে সমাজের নিজস্ব কাঠামাে বা গড়ন রয়েছে।

সমাজ কাঠামাের সংজ্ঞা

সমাজবিজ্ঞানী ও নৃবিজ্ঞানীগণ বিভিন্নভাবে সমাজ কাঠামাের সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। তবে তারা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সমাজ কাঠামাের সংজ্ঞা দিয়েছেন। প্রখ্যাত নৃবিজ্ঞানী রেডক্লিফ ব্রাউন (Redcliffe Brown) বলেন, “সমাজ কাঠামাে হল সমাজস্থ মানুষের সাথে মানুষের সব ধরনের সামাজিক সম্পর্ক।” এখানে তিনি মানুষের সঙ্গে মানুষের সামাজিক সম্পর্কের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

আরো পড়ুন : ধর্ম (Religion) | ধর্মের উৎপত্তি ও বিকাশ | সমাজ গঠনে ধর্মের ভূমিকা

নৃবিজ্ঞানী নেডেল (Nadel) সমাজের মানুষের সামাজিক ভূমিকার ওপর গুরুত্বারােপ করে বলেন, “সমাজ কাঠামোে হল একটি নির্দিষ্ট জনসমষ্টির বিভিন্ন সদস্যদের পারস্পরিক সম্পর্কের একটা রূপ বিশেষ, যা তাদের ভূমিকার মধ্যদিয়ে প্রতিফলিত হয়।” মার্ক্স (Marx)-এর মতে, উৎপাদন শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্কের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে সমাজ কাঠামাে।

মরিস জিন্সবার্গ সমাজ কাঠামাের একটি গ্রহণযােগ্য সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। তাঁর মতে, “প্রধান প্রধান সামাজিক গােষ্ঠী ও প্রতিষ্ঠানের সমন্বয় হল সমাজ কাঠামাে।” তিনি এ সংজ্ঞায় সমাজস্থ ব্যক্তি, গােষ্ঠী ও প্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

এখন প্রশ্ন হল এসব গােষ্ঠী ও প্রতিষ্ঠানগুলাে কী কী? সমাজবিজ্ঞানী বটোমাের (Bottomore) বলেন যে, এসব গােষ্ঠী ও প্রতিষ্ঠানের যৌগিক সমন্বয়ে সমাজ কাঠামাে গড়ে ওঠে এবং এগুলােকে চিহ্নিত করা খুব একটা কঠিন কাজ নয়।

এ প্রসঙ্গে তিনি সমাজের কতকগুলাে ক্রিয়াশীল পূর্বশর্তের কথা উল্লেখ করেন এবং মনে করেন যে, এগুলাের পারস্পরিক সম্পর্ক ও ভূমিকার যৌগিক সমন্বয়েই সমাজ কাঠামাে গড়ে ওঠে। এ গুলাে হল

  • ভাবের আদান-প্রদান।
  • অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যা উৎপাদন ও বণ্টন-প্রক্রিয়া।
  • পারিবারিক শিক্ষাসহ সমগ্র সামাজিকীকরণ।
  • কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার বণ্টন।
  • সামাজিক প্রথা ও রীতিনীতি যা বয়ঃসন্ধিক্ষণ, বিবাহ, মৃত্যু ইত্যাদিকে ঘিরে গড়ে ওঠে।

সমাজ কাঠামাের উপাদান

একটা চেয়ার, বা একটা বিল্ডিং যেমন কতকগুলাে উপাদান দ্বারা তৈরি, তেমনি সমাজ কাঠামােরও কতকগুলাে উপাদান আছে। একটা বিল্ডিং তৈরি করতে কতকগুলাে উপাদান, যেমন- ইট, বালি, সিমেন্ট, কাঠ, রড প্রভৃতির প্রয়ােজন, তেমনি সমাজ কাঠামাে কতকগুলাে উপাদানের সৃষ্টি। এখন প্রশ্ন হল সমাজ কাঠামাে কী কী উপাদান দ্বারা গঠিত? সমাজ কাঠামাের উপাদানগুলাে নিম্নে বর্ণনা করা হল।

প্রথমত, সমাজবদ্ধ মানুষ ছাড়া কোনাে সমাজের কথা কল্পনাই করা যায় না। প্রত্যেক মানুষ সমাজে বাস করতে গিয়ে নির্দিষ্ট ভূমিকা পালন করে। সুতরাং সমাজস্থ মানুষ ও তাদের ভূমিকাকে সমাজ কাঠামাের উপাদান হিসেবে গণ্য করা যায়। আর এজন্যই নেডেল সমাজের মানুষদের ভূমিকার ওপর ভিত্তি করে সমাজ কাঠামাের সংজ্ঞা প্রদান করেন।

আরো পড়ুন : প্রতিষ্ঠান (Institution) ও বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান ও তাদের ভূমিকা

দ্বিতীয়ত, সমাজে বসবাস করতে গিয়ে, মানুষের চাহিদা পূরণের জন্য, মানুষের আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নানা রকম স্থায়ী ও অস্থায়ী সামাজিক গােষ্ঠীর উদ্ভব হয়েছে। এসব গােষ্ঠীর সৃষ্টি না হলে সমাজের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যেত। সুতরাং নানা ধরনের স্থায়ী ও অস্থায়ী সামাজিক গােষ্ঠী সমাজ কাঠামাের অন্যতম উপাদান।

তৃতীয়ত, সমাজের মানুষের প্রয়ােজনীয় কার্যাবলি সম্পাদনের জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রথা-প্রতিষ্ঠান (institution) গড়ে উঠছে। এসব প্রথা-প্রতিষ্ঠানের ক্রিয়াকর্মের ওপরই সমাজ টিকে আছে। কারণ সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যদিয়েই মানুষের ভূমিকা প্রতিফলিত হয়।

সুতরাং উপরিউক্ত আলােচনা হতে বলা যায় যে, সমাজ গঠিত হয় সমাজের মানুষদের নিয়ে। তারা পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তােলে বিভিন্ন রকম ভূমিকা পালন করে। সামাজিক পরিচিতি ও ভূমিকার ভিত্তিতেই বিভিন্ন ধরনের গােষ্ঠী ও প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। তাই এসব সামাজিক গােষ্ঠী ও প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়েই সামাজিক কাঠামাে সৃষ্টি হয়।

সমাজ কাঠামাে, সমাজ কাঠামাের সংজ্ঞা ও সমাজ কাঠামাের উপাদান

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Scroll to top