সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২১
Home » লাল নীল দীপাবলি বা বাংলা সাহিত্যের জীবন | হুমায়ুন আজাদ [01]
লাল নীল দীপাবলি

লাল নীল দীপাবলি বা বাংলা সাহিত্যের জীবন | হুমায়ুন আজাদ [01]

লাল নীল দীপাবলি বা বাংলা সাহিত্যের জীবন | হুমায়ুন আজাদ [03]

লাল নীল দীপাবলি : যদি তুমি চোখ মেললা বাঙলা সাহিত্যের দিকে, তাহলে দেখবে জ্বলছে হাজার হাজার প্রদীপ; লাল নীল সবুজ, আবার কালােও। হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে রচিত হচ্ছে বাঙলা সাহিত্য। এর একেকটি বই একেকটি প্রদীপের মতাে আলাে দিচ্ছে আমাদের। বুক ভরে যায় সে-আলােকের ঝরনাধারায়; সে-আলােকে ভরে যায় টেবিল, খাতার ধূসর শাদা খসখসে পাতা, পৃথিবী ও স্বপ্নলােক। সাহিত্য হচ্ছে আলাের পৃথিবী, সেখানে যা আসে আলােকিত হয়ে আসে; কালাে এসে এখানে নীল হয়ে যায়, অসুন্দর হয়ে যায় সুন্দর শিল্পকলা।

বাঙলা সাহিত্যকে এমন সুন্দর করে রচনা করেছেন যুগ যুগ ধরে কতাে কবি, কতাে গল্পকার। তাদের অনেকের নাম আমরা মনে রেখেছি, ভুলে গেছি অনেকের নাম। কিন্তু সকলের সাধনায় গড়ে উঠেছে বাঙলা সাহিত্য। সবাই সমান প্রতিভাবান নন, সময় সকলকে মনে রাখে না। সময় ভীষণ হিংসুটে, সে সব সময়ই বসে আছে একেকজন লেখকের নাম তার পাতা থেকে মুছে ফেলতে। এভাবে মুছে গেছে কতাে কবির নাম; কতাে লেখকের মুখের ছবি অকরুণ আঙুলে মুছে ফেলেছে সময়।

কিন্তু এমন অনেকে আছেন সময় যাদের ভােলে না, বরং তাদের নাম সােনার অক্ষরে লিখে রাখে। যেমন বিদ্যাসাগর, মধুসূদন, বিহারীলাল, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দের নাম, বা চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি, মুকুন্দরাম, ভারতচন্দ্র, আলাওলের নাম। এঁরা এতাে বড়াে যে ভােলা যায় না, বরং তাঁদের নাম বার বার মনে পড়ে!

সময় থেমে থাকে না, সময়-নদী গােপনে বয়ে যায়। সাহিত্যও সময়ের সাথে সাথে এগিয়ে চলে। এভাবেই সাহিত্যের বিকাশ ঘটে, তার রূপান্তর সম্পন্ন হয়। বাঙলা সাহিত্যের প্রথম বইটি হাতে নিলে চমকে উঠতে হয়, এটা যে বাঙলা ভাষায় লেখা সহজে বিশ্বাস হয় না। কেননা হাজার বছর আগে আমাদের ভাষাটিও অন্য রকম ছিলাে, তা পরিবর্তিত হতে হতে আজকের রূপ ধরেছে। এক হাজার বছর আগে সাহিত্যও আজকের মতাে ছিলাে না। আজ যে-সব বিষয়ে সাহিত্য রচিত হয়, তখন সে-সব বিষয় নিয়ে কোনাে কবি লিখতেন না।

আরো পড়ুন : লাল নীল দীপাবলি বা বাংলা সাহিত্যের জীবন | হুমায়ুন আজাদ [02]

সময় এগিয়ে গেছে, সাহিত্যের জগতে এসেছে নতুন নতুন ঋতু, এর ফলে বদলে গেছে তার রূপ। বাঙলা সাহিত্যের প্রথম বইটির নাম হলাে চর্যাপদ। এর কবিতাগুলাে ছােটো ছােটো, কবিদের মনের কথা এগুলােতে স্থান পেয়েছে। কিন্তু এর পরেই দেখা দেয় বড়াে বড়াে বই, বিরাট বিরাট তাদের গল্প, এবং কবিরাও মনের কথা বলছেন না, বলছেন মানুষ ও দেবতার গল্প। এর পরে আবার আসে ছােটো ছােটো কবিতা, এগুলােকে আমরা বলি বৈষ্ণব পদাবলি। এগুলােতে প্রবল আবেগ আর মনের কথা বড়াে হয়ে ওঠে। এভাবে সাহিত্য বদলায়। কবিরা চিরকাল একই বাঁশি বাজান না। প্রতিটি নতুন সময় তাঁদের হাতে তুলে দেয় নতুন বাঁশরী ।

বাঙলা সাহিত্য সম্বন্ধে আরাে একটি কথা মনে রাখার মতাে। এ-সাহিত্য জন্ম থেকেই বিদ্রোহী; এর ভেতরে জ্বলছে বিদ্রোহের আগুন। কেননা এ-আগুন? বাঙলা ভাষা ও সাহিত্য সমাজের উঁচুশ্রেণীর লােকের কাছে সহজে মর্যাদা পায় নি। এর জন্মকালে একে সহ্য করতে হয়েছে উঁচুশ্রেণীর অত্যাচার, উৎপীড়ন। দশম শতকে যখন বাঙলা সাহিত্য জন্ম নিচ্ছিলাে, তখন সংস্কৃত ছিলাে সমাজের উঁচুশ্রেণীর ভাষা, তারা সংস্কৃতের চর্চা করতাে। ঠিক তখনি সংগােপনে সাধারণ লােকের মধ্যে জেগে উঠছিলাে বাঙলা ভাষা ও সাহিত্য। সাধারণ মানুষ একে লালনপালন করেছে বহুদিন। সমাজের উঁচুশ্রেণীর লােকেরা সব সময়ই হয় সুবিধাবাদী; যেখানে সুবিধা সেখানে তারা।

তাই জন্মের সময় বাঙলা ভাষা ও সাহিত্য তাদের ভালােবাসা পায় নি, পেয়েছে অত্যাচার। তারপরে মুসলমান আমলে এ-উঁচুশ্রেণী সংস্কৃতের বদলে সেবা করেছে ফারসির, এবং ইংরেজ রাজত্বে তারা আঁকড়ে ধরেছে ইংরেজিকে। অথচ এরা ছিলাে এদেশেরই লােক। তবে বাঙলা ভাষা বিদ্রোহী, অত্যাচারকে পরােয়া করে নি; নিজেকে প্রিয় করে তুলেছে সাধারণ মানুষের কাছে, সাধারণ মানুষের বুকের মধ্যে অগ্নিশিখার মতাে জ্বলেছে। সাধারণ মানুষ একে নিজের রক্তের চেয়েও প্রিয় করে নিয়েছে, এবং একে ব্যবহার করেছে নিজেদের প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে। এর ফলে ভীত হয়েছে উঁচুশ্রেণী, এবং সব কিছুকে পরাজিত করে জয়ী হয়েছে বাঙলা ভাষা ও সাহিত্য।

বাঙলা সাহিত্যের বয়স এক হাজার বছরেরও বেশি। চর্যাপদ হচ্ছে বাঙলা সাহিত্যের প্রথম কাব্যগ্রন্থ বা গ্রন্থ। এটি রচিত হয়েছিল দশম শতকের মধ্যভাগ থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে ৯৫০-১২০০ খ্রিস্টাব্দ]। এরপরে যুগে যুগে কবিরা, লেখকেরা এসেছেন; সৃষ্টি করে গেছেন বাঙলা সাহিত্য। আমরা আজকাল সাহিত্যে দুটি ভাগ দেখে থাকি; এর একটি কবিতা, আর একটি গদ্য, যে-গদ্যে লেখা হয় গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ নাটক আরাে কতাে কী। বাঙলা সাহিত্যের একটি বিরাট অংশ কবিতা; ১৮০০ সালের আগে বাঙলা সাহিত্যে গদ্য বিশেষ ছিলােই না।

এতােদিন ধরে রচিত হয়েছে কেবল কবিতা। কবিতায় লেখা হয়েছে বড়াে বড়াে কাহিনী, যা আজ হলে অবশ্যই গদ্যে লেখা হতাে। ভাবতে কেমন লাগে না যে সেকালে কেউ গদ্যে লেখার কথা ভাবলেন না, সব কিছু গেঁথে দিলেন ছন্দে! সব সাহিত্যেরই প্রথম পর্যায়ে এমন হয়েছে। এর কারণ মানুষ কবিতার যাদুতে বিহ্বল হ’তে ভালােবাসে। সেই কবে যেদিন প্রথম সাহিত্যের আবির্ভাব ঘটেছিলাে, সেদিন লেখকের বুকে তরঙ্গিত হয়ে উঠেছিলাে ছন্দ। তখন মানুষ সাহিত্যে খোঁজ করতাে তা, যা বাস্তব জীবনে পাওয়া যায় না। যে-ভাষায় তারা সারাদিন কথা বলতে, যে-গদ্যে ঝগড়া করতাে, তাতে সাহিত্য হতে পারে একথা তারা ভাবতে পারে নি।

তাই তারা বেছে নিয়েছিলাে এমন জিনিশ, যা প্রতিদিনের ব্যবহারে মলিন নয়, যাতে ছন্দ আছে, সুর আছে। এমন হয়েছে সব দেশের সাহিত্যে; বাঙলা সাহিত্যেও। দশম শতক থেকে অষ্টাদশ শতকের শেষ পর্যন্ত বাঙলা সাহিত্য রচিত হয়েছে কবিতায়, বা পদ্যে। লাল নীল দীপাবলি বাঙলা সাহিত্যের প্রধান সংবাদগুলাে শােনাবে। সব সংবাদ শুনবে বড়াে হ’লে । তখন তােমাদের হাতে আসবে চর্যাপদ, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, বা বৈষ্ণব পদাবলি। হাতে পাবে বাঙলা সাহিত্যের ঐতিহাসিকদের লেখা বড়াে বড়াে বইগুলাে। রবীন্দ্রনাথ তখন তােমার হাতে হাতে ফিরবে; তােমার জন্যে কবিতা গল্প নাটক নিয়ে টেবিলে এসে হাজির হবেন কবি মধুসূদন দত্ত, ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ঔপন্যাসিক শরৎ-বিভূতিমানিক-তারাশঙ্কর, কবি জীবনানন্দ-সুধীন্দ্রনাথ-বুদ্ধদেব, এবং আরাে অনেকে। এবং আসবেন একালের লেখকেরা। তােমার চতুর্দিকে প্রদীপ, মাঝখানে তুমি বসে আছে। রাজা।

বাঙালি বাঙলা বাঙলাদেশ

একজন বাঙালি দেখতে কেমন? বাঙালিরা দেখতে ইংরেজের মতাে ধবধবে শাদা নয়, নয় নিগ্রোর মতাে মিশমিশে কালাে। বাঙালিরা, অর্থাৎ আমরা, তুমি আমি এবং সবাই, আকারে হয়ে থাকি মাঝারি রকমের। আমাদের মাথার আকৃতি না-লম্বা না-গােল, আমাদের নাকগুলাে তীক্ষও নয়, আবার ভোঁতাও নয়, এর মাঝামাঝি। উচ্চতায় আমাদের অধিকাংশই পাচ ফুটের ওপরে আর ছ-ফুটের নিচে। এ হচ্ছে বাঙালিদের সাধারণ রূপ। চারদিকে তাকালে এটা সহজে বােঝা যায়। আমাদের পূর্বপুরুষ কারা; আমরা কাদের বিবর্তনের পরিণতি? আমরা একদিনে আজকের এ-ছছাটোখাটো আকার, শ্যামল গায়ের রঙ লাভ করি নি। আমাদের পূর্বপুরুষ রয়েছে।

নৃতাত্ত্বিকেরা অনেক গবেষণা করে সিদ্ধান্তে এসেছেন আমাদের পূর্বপুরুষ হচ্ছে সিংহলের ভেড়ারা। এরা অনেক আগে সারা ভারতে ছড়িয়ে ছিলাে। আমাদের শরীরের রক্তে তাদের রক্ত রয়েছে বেশি পরিমাণে। তবে আমরা অজস্র রক্তধারার মিশ্রণ : আমাদের শরীরে যুগেযুগে নানা জাতির রক্ত এসে ভালােবাসার মতাে মিশে গেছে। রবীন্দ্রনাথ ‘ভারততীর্থ’ কবিতায় বলেছিলেন, ভারতবর্ষে শক হুন মােগল পাঠান সবাই লীন হয়ে আছে। ঠিক তেমনি বাঙালির শ্যামল শরীরে ঘুমিয়ে আছে অনেক রক্তস্রোত। আমরা ভেচ্ছাদের উত্তরপুরুষ। আদিবাসী সাঁওতাল, মুণ্ডা, মালপাহাড়ি, ওরাও এদের মধ্যেই শুধু নয়, নিম্নবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে, এমনকি উচ্চবর্ণের হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যেও এদের উপাদান প্রচুর পাওয়া গেছে।

ভেড়া রক্তধারার সাথে পরে মিলিত হয় আরাে একটি রক্তধারা। এ-ধারাটি হলাে মঙ্গোলীয়। মঙ্গোলীয়দের চোখের গঠন বড়াে বিচিত্র। তাদের চোখ বাদামি রঙের লাল আভামাখা, আর চোখের কোণে থাকে ভঁজ। বাঙালিদের মধ্যে এরকম রূপ বহু দেখা যায়। এরপরে বাঙালির শরীরে মেশে আরাে একটি রক্তধারা; এদের বলা হয় ইন্দো-আর্য। আর্যরা ছিলাে সুদেহী, গায়ের রঙ গৌর, আকারে দীর্ঘ, আর তাদের নাক বেশ তীক্ষ। অনেক বাঙালির মধ্যে এদের বৈশিষ্ট্যও চোখে পড়ে। এরপরে এদেশে আসে পারস্যের তুর্কিস্তান থেকে শকেরা। এরাও আমাদের রক্তে মিশে যায়। এভাবে নানা আকারের বিভিন্ন রঙের মানুষের মিলনের ফল আমরা। শকদের পরেও বাঙালির রক্তে মিশেছে আরাে অনেক রক্ত। বিদেশ থেকে এসেছে বিভিন্ন সময়ে বিজয়ীরা;—এদেশ শাসন করেছে, এখানে বিয়ে করেছে, বাঙালিদের মধ্যে মিশে গেছে। এসেছে মানুষ আরব থেকে, পারস্য থেকে, এসেছে আরাে বহু দেশ থেকে। তারাও আমাদের মধ্যে আছে।

বাঙালি মুসলমানেরা কিন্তু প্রকৃতই বাঙালি। একালে বাঙালিদের মধ্যে কেউ কেউ নিরর্থক গর্ব করতাে যে তারা এদেশের নয়, তারা অমলিন মরুভূ আরবের। আমাদের মাঝে আরব রক্ত কিছুটা থাকতে পারে, কিন্তু আমরা এ-দেশেরই। আমরা আবহমানকাল ধরে বাঙালি। এদেশে মুসলমানদের আগমনের পরে, অনেকটা এয়ােদশ শতাব্দীর পরে, এদেশের দরিদ্ররা, নিম্নবর্ণের লােকেরা, উৎপীড়িত বৌদ্ধরা মুসলমান হতে থাকে। কেননা মুসলমানরা সে-সময়ে এসেছে বিজয়ীর বেশে। অনেকে বিজয়ী শক্তির মােহে, অনেকে ধর্মের মােহে এবং অধিকাংশ দারিদ্র্য ও অত্যাচার থেকে মুক্তির জন্যে মুসলমান হয়েছে।

এরা জাতিতে বাঙালি আর ধর্মে মুসলমান, যেমন আমরা। আমাদের প্রধান পরিচয় আমরা বাঙালি। তবে বহুদিন বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে কখনাে ঠাণ্ডা, কখনাে উত্তপ্ত লড়াই চলেছে নিজেদের জাতিত্ব নিয়ে। মুসলমানদের একদল, যারা কোনাে রকমে অর্থ ও মর্যাদা লাভ করতে পেরেছিলাে, তারা গর্ব করতে ভালােবাসতাে এ বলে যে তারা এদেশের নয়, তারা আরবইরানের। এরা ছিলাে অনেকটা গৃহহীনের মতাে, বাস করতাে এদেশে, খেতাে এদেশের মাছভাত, কিন্তু স্বপ্ন দেখতে আরবইরানের। আরাে একটি দল ছিলাে, যারা অর্থ লাভ করতে পারে নি, সমাজের মাতব্বর হতে চায় নি, তারা নিজেদের দাবি করে এসেছে বাঙলার বাঙালি বলে। এ-দু-দলের বিরােধ অনেক দিন ছিলাে, এয়ােদশ শতক থেকে এই সেদিন পর্যন্ত এ-বিরােধে বাঙালি মুসলমানেরা সময় কাটিয়েছে। এজন্যে মধ্যযুগের এক মহৎ কবি রেগে গিয়ে বলেছিলেন, যারা বাঙলায় জন্মে বাঙলা ভাষাকে ঘৃণা করে তারা কেননা এদেশ ছেড়ে চলে যায় না? তারা চলে যাক। এ-কবির নাম আবদুল হাকিম। আমরা আজ এ-সত্য প্রতিষ্ঠিত করেছি, আমরা বাঙালি, বাঙলা আমাদের ভাষা, বাংলাদেশ আমাদের দেশ।

বাঙলা ভাষা কোথা থেকে এলাে? অন্য সকল কিছুর মতাে ভাষাও জন্ম নেয়, বিকশিত হয়, কালে কালে রূপ বদলায়। আজ যে-বাঙলা ভাষায় আমরা কথা বলি, কবিতা লিখি, গান গাই, অনেক আগে এ-ভাষা এরকম ছিলাে না। বাঙলা ভাষার প্রথম বই চর্যাপদ আমরা অনেকে পড়তেও পারবাে না, অর্থ তাে একবিন্দুও বুঝবাে না। কেননা হাজার বছর আগে যখন বাঙলা ভাষার জন্ম হচ্ছিলাে, তখন তা ছিলাে আধােগঠিত। তার ব্যবহৃত শব্দগুলাে ছিলাে অত্যন্ত পুরােনাে, যার অনেক শব্দ আজ আর কেউ ব্যবহার করে না। সেভাষার বানানও আজকের মতাে নয়। কিন্তু চর্যাপদ-এ যে-বাঙলা ভাষা সৃষ্টি হয় তাতে একদিনে হয় নি, হঠাৎ বাঙলা ভাষা সৃষ্টি হয়ে এসে কবিদের বলে নি, আমাকে দিয়ে কবিতা লেখাে।’ বাঙলা ভাষা আরাে একটি পুরােনাে ভাষার ক্রমবদলের ফল। ওই পুরােনাে ভাষাটির নাম ‘প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা।’ এ-প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা মানুষের মুখে মুখে বদলে পরিণত হয়েছে বাঙলা ভাষায়।

ভাষা বদলায় মানুষের কণ্ঠে। সব মানুষ এক রকম উচ্চারণ করে না, কঠিন শব্দ মানুষ সহজ করে উচ্চারণ করতে চায়। এর ফলে পঞ্চাশ কি একশাে বা তার চেয়েও বেশি সময় পরে দেখা যায়, ওই ভাষার অনেক শব্দের উচ্চারণ বদলে গেছে, বানান বদলে গেছে। দেখা যায় কোনাে ভাষায় একশাে বছর আগে যে-সব শব্দ ব্যবহৃত হতাে, সেগুলাের আর ব্যবহার হচ্ছে না। তার বদলে মহাসমারােহে রাজত্ব বসিয়েছে নতুন নতুন শব্দ। এভাবে ভাষা বদলে যায়; এক ভাষার বুক থেকে জন্ম নেয় নতুন এক ভাষা, যার কথা বেশ আগে ভাবাও যেতাে না। কিছু শব্দের বদল দেখা যাক। চন্দ্র একটি প্রাচীন ভারতীয় আর্য বা সংস্কৃত শব্দ। শব্দটি সুন্দর, মনােরম; কিন্তু উচ্চারণ করতে বেশ কষ্ট হয়। মানুষ ক্রমে এর উচ্চারণ করতে লাগলাে ‘চন্দ’। ‘র’ ফলা বাদ গেলাে, উচ্চারণ সহজ হয়ে উঠলাে। এরকম চললাে অনেক বছর। পরে একদা নাসিক্যধ্বনি ন’-ও বাদ পড়লাে, এবং ‘চ’-এর গায়ে লাগলাে আনুনাসিক আ-কার । এভাবে চন্দ্র হয়ে উঠলাে ‘চাদ’। এভাবে কর্ণ’ হয়ে গেলাে ‘কন্ন, এবং তার পরে হয়ে উঠলাে কান’। আরাে কিছু শব্দের বদল দেখা যাক :

  • হাত
  • বউ

শব্দটি প্রথমে ছিল তারপর হয়
আর আজ হথ, হাথ বংশী বংসী
বাঁশী, বাঁশি বহু আলােক আলাে
আলাে নৃত্য ণচ্চ
নাচ ভাষা এভাবে বদলে যায়। প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা দিনে দিনে বদলে এক সময় হয়ে ওঠে বাঙলা ভাষা। ভাষা বদলের কিন্তু নিয়ম রয়েছে; খামখেয়ালে ভাষা বদলায় না। ভাষা মেনে চলে কতকগুলাে নিয়মকানুন। প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা একদিন পরিবর্তিত হয়ে রূপ নেয় ‘পালি’ নামক এক ভাষায়। পালি ভাষায় বৌদ্ধরা তাদের ধর্মগ্রন্থ ও অন্যান্য নানা রকমের বই লিখেছে। পালি ভাষা ক্রমে আরাে পরিবর্তিত হয়; তার উচ্চারণ আরাে সহজ সরল রূপ নেয়, এবং জন্ম নেয় প্রাকৃত ভাষা। এ-বদল একদিনে হয় নি, প্রায় হাজার বছরেরও বেশি সময় লেগেছে এর জন্যে। প্রাকৃত ভাষা আবার বদলাতে থাকে, অনেক দিন ধরে বদলায়। তারপর দশম শতকের মাঝভাগে এসে এ-প্রাকৃত ভাষার আরাে বদলানাে একটি রূপ থেকে উদ্ভূত হয় একটি নতুন ভাষা, যার নাম বাঙলা। এ-ভাষা আমাদের। কেউ কেউ মনে করেন, বাঙলা ভাষার উদ্ভব ঘটেছে সপ্তম শতাব্দীতে। কিন্তু আজকাল আর বাঙলা ভাষাকে এতাে প্রাচীন বলে মনে করা হয় না; মনে করা হয় ৯৫০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি কোনাে সময়ে বাঙলা ভাষার জন্ম হয়েছিলাে।

প্রাচীন এ-বাঙলা ভাষার পরিচয় আছে চর্যাপদ নামক বইটির কবিতাগুলােতে। এর বাঙলা ভাষা প্রাচীন বাঙলা ভাষা, সদ্য জন্ম লাভ করেছে, তার আকৃতি পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে নি। এর ভাষা কেমন কেমন লাগে, এর শব্দগুলাে আমাদের অপরিচিত, এর শব্দ ব্যবহারের রীতি আজকের রীতির থেকে ভিন্ন। এর কবিতাগুলাে পড়ে অর্থ বুঝতে কষ্ট হয়। আলাে অন্ধকারের রহস্য এর ভাষার মধ্যে জড়িয়ে আছে। এজন্যে এর ভাষাকে বলা হয় সন্ধ্যাভাষা’। সন্ধ্যার কুহেলিকা এর পংক্তিতে পংক্তিতে ছড়ানাে।

জন্মের পর থেকে বাঙলা ভাষা পাথরের মতাে এক স্থানে বসে থাকে নি। বাঙলা ভাষা পরিবর্তিত হয়েছে। মানুষের কণ্ঠে, কবিদের রচনায়। এ-বদলের প্রকৃতি অনুসারে বাঙলা ভাষাকে তিনটি স্তরে বিভক্ত করা হয়। প্রথম স্তরটি প্রাচীন বাঙলা ভাষা। এর প্রচলন ছিলাে ৯৫০ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। তারপর দেড়শাে বছর, ১২০০ থেকে ১৩৫০ পর্যন্ত বাঙলা ভাষার কোনাে নমুনা পাওয়া যায় নি। দ্বিতীয় স্তরটি মধ্যযুগের বাঙলা ভাষা। ১৩৫০ থেকে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত যে-ভাষা আমরা পাই, তাই মধ্যযুগের বাঙলা ভাষা। এ-ভাষাও আজকের বাঙলা ভাষার মতাে নয়। তবে তা হয়ে উঠেছে আমাদের আজকের ভাষার অনেক কাছাকাছি। এ-ভাষায় লেখা সাহিত্য অনায়াসে পড়া যায়, বােঝা যায়। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে শুরু হয় আধুনিক বাঙলা ভাষা। আধুনিক বাঙলা ভাষাকেও ইচ্ছে করলে কয়েকটি ভাগে ভাগ করতে পারি।

আজ যে-দেশের নাম বাঙলাদেশ, তার আকৃতি কিন্তু চিরকাল এরকম ছিলাে না। আগে বাঙলাদেশ বিভক্ত ছিলাে নানা খণ্ডে; তাদের নামও ছিলাে নানারকম। কিন্তু বাঙলা বা বঙ্গ’ অথবা বাঙ্গালা’ যে-নামেই একে ডাকি না কেননা, এর নামটি এসেছে কোথা থেকে? এ-দেশের নামের কাহিনী বলেছেন সম্রাট আকবরের সভার এক রত্ন আবুল ফজল। তিনি বলেছেন বঙ্গ’ শব্দের সাথে আল’ শব্দটি মিলিত হয়ে এদেশের নাম হয়েছে বাঙ্গাল’ বা বাঙ্গালা’। আমরা আজ বলি বাঙলা’। ‘আল্ কাকে বলে ? এদেশে আছে খেতের পরে খেত; এক খেতের সাথে অপর খেত যাতে মিলে না যায়, তার জন্যে থাকে আল। আল’ বলতে বাধও বােঝায়। এদেশ বৃষ্টির দেশ, বর্ষার দেশ, তাই এখানে দরকার হতাে অসংখ্য বাঁধের। আল বা বাঁধ বেশি ছিলাে বলেই এদেশের নাম হয়েছে বাঙ্গালা বা বাঙলা। বাঙলা নামের ব্যুৎপত্তিটি একটু কেমন কেমন। বাঙলাদেশ বহু বহু বছর আগে বিভক্ত ছিলাে নানা জনপদ বা অংশে। একেকটি কোমের নরনারী নিয়ে গড়ে উঠেছিলাে একেকটি জনপদ। ওই জনপদের নাম হতাে যে-কোম সেখানে বাস করতাে, তার নামে। কয়েকটি কোমের নাম : বঙ্গ, গৌড়, পু, রাঢ়। এ-কোমগুলাে যে-জনপদগুলােতে বাস করতাে পরে সেজনপদগুলাের নাম হয় বঙ্গ, গৌড়, পুণ্ড্র ও রাঢ়। এগুলাে ছিলাে পৃথক রাষ্ট্র।

প্রাচীনতম কাল থেকে ষষ্ঠ-সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত বাঙলাদেশ ছিলাে এসব ভিন্ন ভিন্ন জনপদে বিভক্ত। একটি রাষ্ট্রে জমাট বাঁধতে এর অনেক সময় লেগেছে। সপ্তম শতাব্দীর আদিভাগে শশাঙ্ক গৌড়ের রাজা হন। তাঁর সময়ে বর্তমানের পশ্চিম বাঙলা প্রথমবারের মতাে ঐক্যবদ্ধ হয়। তারপর বাঙলাদেশে তিনটি জনপদ বড়াে হয়ে দেখা দেয়, অন্যান্য জনপদ সেগুলাের কাছে ম্লান হয়ে যায়। এ-জনপদ তিনটি হচ্ছে পুত্ৰু, গৌড়, রাঢ়। শশাঙ্ক ও পালরাজারা অধিপতি ছিলেন রাঢ়ের অর্থাৎ পশ্চিম বঙ্গের। কিন্তু তাঁদের সময়ে একটি মজার কাণ্ড ঘটে। তারা নিজেদের রাঢ়াধিপতি’ বলে পরিচয় না দিয়ে নিজেদের পরিচয় দিতে থাকেন ‘গৌড়াধিপতি বলে। গৌড় নামে সমগ্র দেশকে সংহত করতে চেয়েছিলেন শশাঙ্ক, পালরাজারা, এবং সেনরাজারা। কিন্তু তাদের চেষ্টা সার্থক হয় নি। কেননা গৌড়ের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলাে বঙ্গ। পাঠান শাসনকালে জয় হয় বঙ্গের; পাঠান শাসকেরা বঙ্গ নামে একত্র করেন বাঙলার সমস্ত জনপদ। ইংরেজদের শাসনকালে বাঙলা নামটি আরাে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। কিন্তু আকারে হয়ে পড়ে ছােটো।

আরো পড়ুন :   লাল নীল দীপাবলি বা বাংলা সাহিত্যের জীবন | হুমায়ুন আজাদ [03]

১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ত্রিখণ্ডিত হয়। বাঙলার একটি বড়াে অংশ হয়ে পড়ে পাকিস্তানের উপনিবেশ। তখন তার নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান। কিন্তু বাঙালিরা বাঙলার এনাম মনেপ্রাণে কখনাে গ্রহণ করে নি। তাই ১৯৭১-এ জন্ম নেয় নতুন বাংলাদেশ। বাঙলা সাহিত্য বাঙলাদেশ, এবং বর্তমানে যাকে পশ্চিম বাঙলা’ বলা হয়, তার মিলিত সম্পদ।

বাঙলা সাহিত্যের তিন যুগ

দশম শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে রচিত হচ্ছে বাঙলা সাহিত্য। তাই বাঙলা সাহিত্যের বয়স এক হাজার বছরেরও বেশি। এ-সময়ে সৃষ্টি হয়েছে সুবিশাল এক সাহিত্য। সাহিত্য নানা সময়ে নানা রূপ ধারণ করে। কালে কালে নতুন হয়ে সামনের দিকে এগােয় সাহিত্য। হাজার বছরে বাঙলা সাহিত্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক নিয়েছে, এ-বাঁকগুলাে অত্যন্ত স্পষ্ট। হাজার বছরের বাঙলা সাহিত্যকে ভাগ করা হয় তিনটি যুগে। যুগ তিনটি হচ্ছে :

  • প্রাচীন যুগ : ৯৫০ থেকে ১২০০ পর্যন্ত।
  • মধ্যযুগ : ১৩৫০ থেকে ১৮০০ পর্যন্ত।
  • আধুনিক যুগ : ১৮০০ থেকে আজ পর্যন্ত, আরাে বহুদিন পর্যন্ত।

এ-তিন যুগের সাহিত্যই বাঙলা সাহিত্য, কিন্তু তবু বিষয়বস্তুতে, রচনারীতিতে এ-তিন যুগের সাহিত্য তিন রকম। প্রাচীন যুগে পাওয়া যায় একটি মাত্র বই, যার নাম চর্যাপদ। এর ভাষা আজ দুর্বোধ্য, বিষয়বস্তু দুরূহ। এর কবিরা সকলের জন্যে সাহিত্য রচনা করেন নি, করেছেন নিজেদের জন্যে। তাছাড়া সাহিত্য রচনার উদ্দেশ্যও হয়তাে তাদের ছিলাে না। তারা সবাই ছিলেন বৌদ্ধ সাধক; তারা এ-কবিতাগুলােতে নিজেদের সাধনার গােপন কথা বলেছেন। তবু মনের ছোঁয়ায় তাতে লেগেছে সাহিত্যের নানা রঙ ও সৌরভ। এর পরে দেড়শাে বছর বাঙলা ভাষায় আর কিছু রচিত হয় নি। কালাে, ফসলশূন্য এ-সময়টিকে [১২০০ থেকে ১৩৫০] বলা হয় অন্ধকার যুগ। কেননা এ-সময়ে আমরা কোনাে সাহিত্য পাই নি। অন্ধকার যুগের পরে পুনরায় প্রদীপ জ্বলে, আসে মধ্যযুগ। এ-যুগটি সুদীর্ঘ।

এসময়ে রচিত হয় অসংখ্য কাহিনীকাব্য, সংখ্যাহীন গীতিকবিতা; মানুষ আর দেবতার কথা গীত হয় একসাথে। আগের মতাে সাহিত্য আর সীমাবদ্ধ হয়ে থাকে নি, এর মধ্যে দেখা দেয় বিস্তার। এর ফলে সাহিত্যে স্থান পায় দেবতা ও দৈত্য, মানুষ ও অতিমানুষ; আসে গৃহের কথা, সিংহাসনের কাহিনী। এ-সময়ে যারা মহৎ কবি, তাদের কিছু নাম : বড় চণ্ডীদাস, মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, বিজয়গুপ্ত, চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি, জ্ঞানদাস, গােবিন্দদাস, ভারতচন্দ্র, আলাওল, কাজী দৌলত। মধ্যযুগের একশ্রেণীর কাব্যকে বলা হয় মঙ্গলকাব্য। এগুলাে বেশ দীর্ঘ কাব্য। কোনাে দেবতার মর্ত্যলােকে প্রতিষ্ঠার কাহিনী এগুলােতে বলেন কবিরা। এজন্যে মঙ্গলকাব্য দেবতাদের কাব্য। মধ্যযুগের সকল সাহিত্যই দেবতাকেন্দ্রিক, মানুষ সে-সময়ে প্রাধান্য লাভ করে নি। মানুষের সুখদুঃখের কথা এসেছে দেবতার কথাপ্রসঙ্গে। কিন্তু তাতে কিছু আসে যায় না, কেননা দেবতার ছদ্মবেশে এ-সব কাব্য জুড়ে আছে মানুষ।

মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ ফসল বৈষ্ণব পদাবলি। এ-কবিতাগুলাে ক্ষুদ্র; কিন্তু এগুলােতে যেআবেগ প্রকাশিত হয়েছে, তা তুলনাহীন। এ-কবিতার নায়কনায়িকা কৃষ্ণ ও রাধা। বৈষ্ণব কবিরা কখনাে রাধার বেশে কখনাে কৃষ্ণের বেশে নিজেদের হৃদয়ের আকুল আবেগ প্রকাশ করেছেন এ-কবিতাগুলােতে। মধ্যযুগে মুসলমান কবিরা একটি নতুন প্রদীপ জ্বালিয়েছিলেন। তারা সর্বপ্রথম শােনান নিছক মানুষের গল্প। মধ্যযুগে হিন্দু কবিরা দেবতার গান ও কাহিনী রচনায় যখন সমর্পিত, তখন মুসলমান কবিরা ইউসুফ-জুলেখা বা লাইলি-মজনুর হৃদয়ের কথা শােনান। এর ফলে দেবতার বদলে প্রাধান্য লাভ করে মানুষ। এ-মানুষ যদিও কল্পনার সৃষ্টি, তবু মানুষের কথা সবার আগে বলার কৃতিত্ব মুসলমান কবিরা দাবি করতে পারেন।

মধ্যযুগের অবসানে আসে আধুনিক যুগ, এইতাে সেদিন, ১৮০০ অব্দে। আধুনিক যুগের সব চেয়ে বড়াে অবদান গদ্য। প্রাচীন যুগে, মধ্যযুগে বাঙলা সাহিত্যে গদ্য বলতে বিশেষ কিছু ছিলাে না। তখন ছিলাে কেবল কবিতা বা পদ্য। তখন গদ্য ছিলাে না, তা নয়; গদ্যসাহিত্য ছিলাে না। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের লেখকেরা সুপরিকল্পিতভাবে বিকাশ ঘটান বাঙলা গদ্যের। তাদের প্রধান ছিলেন উইলিয়ম কেরি । কেরির সহায়ক ছিলেন রামরাম বসু। উনিশশতকের প্রথম অর্ধেক কেটেছে সদ্য জন্মনেয়া গদ্যের লালনপালনে।

বিভিন্ন লেখক নিজ নিজ ভঙ্গিতে গদ্য রচনা করেছেন, আর বিকশিত হয়েছে বাঙলা গদ্য। সে-সময়ের যাঁরা প্রধান গদ্যলেখক, তারা হচ্ছেন মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার, রাজা রামমােহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অক্ষয়কুমার দত্ত। গদ্যের সাথে সাহিত্যে আসে বৈচিত্র্য; উপন্যাস দেখা দেয়, রচিত হয় গল্প নাটক প্রহসন প্রবন্ধ আরাে কতাে কী। প্রথম উপন্যাস লেখেন প্যারীচাঁদ মিত্র; উপন্যাসের নাম আলালের ঘরের দুলাল। মহাকাব্য রচনা করেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। নাম মেঘনাদবধকাব্য। মধুসূদন দত্ত আধুনিক কালের একজন মহান প্রতিভা। তাঁর হাতে সর্বপ্রথম আমরা পাই মহাকাব্য ও সনেট, পাই ট্রাজেডি, নাম কৃষ্ণকুমারীনাটক। পাই প্রহসন, নাম বুড় শালিকের ঘাড়ে রোঁ, একেই কি বলে সভ্যতা।

এরপরে আসেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, দীনবন্ধু মিত্র, বিহারীলাল চক্রবর্তী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মীর মশাররফ হােসেন, কায়কোবাদ। তারপর আসেন মােহিতলাল মজুমদার, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, অমিয় চক্রবর্তী, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, এবং আরাে কতাে প্রতিভা। তাঁরা সবাই বাঙলা সাহিত্যকে সামনের দিকে এগিয়ে দিয়ে গেছেন।

প্রথম প্রদীপ : চর্যাপদ

বাঙলা ভাষার প্রথম বইটির নাম বেশ সুদূর রহস্যময় । বইটির নাম চর্যাপদ। বইটির আরাে কতকগুলাে নাম আছে। কেউ বলেন এর নাম চৰ্য্যাচর্যবিনিশ্চয়, আবার কেউ বলেন এর নাম চৰ্য্যাশ্চর্যবিনিশ্চয়। বড়াে বিদঘুটে খটমটে এ-নামগুলাে । তাই এটিকে আজকাল যেমনােরম নাম ধরে ডাকা হয়, তা হচ্ছে চর্যাপদ। বেশ সহজ সুন্দর এ-নাম। বইটির কথা বিশশতকের গােড়ার দিকেও কেউ জানতাে না। ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দ। পণ্ডিত মহামহােপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ওই বছর যান নেপালে। নেপালের রাজদরবারের গ্রন্থাগার থেকে আবিষ্কার করে তিনি নিয়ে আসেন কয়েকটি অপরিচিত বই। এ-বইগুলাের একটি হচ্ছে চর্যাপদ।

চর্যাপদ-এর সাথে আরাে দুটি বই—ডাকার্ণব ও দোহাকোষ, যেগুলােকে তিনি নেপালের রাজদরবারের গ্রন্থাগার থেকে চর্যাপদ এর সাথেই আবিষ্কার করেছিলেন- মিলিয়ে একসাথে ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোহা (১৩২৩) নামে একটি বই প্রকাশ করেন। এ-বই বেরােনাের সাথে সাথে সারা দেশে সাড়া পড়ে যায়, সবাই বাঙলা ভাষার আদি নমুনা দেখে বিস্মিত চকিত বিহ্বল হয়ে পড়ে। শুরু হয় একে নিয়ে আলােচনা আর আলােচনা। বাঙালি পণ্ডিতেরা চর্যাপদকে দাবি করেন বাঙলা বলে। কিন্তু এগিয়ে আসেন অন্যান্য ভাষার পণ্ডিতেরা। অসমীয়া পণ্ডিতেরা দাবি করেন একে অসমীয়া ভাষা বলে, ওড়িয়া পণ্ডিতেরা দাবি করেন একে ওড়িয়া বলে। মৈথিলিরা দাবি করেন একে মৈথিলি ভাষার আদিরূপ ব’লে, হিন্দিভাষীরা দাবি করেন হিন্দি ভাষার আদিরূপ বলে। একে নিয়ে সুন্দর কাড়াকাড়ি পড়ে যায়।

এগিয়ে আসেন বাঙলার সেরা পণ্ডিতেরা। ডক্টর সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ইংরেজিতে একটি ভয়াবহ বিশাল বই লিখেন বাঙলা ভাষার উৎপত্তি ও বিকাশ (১৯২৬) নামে, এবং প্রমাণ করেন চর্যাপদ আর কারাে নয়, বাঙালির। চর্যাপদ-এর ভাষা বাঙলা। আসেন ডক্টর প্রবােধচন্দ্র বাগচী, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, ডক্টর সুকুমার সেন, ডক্টর শশিভূষণ দাশগুপ্ত। তারা ভাষা, বিষয়বস্তু, প্রভৃতি আলােচনা করে প্রমাণ করেন চর্যাপদ বাঙলা ভাষায় রচিত; এটি আমাদের প্রথম বই। চর্যাপদ জ্বলে ওঠে বাঙলা ভাষার প্রথম প্রদীপের মতাে, আলাে দিতে থাকে আমাদের দিকে, আর আমরা সে-আলােতে পথ দেখে দেখে হাজার বছরের পথ হেঁটে আসি। সত্যিই আজ বিশশতকের শেষাংশে দাড়িয়ে এ-বইয়ের দিকে তাকালে একে প্রদীপ না বলে থাকা যায় না। এ-প্রদীপের শিখা অনির্বাণ। জুলে চিরকালের উদ্দেশে।

চর্যাপদ কতকগুলাে পদ বা কবিতা বা গানের সংকলন। এতে আছে ৪৬টি পূর্ণ কবিতা, এবং একটি ছেড়া খণ্ডিত কবিতা। তাই এতে কবিতা রয়েছে সাড়ে ছেচল্লিশটি। এ-কবিতাগুলাে লিখেছিলেন ২৪জন বৌদ্ধ বাউল কবি, যাদের ঘর ছিলাে না, বাড়ি ছিলাে; যারা ঘর চান নি, বাড়ি চান নি। সমাজের নিচুতলার অধিবাসী ছিলেন আমাদের ভাষার প্রথম কবিকুল। তাদের নামগুলােও কেমন কেমন; নাম যে এমন হতে পারে, তা তাঁদের নামগুলাে শােনার আগে ভাবতেও পারা যায় না। কিছু নাম : কাহ্নপাদ, লুইপাদ, সরহপাদ, চাটিল্লপাদ, ডােম্বিপাদ, ঢেণ্টপাদন, শবরপাদ। সবার নামের শেষে আছে ‘পাদ’ শব্দটি। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কবিতা লিখেছেন কাহ্নপাদ। কাহ্নপাদের অন্য নাম কৃষ্ণাচার্য। তার লেখা কবিতা পাওয়া গেছে বারোটি। ভুসুকুপাদ লিখেছেন ছটি কবিতা, সরহপাদ লিখেছেন চারটি, কুরিপাদ তিনটি; সুইপাদ, শান্তিপাদ, শবরপাদ লিখেছেন দুটি করে কবিতা, বাকি সবাই লিখেছেন একটি করে কবিতা।

এ-কবিতাগুলাে সহজে পড়ে বােঝা যায় না; এর ভাষা বুঝতে কষ্ট হয়, ভাব বুঝতে হিমশিম খেতে হয়। কবিরা আসলে কবিতার জন্যে কবিতা রচনা করেন নি; এজন্যেই এতাে অসুবিধা; পদে পদে পা পিছলে পড়ার সম্ভাবনা। আমাদের প্রথম কবিরা ছিলেন গৃহহীন বৌদ্ধ বাউল সাধক। তাদের সংসার ছিলাে না। তাঁরা সাধনা করতেন গােপন তত্ত্বের। সে-তত্ত্বগুলাে তাঁরা কবিতায় গেঁথে দিতে চেয়েছিলেন, যাতে একমাত্র সাধক ছাড়া আর কেউ তাদের কথা বুঝতে না পারে। তাই যখন প্রাচীন ভাষাটি বেশ রপ্ত করে পড়তে যাই চর্যাপদ, দেখি এর কথাবার্তাগুলাে কেমন হেঁয়ালির মতাে। একবার মনে হয় বুঝতে পারছি, পরমুহূর্তে মনে হয় কিছু বুঝছি না। চর্যাপদ পড়ার মানে হলাে চমৎকার ধাধার ভেতরে প্রবেশ করা।

কিন্তু এ-কবিতাগুলােতে শুধু ধর্মের কথাই নেই, আছে ভালাে কবিতার স্বাদ। আছে সেকালের বাঙলার সমাজের ছবি, আর ছবিগুলাে এতাে জীবন্ত যে মনে হয় এইমাত্র প্রাচীন বাঙলার গাছপালা, আর সাধারণ মানুষের মধ্যে একটু হেঁটে এলাম। আছে গরিব মানুষের বেদনার কথা, রয়েছে সুখের উল্লাস। বর যাচ্ছে বিয়ে করতে তার ছবি আছে, গম্ভীরভাবে গভীর নদী বয়ে যাচ্ছে তার চিত্র রয়েছে, ফুল ফুটে আকাশ ঢেকে ফেলেছে তার দৃশ্য আছে, পাশা খেলছে লােকেরা তার বর্ণনা আছে। একটি কবিতায় এক দুঃখী কবি তাঁর সংসারের অভাবের ছবি এত মর্মস্পর্শী করে এঁকেছেন যে পড়তে পড়তে শিউরে উঠতে হয়। কবির ভাষা তুলে দিচ্ছি :

টালত মাের ঘর নাহি পড়বেষী। হাড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেশী। বেঙ্গ সংসার বড়হিল জাত। দুহিল দুধ কি বেক্টে ষামায়।

কবি বলেছেন, টিলার ওপরে আমার ঘর, আমার কোনাে প্রতিবেশী নেই। হাঁড়িতে আমার ভাত নেই, আমি প্রতিদিন উপােস থাকি। বেঙের মতাে প্রতিদিন সংসার আমার বেড়ে চলছে, যে-দুধ দোহানাে হয়েছে তা আবার ফিরে যাচ্ছে গাভীর বাটে। বেশ করুণ দুঃখের ছবি এটি। কবি যে খুব দরিদ্র শুধু তাই নয়, তার ভাগ্যটি বেশ খারাপ। তাই বলেছেন, দোহানাে দুধ ফিরে যাচ্ছে আবার গাভীর বাঁটে। এরকম বেদনার কথা অনেক আছে চর্যাপদ-এ, আছে সমাজের উঁচুশ্রেণীর লােকের অত্যাচারের ছবি। তাই কবিরা সুযােগ পেলেই উপহাস করেছেন ওই সব লােকদের। আজকাল শ্রেণীসংগ্রামের কথা বেশ বলা হয়; শ্রেণীসংগ্রামের জন্যে রচিত হয় সাহিত্য।

বাঙলা সাহিত্যে শ্রেণীসংগ্রামের সূচনা হয়েছিলাে প্রথম কবিতাগুচ্ছেই। | এ-কবিতাগুলােতে আছে অনেক সুন্দর সুন্দর উপমা; আছে মনােহর কথা, যা সত্যিকার কবি না হলে কেউ বলতে পারে না। একজন কবি একটি জিনিশ সম্বন্ধে বলেছেন, সে-জিনিশটি জলে যেমন চাঁদের প্রতিবিম্ব পড়ে, তার মতাে সত্যও নয়, আবার মিথ্যেও নয়। এ-রকম চমৎকার কথা অনেক পরে বলেছেন রবীন্দ্রনাথ সাধারণ মেয়ে’ নামক একটি বিখ্যাত কবিতায়। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, হীরে বসানোে সােনার ফুল কি সত্য, তবু কি সত্য নয়?’ সােনায় বানানাে হীরেবসানাে ফুল তাে আর সত্যিকার ফুল নয়, ওটা হচ্ছে বানানাে মিছে ফুল। ও ফুল বাগানে ফোটে না, তবু আমরা তাকে ফুল বলি। আরাে একজন কবি, যার নাম কম্বলাম্বরপাদ, তাঁর ধনসম্পদের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন :

সােণে ভরিতী করুণা নাবী। রুপা থুই নাহিক ঠাবী।

কবি বলেছেন, আমার করুণা নামের নৌকো সােনায় সােনায় ভরে গেছে। সেখানে আর রুপপা রাখার মতাে তিল পরিমাণে জায়গা নেই। একথা পড়ার সাথে সাথে মনে পড়ে যায় রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত কবিতা ‘সােনার তরী’র সেই পংক্তিগুলাে, যেখানে কবি বলেছেন, ঠাই নাই ঠাই নাই ছােট সে তরী, আমার সােনার ধানে গিয়েছে ভরি।’ এক কবি বলছেন, হরিণের মাংসের জন্যে হরিণ সকলের শত্রু; আরেকজন বলছেন, শরীরটি হচ্ছে একটি বৃক্ষ, পাঁচটি তার ডাল। সবচেয়ে ভালাে কবিতাটি লিখেছেন কবি শবরীপাদ। তিনি আনন্দের যে-ছবি এঁকেছেন তা তুলনাহীন। কবি হৃদয়ের সুখে বিভাের হয়ে আছেন, যেমন মানুষ থাকে স্বপ্নে। তাঁর কিছু পংক্তি তুলে দিচ্ছি :

উঞ্চা উঞ্চা পাবত তহি বসই সবরী বালী। মােরঙ্গী পীচ্ছ পরহিণ সবরী গিবত গুঞ্জরীমালী। উমত সবরাে পাগল সবরাে মা কর গুলী গুহাড়া তােহােরি। ণিঅ ঘরিণী নামে সহজ সুন্দরী। পাণা তরুবর মৌলিল রে গঅণত লাগেলী ডালী।

এর কথাগুলাে যেমন সুন্দর, তেমনি মনমাতানোে এর ছন্দ। কবি নিজের রূপসী স্ত্রী নিয়ে মহাসুখে আছেন। বলছেন, উঁচু উঁচু যেখানে পাহাড় সেখানে বাস করে শবরী বালিকা। তার পরিধানে ময়ূরের বহুবর্ণ পুচ্ছ, গলায় আছে গুঞ্জাফুলের মালা। তারপর কবি নিজের উদ্দেশে বলছেন, হে অস্থির পাগল শবর, তুমি গােল বাঁধিও না, এ তােমার স্ত্রী, এর নাম সহজসুন্দরী। শেষ যে-পংক্তিটি তুলে এনেছি তাতে আনন্দের এবং প্রকৃতি বর্ণনার অনিন্দ্য উদাহরণ। বলছেন, অসংখ্য গাছে মুকুল ধরেছে, আর আকাশে ছুঁয়ে গেছে তাদের ডাল। এ-বর্ণনা পড়ার সময় চোখের মধ্যে গাছের ফুল মুকুল আর শাখাপুঞ্জ নড়ে ওঠে। আমরা আবেগে কবি হয়ে উঠি। চর্যাপদ-এর সবগুলাে কবিতা ছন্দে রচিত, পংক্তির শেষে আছে মিল।

এগুলাে আসলে গান, তাই কবিরা প্রতিটি কবিতার শুরুতে কোন সুরে কবিতাটি গাওয়া হবে, তার উল্লেখ করেছেন! এমন কয়েকটি সুর বা রাগের নাম : রাগ পটমঞ্জরী, রাগ অরু, রাগ ভৈরবী। বাঙলা কবিতায় ১৮০০ সালের আগে যা কিছু রচিত হয়েছে, সবই রচিত হয়েছে গাওয়ার উদ্দেশ্যে। আজকাল আমরা কবিতা পড়ি, গাই না। আগে কবিরা কবিতা গাইতেন, পাঠকেরা শুনতে কবির চারদিকে বসে। মাইকেল মধুসূদন দত্ত যে-দিন কবিতা লিখলেন সেদিন থেকে কবিতা হয়ে উঠলাে পড়ার বস্তু, গাওয়ার নয়। চর্যাপদ-এর কবিতাগুলাে গাওয়া হতাে। তাই এগুলাে একই সাথে গান ও কবিতা। বাঙালির প্রথম গৌরব এগুলাে।

অন্ধকারে দেড়শাে বছর

চর্যাপদ রচিত হয়েছিলাে ৯৫০ থেকে ১২০০ অব্দের মধ্যে। কিন্তু এরপরেই বাঙলা সাহিত্যের পৃথিবীতে নেমে আসে এক করুণ অন্ধকার, আর সে-আঁধার প্রায় দেড়শাে বছর টিকেছিলাে। ১২০০ অব্দ থেকে ১৩৫০ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে লেখা কোনাে সাহিত্য আমাদের নেই। কেননা নেই? এ-সময়ে কি কিছুই লেখা হয় নি? কবিরা কোথায় গিয়েছিলেন এ-সময়? কোনাে একটি ভাষায় দেড়শাে বছরের মধ্যে কেউ কিছু লিখলাে না, একি সম্ভব হতে পারে? কিছুতেই বিশ্বাস হতে চায় না যে এ-সময়ে কিছু লেখা হয় নি। ১২০০ থেকে ১৩৫০ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে রচিত কোনাে সাহিত্যকর্মের পরিচয় পাওয়া যায়
বলে এ-সময়টাকে বলা হয় অন্ধকার যুগ’। পণ্ডিতেরা এ-সময়টাকে নিয়ে অনেক ভেবেছেন, অনেক আলােচনা করেছেন, কিন্তু কেউ অন্ধকার সরিয়ে ফেলতে পারেন নি। এসময়টির দিকে তাকালে তাই চোখে কোনাে আলাে আসে না, কেবল আঁধার ঢাকা চারদিক।

১২০০ থেকে ১২০৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে লক্ষ্মণ সেনকে পরাজিত করে বাঙলায় আসে মুসলমানেরা। অনেকে মনে করেন মুসলমানেরা এতাে অত্যাচার উৎপীড়ন চালিয়েছিলাে যে কারাে মনে সাহিত্যের কথা জাগে নি। তাই এ-সময়ে বাঙলা ভাষা সাহিত্যহীন মরুভূমি। কিন্তু এ-যুক্তি মানা যায় না। কেননা দেড়শাে বছর ধরে রক্তপাত চলতে পারে না। তাহলে মানুষ রইলাে কী করে? মুসলমানেরা তাে বাঙালিদের মারার জন্যেই আসে নি, তারা এসেছিলাে রাজত্ব করতে। এছাড়া পরবর্তীকালে দেখা গেছে মুসলমান রাজারা বাঙলা সাহিত্যকে বেশ উৎসাহ দিচ্ছে। যারা পরে সাহিত্য সৃষ্টিতে উৎসাহ দিলাে, তারাই আগে সাহিত্যকে দমিয়ে দিয়েছিলাে এরকম হতে পারে না।

বাঙলা সাহিত্যকে ধ্বংস করার জন্যে তাে আর তারা আসে নি। তাহলে সাহিত্য হলাে না কেননা, কেননা আমরা পাই না একটিও কবিতা, একটিও কাহিনীকাব্য? আগে সাহিত্য লিখিত হতাে না, মুখে মুখে গাওয়া হতাে। তখন ছাপাখানা ছিলাে না, পুথি লিখিয়ে নেয়ায় ছিলাে অনেক অসুবিধা। তাই কবিরা মুখে মুখে রচনা করতেন তাদের কবিতা, কখনাে তা হয়তাে হতাে ছােটো আয়তনের, কখনাে বা হতে বিরাট আকারের। রচনা করে তা স্মরণে রেখে দিতেন, নানা জায়গায় গাইতেন। কবিতা যারা ভালােবাসতাে তারাও মুখস্থ করে রাখতে কবিতা। এভাবে কবিতা বেঁচে থাকতাে মানুষের স্মৃতিতে, কণ্ঠে। আজকের মতাে ছাপাখানার সাহায্য সেকালের কবিরা লাভ করেন নি। তাই যে-কবিতা একদিন মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যেতাে, সে-কবিতা হারিয়ে যেতাে চিরকালের জন্যে।

তাহলে চর্যাপদকে লেখা অবস্থায় পাওয়া গেলাে কেমনে? এ-বইটি কিন্তু বাঙলায় পাওয়া যায় নি, পাওয়া গেছে নেপালে। নেপালের ভাষা বাঙলা নয়। বাঙলা ভাষাকে ধরে রাখার জন্যে প্রয়ােজন হয়েছিলাে একে বর্ণমালায় লিখে রাখার। তাই অন্ধকার সময়ের রচনার সম্বন্ধে আমরা অনুমান করতে পারি যে এ-সময়ে যা রচিত হয়েছিলাে, তা কেউ লিখে রাখে নি, তাই এতােদিনে তা মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে গেছে। তবু বিস্ময় থেকে যায়, কারণ দেড়শাে বছর ধরে কোনােও কবিতা লিপিবদ্ধ হলাে না, এ কেমন? এর পরে তাে আমরা বাঙলা সাহিত্যের ধারাবাহিক ইতিহাস পাচ্ছি, আমাদের সামনে আসছে একটির পরে একটি মঙ্গলকাব্য, আসছে পদাবলির ধারা। ১৩৫০ সালের পরেই আসেন মহৎ মহৎ কবিরা; আসেন বড় চণ্ডীদাস তাঁর শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য নিয়ে, এবং আসর মাতিয়ে তুলেছেন আরাে কতাে কবি। অন্ধকার যুগ’ আমাদের কাছে এক বিস্ময়। এ-সময়টা বাঙলা সাহিত্যের কৃষ্ণগহ্বর।

আরো পড়ুন :   লাল নীল দীপাবলি বা বাংলা সাহিত্যের জীবন | হুমায়ুন আজাদ [02]

এ-বিস্ময় আর অন্ধকার থেকে উদ্ধার পাবার জন্যে কেউ কেউ অন্য রকম কথা বলেছেন। তারা বলেন, চর্যাপদকে যদি আমরা বাঙলা না বলি, তাহলে অন্ধকার যুগ বলে কিছু থাকে না, বাঙলা সাহিত্য শুরু হয় চতুর্দশ শতক থেকে। কিন্তু চর্যাপদ যে বাঙলা, তা কী করে ভুলে যাই! চর্যাপদ-এ বাঙলা ভাষার জন্মের পরিচয় পাই, মধ্যযুগের রচনায় পাই বাঙলা ভাষার বিকাশের পরিচয়। মাঝখানে থেকে যায় একটি অন্ধকারের পর্দা, জমাট অন্ধকার, যার আবির্ভাবের কোনাে ঠিক কারণ কেউ দেখাতে পারবেন না।

প্রদীপ জ্বললাে আবার : মঙ্গলকাব্য

এক সময় অন্ধকার যুগের অবসান হয়, আবার জ্বলে দীপশিখা বাঙলা সাহিত্যের আঙ্গিনায়। এবার যে-দীপ জ্বলে ওঠে, তা আর কোনাে দিন নেভে নি, সে-শিখা ধারাবাহিক অবিরাম জ্বলে যেতে থাকে। অন্ধকার যুগের অবসানে নতুন নতুন সাহিত্য রচিত হতে থাকে বাঙলা ভাষায়; অসংখ্য কবি এসে হাজির হন বাঙলা সাহিত্যের সভায়। তাঁদের কণ্ঠে শুধু গান আর গান। কবিদের বীণা বেজে ওঠে নানা সুরে। শুরু হয় বাঙলা সাহিত্যে মধ্যযুগ; চতুর্দশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগ থেকে।

এ-মধ্যযুগের শুরুতেই রচিত হয় একটি দীর্ঘ অসাধারণ কাব্য, যার নাম শ্রীকৃষ্ণকীর্তন। এ-কাব্যটি যিনি রচনা করেন, তাঁর নাম বড়ু চণ্ডীদাস। একাব্যটির সংবাদও আমাদের অনেক দিন জানা ছিলাে না। ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে কাব্যটি বাঁকুড়ার এক গৃহস্থের গােয়ালঘর থেকে উদ্ধার করেন শ্রীবসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ। কাব্যটির নায়কনায়িকা কৃষ্ণ ও রাধা। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এর কবি বড় চণ্ডীদাস বাঙলা ভাষার প্রথম মহাকবি। তিনি আমাদের প্রথম রবীন্দ্রনাথ।

কিন্তু মধ্যযুগ যে-কাব্যগুলাের জন্যে বিখ্যাত, সেগুলােকে বলা হয় মঙ্গলকাব্য। মধ্যযুগের শুরু থেকে অসংখ্য কবি রচনা করতে থাকেন মঙ্গলকাব্য, আর এ-রচনা শেষ হয় মধ্যযুগের শেষপ্রান্তে এসে। মঙ্গলকাব্য হচ্ছে মধ্যযুগের উপন্যাস; এ-কাব্যগুলােতে কবিরা অনেক বড়াে বড়াে কাহিনী বলেছেন। তবে এ-কাহিনী আমাদের মতাে মানুষের কাহিনী নয়, এগুলাে দেবতাদের কাহিনী। দেবতারা জুড়ে থাকে এ-কাব্যগুলাের অধিকাংশ, মানুষ আসে গৌণ হয়ে। এ-কাব্যগুলােকে কেনাে বলা হয় মঙ্গলকাব্য? কেউ বলেন, দেবতাদের কাছে মঙ্গল কামনা করে এ-কাব্যগুলাে রচিত হয়েছে বলে এগুলাের নাম মঙ্গলকাব্য।

আবার কেউ বলেন, এ-কাব্যগুলাে গাওয়া হতাে এক মঙ্গলবার থেকে আরেক মঙ্গলবার পর্যন্ত, তাই এগুলাের পরিচয় মঙ্গলকাব্য বলে। আবার অনেকে বলেন, এগুলাে গাওয়া হতাে যে-সুরে, সে-সুরের নাম মঙ্গল; তাই এগুলাের নাম মঙ্গলকাব্য। এগুলােকে আমরা কাহিনীকাব্য বলতে পারি। | প্রায় পাঁচশাে বছর ধরে মঙ্গলকাব্য রচিত হয়েছে। নানা শ্রেণীর মঙ্গলকাব্য রয়েছে বাঙলা সাহিত্যে। এ-কাব্যগুলাের রয়েছে অনেকগুলাে সাধারণ রূপ। যেমন : প্রতিটি কাব্যেই দেখা যায় স্বর্গের কোনাে এক দেবতা নিজের কোনাে অপরাধের জন্যে শাপগ্রস্ত হয়। তখন তাকে স্বর্গে আর বসবাস করতে দেয়া হয় না।

সে এসে জন্ম নেয় পৃথিবীতে কোনাে সাধারণ মানুষের সাধারণ ঘরে। তার স্ত্রীও চলে আসে মাটির পৃথিবীতে, জন্ম নেয় কোনাে সাধারণ মানুষের কন্যা হয়ে। এক সময় তাদের বিয়ে হয়। স্বর্গের কোনাে দেবতা এসে হাজির হয় তাদের সামনে, বলে, “আমার পুজো তােমরা প্রচার করাে পৃথিবীতে। তারা সে-দেবতার পুজো প্রচার করে মানুষের মধ্যে, এবং এভাবে তারা কাটিয়ে ওঠে তাদের শাপ। অবশেষে একদিন মহাসমারােহে তারা আবার স্বর্গে ফিরে যায় দেবতার মতাে।

নানা রকমের মঙ্গলকাব্য রচিত হয়েছে বাঙলা ভাষায়, সকলের রূপ প্রায় একই রকম। একই বিষয়ে অসংখ্য কবি কাব্য লিখেছেন। তাই কালে কালে এ-কাব্যগুলাে হয়ে উঠেছিলাে ক্লান্তিকর। কাব্যগুলাের নাম হতাে যে-দেবতার পুজো প্রচারের জন্যে কাব্যটি রচিত, সে-দেবতার নামানুসারে। তাই চণ্ডীর পুজো প্রচারের জন্যে যে-মঙ্গলকাব্য, তার নাম চণ্ডীমঙ্গলকাব্য’, মনসা দেবীর পুজো প্রচারের জন্যে যে-কাব্য রচিত, তার নাম ‘মনসামঙ্গলকাব্য। শিবের পুজো প্রচারের জন্যে যে-কাব্য তার নাম শিবমঙ্গলকাব্য’। এরকম আরাে অনেক মঙ্গলকাব্য রয়েছে; যেমন- ‘অন্নদামঙ্গলকাব্য’, ‘ধর্মমঙ্গলকাব্য, ‘কালিকামঙ্গলকাব্য’, শীতলামঙ্গলকাব্য’ ইত্যাদি। একই বিষয়ে অসংখ্য কবি কাব্য লিখেছেন। ধরা যাক চণ্ডীমঙ্গলকাব্যের কথা। একজন বা দুজন কবি যদি এ-বিষয়ে কাব্য

লিখতেন, তাহলে বেশ হতাে। কিন্তু এ-একই বিষয়ে কাব্য রচনা করেছেন অসংখ্য কবি, যাদের সকলের নামও আজ আর জানা নেই। সেকালে কবিরা নিজেরা মৌলিক গল্প বানাতেন না, পূর্বপুরুষের কাছ থেকে পাওয়া গল্প নিয়ে মেতে থাকতেন তাঁরা। এতে তাঁদের কোনাে মনপীড়া ছিলাে না, বরং পূর্বপুরুষের গল্প আবার লিখতে আনন্দ পেতেন সে-কবিরা। অধিকাংশ সময়ে তাদের হাতে আগের কাহিনী আরাে দুর্বল হয়ে পড়তাে। মঙ্গলকাব্যে তা খুব বেশি পরিমাণে হয়েছে।

যে-সকল কবি মঙ্গলকাব্য রচনা করেছেন, তাদের কিছু নাম বলছি। মনসামঙ্গলকাব্য লিখেছেন হরি দত্ত, নারায়ণ দেব, বিজয় গুপ্ত, বিপ্রদাস এবং আরাে অনেকে। চণ্ডীমঙ্গলকাব্য রচনা করেছেন মাণিক দত্ত, দ্বিজ মাধব, মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, দ্বিজ রামদেব, ভারতচন্দ্র রায় প্রমুখ। ধর্মমঙ্গলকাব্য লিখেছেন ময়ূরভট্ট, মাণিকরাম, রূপরাম, সীতারাম, ঘনরাম, এবং আরাে বহু কবি। অনেক কবি একই বিষয়ে কাব্য লিখেছেন বলে অনায়াসে শ্রেষ্ঠ কাব্যটি পড়ে নিলেই হয়, সবগুলাে পড়ার কোনাে দরকার করে না। মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যের ফিরে ফিরে পুনরুক্তি দেখে মধ্যযুগের ওপর ভীষণ বিরক্ত হয়ে উঠেছিলেন আধুনিক কালের একজন বড়াে কবি, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত। তিনি অনেকটা রেগেই বলেছেন, বাঙলা সাহিত্যে মধ্যযুগ অপাঠ্য। আসলে কিন্তু একে, মঙ্গলকাব্যকে, অপাঠ্য বলে বাতিল করে দেয়া যায় কোনাে কোনাে মঙ্গলকাব্যে ভালাে কবিতার যাদু আছে, কিন্তু সবচেয়ে বেশি আছে সেকালের জীবনের পরিচয়। বাঙলাদেশের মধ্যযুগের সামাজিক ইতিহাস জানতে হলে মঙ্গলকাব্য না পড়ে উপায় নেই।

মঙ্গলকাব্যগুলাে দেবতাদের নিয়ে লেখা। এ-দেবতারা বড়াে নিষ্ঠুর, ভক্তের ওপর তারা সহজেই রেগে ওঠে, রেগে মানুষের ভীষণ সর্বনাশ করে, আবার সামান্য পুজো পেলে খুশিতে বাগবাগ হয়ে ভক্তের গৃহ সােনারুপােয় ছেয়ে দেয়। এ-দেবতাদের আচরণ দেখে মনে হয় এরা আসল দেবতা নয়, অভিজাত দেবতা নয়; এরা নিম্নশ্রেণীর দেবতা, যাদের মানুষ পুজো করতে চায় না। তাই তারাও ক্ষমাহীন, অত্যাচার করে লােভ দেখিয়ে বার বার বিপদে ফেলে তারা মানুষের পুজো ভক্তি আদায় করে নেয়। এদের সাথে অনেকটা মিল আছে আমাদের দেশের এককালের জমিদারদের, যারা মানুষকে উৎপীড়ন করে নিজেদের সম্মান বাড়াতে চাইতাে। যেমন মনসাদেবী। তার ছিলাে এক চোখ কানা, তার ওপরে সে মেয়ে। তার ইচ্ছে হয় সমাজের অভিজাত চাঁদ সদাগরের পুজো পাওয়ার। চাদ সদাগর বিরাট ধনী, সমাজে মান্যগণ্য, তার দেবতাও অভিজাত। সে কিছুতেই রাজি নয়, একচোখ কানা, তার ওপরে মেয়ে, দেবতার পুজো করতে। মনসা রেগে ওঠে, চাঁদের বাণিজ্যতরী ডুবিয়ে দেয় পানিতে, চাঁদের ছেলে লখিন্দরকে বাসরঘরে মেরে ফেলে। তারপর একদিন সে লাভ করে চাঁদ সদাগরের পুজো।

মঙ্গলকাব্যের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হচ্ছে চণ্ডীমঙ্গল, আর মনসামঙ্গল। চণ্ডীমঙ্গলকাব্য লিখেছেন অনেক কবি; তাদের মধ্যে দু’জন মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ কবিদের সারিতে আসন পান। তাঁরা হলেন কবিকঙ্কন মুকুন্দরায় চক্রবর্তী, এবং রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র। মনসামঙ্গলের দুজন সেরা কবি হলেন বিজয়গুপ্ত, এবং বংশীদাস। চণ্ডীমঙ্গলের আছে দুটি চমৎকার কাহিনী; একটি ব্যাধ কালকেতু-ফুল্লরার, অপরটি ধনপতি-লহনার। মনসামঙ্গলের কাহিনী একটি, তা হচ্ছে বেহুলা-লখিন্দরের। কালকেতু ও ফুল্লরার গল্প মনােরম, কীভাবে তারা চণ্ডীদেবীর আশীর্বাদ লাভ করলাে, পুজো প্রচার করলাে চণ্ডীর, তারপরে ফিরে গেলাে স্বর্গে, এ-গল্পে তার আনন্দমধুর কাহিনী রয়েছে। কিন্তু বেহুলা ও লখিন্দরের গল্প বড়াে করুণ, পড়তে পড়তে চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। এ-কাহিনী যিনি প্রথম রচনা করেছিলেন তাঁকে মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ গল্পকার বলা যায়। এ-গল্পে মানবজীবনের রূপ ভয়াবহ বেদনাকরুণ হয়ে দেখা দিয়েছে।

মঙ্গলকাব্য রচিত পদ্যে, ছন্দে গাঁথা এ-কাব্যগুলাে । তবু এগুলাে পড়তে পড়তে মনে হয় যেন গদ্য পড়ছি। কবিতায় বেশি কথা বললে তা আর কবিতা থাকে না। কবিতায় আমরা কামনা করি বিশেষ মুহূর্তের অনুভূতি বা আবেগ, কবিতায় জীবনের সব কথা সবিস্তারে বলা যায় না। কিন্তু মঙ্গলকাব্যে কবিরা বলেছেন জীবনের প্রতিদিনের সকল কথা, নায়কের জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি যা কিছু ঘটেছে সবকিছু বলতে চেয়েছেন কবিরা। তাই মঙ্গলকাব্যে লেগেছে গদ্যের ভার, তা হয়ে উঠেছে শ্লথ, পুনরুক্তিময়। এগুলাে মধ্যযুগের উপন্যাস। উপন্যাসে দেখা যায় নায়কনায়িকার জীবনকে বিস্তৃতভাবে বলার চেষ্টা, লেখক উপন্যাসে কিছু পরিত্যাগ করতে চান না। নায়ক সুখে আছে বেদনায় কাঁপছে, এর সামান্য চিত্র দিলেই উপন্যাসের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না, উপন্যাস তার পাত্রপাত্রীদের পরিপূর্ণভাবে তুলে ধরতে চায়। মঙ্গলকাব্যগুলােতেও তাই হয়েছে। চণ্ডীমঙ্গলের কালকেতুর কথা ধরা যাক। কবি মুকুন্দরাম স্বর্গে কালকেতু কী ছিলাে, তা বলেছেন, পৃথিবীতে এসে কোথায় জন্ম নিলাে, কীভাবে বেড়ে উঠলাে, সব বলেছেন। এর ফলে কাব্য দীর্ঘ হয়েছে, কবিতা হয়েও একে মনে হয় গদ্য।

মঙ্গলকাব্যের কবিরা সাধারণত যে-দেবতার নামে কাব্য লিখেছেন, সে-দেবতার ভক্ত ছিলেন। তাই কাব্যের শুরুতে সবাই বর্ণনা করেছেন তারা কেননা কাব্য রচনা করলেন, সেকথা। সব কবি বলছেন একই রকম কথা। তারা বলেছেন, দেবতা স্বপ্নে আদেশ দিয়েছেন আমাকে কাব্য লিখতে, তাই আমি কাব্য লিখছি। একথা কি আজ বিশ্বাস হয়? বিশ্বাস হয় না। এ ছিলাে তখনকার রীতি, দেবতার কথা না বললে মানুষ কাব্য শুনবে না ভেবেই বােধ হয় কবিরা একথা বলতেন। সেকালে কাব্যের উদ্দেশ্য আজকের মতাে ছিলাে না, কাব্যের জন্যে কাব্য লেখার প্রচলন তখন ছিলাে না, ধর্ম প্রচারের জন্যে সবাই কাব্য রচনা করতেন। তাই মধ্যযুগের সমস্ত সাহিত্য ধর্মভিত্তিক, দেবতাকেন্দ্রিক। দেবতার কথার ফাঁকে ফাঁকে এসেছে মানুষ।

চণ্ডীমঙ্গলের সােনালি গল্প

চণ্ডীমঙ্গলের আছে দুটি বেশ চমৎকার গল্প : একটি কালকেতু-ফুল্লরার, অন্যটি ধনপতিসহনা-খুলনার। চণ্ডীমঙ্গলের গল্প মধুর আনন্দের, বেদনার বদলে এ-গল্পে আছে সুখের কথা। বেদনা যা আছে মাঝেমাঝে, তা শুধু সুখ বাড়িয়ে দেয়ার জন্যে। কালকেতু-ফুল্লরার গল্পটি আমি বলবাে। স্বর্গে বেশ সুখে ছিলাে নীলাম্বর। ফুল তুলে শিবপুজো করে, নিজের স্ত্রী ছায়াকে ভালােবেসে সুখে সময় কাটাচ্ছিলাে নীলাম্বর। কিন্তু ক্রমশ তার ভাগ্যাকাশে দুঃখের মেঘ দেখা দিতে লাগলাে। চণ্ডীর ইচ্ছে হয়েছে পৃথিবীতে তার পুজো প্রচারের।

কিন্তু কে করবে তার পুজো প্রচার? চণ্ডী এ-কাজে নীলাম্বরকে মনে মনে মনােনীত করলাে। চণ্ডী তার স্বামী শিবকে বললাে, নীলাম্বরকে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দাও, সে পৃথিবীতে আমার পুজো প্রচার করবে। শিব বললাে, বিনা অপরাধে আমি তাকে কী করে স্বর্গ থেকে বিদায় দিই? চণ্ডী মনে মনে পরিকল্পনা আঁটলাে, সে নীলাম্বরকে পাঠাবেই। একদিন শিবপুজোর জন্যে বাগানে ফুল তুলছিলাে নীলাম্বর। চণ্ডী সেখানে গেলাে, নিজেকে বিষাক্ত কীটে রূপান্তরিত করলাে, এবং নীলাম্বরের তােলা ফুলে গােপনে লুকিয়ে রইলাে। ঘনিয়ে এলাে নীলাম্বরের স্বর্গ থেকে বিদায়ের দিন। নীলাম্বর ফুল দিয়ে শিবপুজো করতে গেলে ফুলের মধ্যে লুকিয়ে থাকা কীট শিবকে দংশন করলাে।

কীটের কামড়ে শিউরে উঠলাে শিব, অভিশাপ দিলাে নীলাম্বরকে, যাও পৃথিবীতে গিয়ে জন্ম নাও ব্যাধ হয়ে।’ শিবের অভিশাপে দেবতা নীলাম্বরের সব দেবত্ব বিলীন হয়ে গেলাে। বেচারির নিজের কোনাে অপরাধ ছিলাে, তবু দৈব দয়ায় তাকে চলে আসতে হলাে এ-কষ্টভরা পৃথিবীতে। সে জন্ম নিলাে ধর্মকেতু নামক এক ব্যাধের পুত্র হয়ে। অন্যদিকে তার স্ত্রী ছায়াও চলে এলাে পৃথিবীতে অন্য এক ব্যাধের কন্যা হয়ে । নীলাম্বরের নাম হলাে কালকেতু, আর ছায়ার নাম হলাে ফুল্লরা।

কালকেতু ব্যাধের ছেলে, সুন্দর স্বাস্থ্যবান। বনের ভয়ঙ্কর পশুরা তার জ্বালায় অস্থির হয়ে উঠলাে। তার বিয়ে হলাে এগারাে বছর বয়সে ফুল্লরার সাথে। পৃথিবীতেও তারা বেশ সুখে দিন কাটাতে লাগলাে। কালকেতু ছিলাে অসাধারণ শিকারী, তার নিক্ষিপ্ত শরে প্রতিদিন প্রাণ হারাতে লাগলাে সংখ্যাহীন বনচর পশু। ছােটোখাটো দুর্বল পশুদের তাে কথাই নেই, এমনকি বাঘসিংহরাও ভীত হয়ে উঠলাে। বনে পশুদের বাস করা হয়ে উঠলাে অসাধ্য। পশুরা ভাবতে লাগলাে কী করে রক্ষা পাওয়া যায় এ-শিকারীর শর থেকে। সব পশু একত্র হয়ে ধরলাে তাদের দেবী চণ্ডীকে; বললাে, বাঁচাও কালকেতুর শর থেকে। চণ্ডী বললাে, বেশ। শুরু হলাে চণ্ডীর চক্রান্ত।

কালকেতুকে অস্থির করে তুললাে সে নানাভাবে। কালকেতু জীবিকা নির্বাহ করে পশু মেরে। একদিন সে বনে গিয়ে দেখলাে বনে কোননা পশু নেই। চণ্ডী সেদিন ছল করে বনের পশুদের লুকিয়ে রেখেছিলাে। সেদিন কালকেতু কোনাে শিকার পেলাে না, না খেয়ে তাকে দিন কাটাতে হলাে। পরদিন আবার সে তীরধনুক নিয়ে শিকারে গেলাে। পথে দেখলাে সে একটি স্বর্ণগােধিকা অর্থাৎ গুইসাপ। এজিনিশটি অলক্ষুণে; তাই কালকেতু চিন্তিত হয়ে পড়লাে। রেগে উঠলাে কালকেতু। সে গােধিকাটিকে বেঁধে নিলাে। মনে মনে ভাবলাে, আজ যদি কোনাে শিকার না মেলে তবে এটিকেই খওয়া যাবে।

সেদিন কোনাে শিকার মিললাে না তার। সে গােধিকাটিকে নিয়ে বাড়ি ফিরে এসে দেখলাে তার প্রতীক্ষায় বসে আছে ফুল্লরা। কিছু রান্না হয় নি। গতকাল তারা খেতে পায় নি, আজো খেতে পাবে না। কালকেতুকে শিকারহীন ফিরে আসতে দেখে প্রায় কেঁদে ফেললাে ফুল্লরা। কালকেতু ফুল্লরাকে বললাে, এ-গােধিকাটিকে আজ রান্না করাে, পাশের বাড়ির বিমলাদের থেকে কিছু খুদ এনে রাঁধ, আমি হাটে যাচ্ছি। এ বলে কালকেতু চলে গেলাে। তার পরেই এলাে বিস্ময়, ঘটলাে অভাবনীয় ঘটনা। গােধিকাটি আসলে ছিলাে দেবী চণ্ডী। ফুল্লরা বিমলাদের বাড়িতে যেতেই সে এক অপরূপ সুন্দরী যুবতীর রূপ ধারণ করলাে। বিমলাদের বাড়ি থেকে ফিরে এসে নিজের আঙ্গিনায় এক অপূর্ব সুন্দরী যুবতীকে দেখে অবাক হয়ে গেলাে ফুল্লরা। সাথে সাথে হলাে ভীতও। ফুল্লরা তাকে তার পরিচয় জিজ্ঞেস করলাে। দেবী চণ্ডী ছলনাময়ী, শুরু করলাে তার ছলনা। সরলভাবে বললাে, কালকেতু আমাকে নিয়ে এসেছে।

একথা শুনে ভয় পেলাে ফুল্লরা। এতােদিন সে স্বামীকে নিয়ে সুখে ছিলাে, ভাবলাে এবার বুঝি তার সুখের দিন ফুরােলাে। ফুল্লরা অনেক বুঝালাে যুবতীটিকে। বললাে, তুমি খুব ভালাে, তুমি খুব সুন্দরী। তুমি তােমার নিজের বাড়িতে ফিরে যাও, নইলে মানুষ নানা কথা বলবে। কিন্তু যুবতী ফুল্লরার কথায় কোনাে কান দিলাে না; বললাে, আমি এখানে থাকবাে। এতে কেঁদে ফেললাে ফুল্লরা, দৌড়ে চলে গেলাে হাটে কালকেতুর কাছে। বললাে সব কথা। শুনে কালকেতুও অবাক। সে বাড়ি ফিরে এলাে ফুল্লরার সাথে, এবং যুবতীকে দেখে অবাক হলাে। কালকেতু বার বার তাকে বললাে, তুমি চলে যাও। কিন্তু কোনাে কথা বলে না যুবতী।

তাতে রেগে গেলাে কালকেতু, তীরধনুক জুড়লাে, যুবতীকে সে হত্যা করবে। যখন কালকেতু তীর নিক্ষেপ করতে যাবে তখন ঘটলাে আরাে বিস্ময়কর এক ঘটনা। এবার দেবী চণ্ডী নিজের মূর্তিতে দেখা দিলাে। সে-আশ্চর্য সুন্দরী মেয়ে পরিণত হলাে দেবী চণ্ডীতে। চোখের সামনে এমন অলৌকিক ব্যাপার ঘটতে দেখে ব্যাধ কালকেতু মুগ্ধ হয়ে গেলাে। চণ্ডী বললাে, তােমরা আমার পুজো প্রচার করাে, আমি তােমাদের অজস্র সম্পদ দেবাে, রাজ্য দেবাে। রাজি হলাে কালকেতু-ফুল্লরা। অবশ্য দেবীর কথা প্রথমে পুরােপুরি বিশ্বাস করতে পারে নি ফুল্লরা, কেননা এ ছিলাে অভাবিত। দেবী সাথে সাথে সাত কলস ধন দান করলাে। কালকেতু ছিলাে একটু বােকাসােকা মানুষ। অভাবিত ধন পেয়ে কালকেতু বােকার মতাে ব্যবহার করেছে, তার চমৎকার বিবরণ দিয়েছেন কবি মুকুন্দরাম। কিছু অংশ তুলে আনছি : এক ঘড়া অবশেষে দেখি মহাবীর। নিতে নারে দেড়ি ভার হইল অস্থির । মহাবীর বলে মাতা করি নিবেদন। চাহিয় চিন্তিয়া দেহ এক ঘড়া ধনা যদি গাে অভয়া ধন না দিবা অপর । এক ঘড়া ধন মাগাে নিজ কাঁখে কর । অস্থির দেখিয়া বীর ভাবেন অভয়া। ধন ঘড়া কাঁখে কৈলা বীরে করি দয়া । আগে আগে মহাবীর করিল গমন। পশ্চাতে চলিল চণ্ডী লয়ে তার ধন ॥ মনে মনে মহাবীর করেন যুকতি। ধন গড়া লয়ে পাছে পালায় পার্বতী ।

কালকেতু বাঁকে করে দু-ঘড়া করে ধন নিয়ে যাচ্ছে তার বাড়িতে। ওপরের ঘটনাটি হচ্ছে তৃতীয় বার যখন সে ধন নিতে এসেছে তখনকার। সে দেখে এক ঘড়া ধন বাকি থেকে যাচ্ছে। দেবীকে ধন পাহারায় রেখে যেতে তার সাহস হচ্ছে না। তাই দেবীকে সে বলছে, যদি এ-ধন তুমি আর কাউকে না দিতে চাও, তবে একটু কাঁখে করে এক ঘড়া ধন তুমি নিজেই আমার বাড়িতে পৌছে দাও। দেবী তাতে রাজি হয়। কালকেতু আগে আগে যায়, দেবী যায় পাছে পাছে। কালকেতুর মনে বড়াে ভয় যদি দেবী ধন নিয়ে পালিয়ে যায়! একটু বেশ নির্বোধ না হলে কেউ কি এমন কথা ভাবে!

কালকেতু এ ধনে ধনী হয়ে গুজরাটে বন কেটে বিরাট নগর নির্মাণ করলাে। সেখানে ছিলাে ভাড়দত্ত নামের এক দুষ্ট লােক। দুষ্টরা মন্ত্রী হতে চায় চিরকালই, সেও এসে কালকেতুর মন্ত্রী হতে চাইলাে। কালকেতু তাতে রাজি হলাে না। এতে ভাড়দত্ত ক্ষেপে গেলাে। সে চলে গেলাে কলিঙ্গে, সেখানকার রাজাকে নানা কিছু বুঝিয়ে কালকেতুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে রাজি করালাে। বেধে গেলাে যুদ্ধ। কালকেতু আগে ছিলাে ব্যাধ, এখন রাজা। সে যুদ্ধ জানে না। তাই যুদ্ধে হেরে গেলাে, এসে পালিয়ে রইলাে, বউয়ের পরামর্শ মতাে, ধানের গােলার ভেতরে। কলিঙ্গরাজ তাকে বন্দী করে নিয়ে গেলাে, কারাগারে বন্দী করে রাখলাে। ব্যাধ কালকেতু দেবীর বরে রাজা হয়েছিলাে, এখন সে বন্দী। কারাগারে কালকেতু স্মরণ করলাে দেবী চণ্ডীকে।

আরো পড়ুন :   লাল নীল দীপাবলি বা বাংলা সাহিত্যের জীবন | হুমায়ুন আজাদ [02]

চণ্ডী কালকেতুর ওপর সব সময় সদয়, কেননা কালকেতু তার ভক্ত। দেবী কলিঙ্গের রাজাকে স্বপ্নে দেখা দিলাে। বললাে, কালকেতু আমার ভক্ত, তাকে মুক্তি দাও, তার রাজ্য ফিরিয়ে দাও। কলিঙ্গরাজ দেবীর স্বপ্নাদেশ পেয়ে মুক্তি দিলাে কালকেতুকে, ফিরিয়ে দিলাে তার রাজ্য। কালকেতু তার রাজ্যে ফিরে এসে আবার রাজা হলাে, রাজত্ব করতে লাগলাে বেশ সুখে। ফুল্লরা তার সুখী রানী। অনেক দিন রাজত্ব করে বৃদ্ধ হলাে কালকেতু আর ফুল্লরা, এবং এক শুভদিনে মহাসমারােহে আবার নীলাম্বর-ছায়ারূপে ফিরে গেলাে স্বর্গে ।

মনসামঙ্গলের নীল দুঃখ

চঁদসদাগর আগে ছিলাে স্বর্গে। স্বর্গে শােনা যায় সবাই সুখে থাকে, চাঁদসদাগরও ছিলাে। কিন্তু কপালে তার সুখ সইলাে না। একদিন অকারণে মনসা দেবী রেগে উঠলাে চাঁদের ওপর, অভিশাপ দিলাে স্বর্গচ্যুত হয়ে মর্ত্যে জন্ম নেয়ার। চাঁদ ছিলাে গর্বী আত্মবিশ্বাসী পুরুষ। সেও ধমকে এলাে মনসাকে; আমি যাচ্ছি পৃথিবীতে, কিন্তু আমি যদি সেখানে তােমার পুজো না করি তবে সেখানে কেউ তােমার পুজো করবে না। আরম্ভ হলাে দুজনার বিরােধ, এ-বিরােধে চাঁদের জীবন হয়ে উঠলাে বেদনায় নীল।

চাঁদ মর্ত্যে এসে জন্ম নিলাে। তার স্ত্রীর নাম হলাে সনকা। চাঁদ পুজো করে শিবের আর গােপনে লুকিয়ে লুকিয়ে সনকা পুজো করে মনসার। চাঁদ একদিন দেখে ফেললাে স্ত্রীর মনসাপুজো; রেগে লাথি দিয়ে ফেলে দিলাে মনসার মঙ্গলঘট। মনসা খুব রাগী দেবী, চাঁদের ব্যবহারে জ্বলে উঠলাে অগ্নিশিখার মতাে। সে চাঁদসদাগরের ওপর প্রতিশােধ নিতে হলাে বদ্ধপরিকর। চাঁদসদাগরের একটি বাড়ি ছিলাে স্বর্গের উদ্যানের মতাে সুন্দর; সেটি ধ্বংস করে দিলাে মনসা । রাজ্যের দিকে দিকে দেখা দিলাে সাপের অত্যাচার। মনসা হলাে সাপের দেবী, সে তার সাপবাহিনীকে লাগিয়ে দিলাে চাদের বিরুদ্ধে। চাদের এক বন্ধু একদিন সাপের কামড়ে মারা গেলাে, চাঁদ বিমর্ষ হয়ে পড়লাে।

মানসার ক্রোধে আরাে মৃত্যু দেখা দিলাে চাঁদের বাড়িতে। তার ছ-জন শিশুপুত্রকে মেরে ফেললাে মনসা। মনসা এসে হাজির হলাে চাঁদের কাছে; বললাে, আমার পুজো করাে, আমি সব ফিরিয়ে দেবাে। চাঁদ তবুও অটল, কিছুতেই সে পুজো করবে না মনসার। বরং সে মনসাকে আরাে অপমান করলাে, মনসাকে সে লাঠি নিয়ে তাড়া করলাে, লাঠির আঘাতে ভেঙে গেলাে মনসার কাকালি । সনকা এসে পায়ে পড়লাে চাঁদ সদাগরের; বললাে, তুমি মনসার পুজো করাে, তাহলে আমি ফিরে পাবাে আমার সন্তানদের। তবু চাঁদ অটল, সন্তান ও ধনের চেয়ে সম্মান তার কাছে বড়াে।

সনকার দুঃখ তার কোনাে পুত্র নেই, যারা ছিলাে তারা মরে গেছে। সে গােপনে মনসার স্তব করে পুত্র মেগে নিলাে। তবে মনসা বললাে, এ-পুত্র বিয়ের রাত্রেই সাপের কামড়ে মারা যাবে। চাঁদসদাগর চোদ্দ ডিঙ্গা সাজিয়ে বের হলাে বাণিজ্যে। তখন আবার এলাে মনসা, তার পুজো করতে বললাে। এবারও চাদ তাকে অপমান করে বিদায় দিলাে। চাঁদ বিদেশে গিয়ে চোদ্দ ডিঙ্গা ভরে পণ্য কিনলাে, যাত্রা করলাে গৃহাভিমুখে। তখন আবার মনসা এসে দাবি করলাে পুজো। চাঁদ আগের মতাে আবার তাকে অপমান করলাে। তাই প্রতিশােধ নেয়ার জন্যে পাগল হয়ে উঠলাে মনসা, চাঁদের ওপরে প্রতিশােধ না নিলে তার জ্বালা জুড়ােবে না। চাঁদের ডিঙ্গা আসছিলাে সমুদ্রপথে, মনসার আদেশে হঠাৎ জেগে উঠলাে সামুদ্রিক বাতাস, ক্ষেপে উঠলাে বজ্রবিদ্যুৎ। চারদিকে উত্তাল ঝড়ের দোলা, বাতাসের তাণ্ডব।

চাঁদের পণ্যভরা ডিঙ্গাগুলাে একটির পর একটি ডুবে গেলাে সমুদ্রের জলে। চাঁদ ভাসতে লাগলাে সমুদ্রে। এগিয়ে এলাে মনসা, চাঁদকে সে মারতে চায় না, চায় চাঁদের পুজো। মনসা একটি আশ্রয় করার মতাে বস্তু ভাসিয়ে দিলাে চাঁদের দিকে। চাঁদ প্রায় সেটিকে ধরতে যাচ্ছিলাে, এমন সময় তার মনে হলাে এটি মনসার দান। তাই সে ওই আশ্রয় গ্রহণ করলাে না। ভীষণ বলিষ্ঠ আত্মবিশ্বাসী পুরুষ চাঁদসদাগর। যাকে সে ঘৃণা করে তার দয়ায় বাঁচার ইচ্ছা নেই তার। সমুদ্রের ঢেউয়ে ভাসতে ভাসতে এক সময় চাঁদসদাগর তীরে এসে পৌছােলাে। নানা দুঃখে কেটে গেলাে তার জীবনের বারােটি বছর।

স্বদেশ স্বগৃহ থেকে দূরে কাটলাে তার এ-সময়; তার ধন নেই, ডিঙ্গা নেই, গৃহ নেই। অভিজাত ধনী চাঁদসদাগর বারাে বছর পরে ভিক্ষুকের মতাে ফিরে এলাে নিজ ঘরে। মনসার অত্যাচারের সে এক করুণ শিকার। তবু সে বিচলিত হওয়ার পাত্র নয়, কোনাে অত্যাচারকে সে চরম বলে ভাবে না। সে ভেঙে পড়ে না। এমন অসাধারণ লােক চাঁদসদাগর ।

দেশে ফিরে এসে দেখে সে যে-শিশুপুত্র রেখে গিয়েছিলাে, সে পরিপূর্ণ যুবকে পরিণত হয়েছে। নাম তার লখিন্দর। একমাত্র পুত্রের মুখ দেখে সুখী বােধ করলাে চাঁদ। চাঁদ অসীম আশাবাদী, পরাজয়হীন তার চিত্ত। লখিন্দর সুন্দর যুবক। চাঁদ নিজের পুত্রের বিয়ের আয়ােজন করতে লাগলাে। সুন্দরী পাত্রী মিললাে উজানিনগরে। মেয়ের নাম বেহুলা। বেহুলা নানা গুণে উজ্জ্বল মেয়ে। চাঁদ জানে বিয়ের রাতে বাসরঘরে সাপের কামড়ে লখিন্দরের মৃত্যু হবে। চাদ চায় এ-মৃত্যুকে ঠেকাতে। সে ডেকে আনলাে শিল্পীদের; তৈরি করতে বললাে ছিদ্রহীন লােহার বাসর, যাতে কিছুতেই ঢুকতে না পারে সাপ। চাঁদ যেমন উদ্যমপরায়ণ, মনসাও তেমনি প্রতিহিংসাপরায়ণ। সে শিল্পীদের স্বপ্নে দেখা দিয়ে বললাে ছিদ্র রাখতে, নইলে তাদের ভাগ্যে আছে মৃত্যু।

বিয়ে হয়ে গেলাে লখিন্দর-বেহুলার। বাসর রাতে ছিদ্র দিয়ে প্রবেশ করে বেহুলার দীর্ঘ কেশ বেয়ে শয্যায় উঠলাে মনসার দূত সাপ। কামড়ে দিলাে। মৃত্যু হলাে লখিন্দরের। সাপের কামড়ে যারা মরে, তাদের ভাসিয়ে দেয়া হয় ভেলায় করে নদীর জলে। অনেক রােদনের মধ্যে দিয়ে লখিন্দরকেও ভেলায় করে ভাসিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা হলাে। বেহুলা এবার বেদনা থেকে উঠে বসলাে, হলাে পাথরের মতাে শক্ত; বললাে সেও যাবে ভেলায় করে তার স্বামীর সাথে। সে ফিরিয়ে আনবে তার স্বামীকে স্বর্গলােক থেকে। বেহুলা সুন্দর, যেমন আনন্দে তেমনি বেদনায়, তেমনি প্রতিজ্ঞায়। কারাে কথা সে মানলাে
। স্বামীর সাথে সে উঠে বসলাে ভেলায়। নদীর নাম গাঙুর, ভেসে চলছে লখিন্দরের ভেলা, মৃত স্বামীর পাশে বসে আছে বেহুলা একরাশ বেদনার মতাে। দিনে দিনে শরীর থেকে ঝরে যাচ্ছে লখিন্দরের মাংস আর নদীর স্রোতে ভেসে চলছে ভেলা। ভেলা ঘাট থেকে ঘাটে ভেসে যায়। বেহুলার সামনে আসে নানা বিপদ, কিন্তু দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বেহুলা সেসব জয় করে। তার মধ্যে আছে জয়ের বীজ, জয় তার ভাই ।

ভাসতে ভাসতে ভেলা এসে পৌছােলাে এক ঘাটে, যেখানে প্রতিদিন স্বর্গের ধােপানি কাপড় ঘােয়। বেহুলা একদিন এক অবাক কাণ্ড দেখলাে। ধােপানি কাপড় ধুতে এসেছে একটি ছােটো শিশু নিয়ে। শিশুটি দুরন্ত, সারাক্ষণ দুষ্টুমি করে। ধােপানি এক সময় শিশুটিকে একটি আঘাত করে মেরে ফেললাে। পরে যখন কাপড় কাচা হয়ে গেলাে, তখন আবার সে তাকে বাঁচিয়ে নিয়ে চলে গেলাে। বেহুলা বুঝতে পারলাে, এ মানুষ বাঁচাতে জানে। পরদিন বেহুলা গিয়ে তার পদতলে পড়লাে, তার স্বামীকে বাঁচিয়ে দিতে অনুরােধ করলাে। ওই ধােপানির নাম নেতা। সে বললাে, একে আমি বাঁচাতে পারবাে না, কেননা একে মেরেছে মনসা। তুমি স্বর্গে যাও, দেবতাদের সামনে উপস্থিত হও। দেবতারা ভালােবাসে নাচ দেখতে। তুমি যদি তােমার নাচ দেখিয়ে তাদের মুগ্ধ করতে পারাে, তাহলে তারা তােমার স্বামীকে বাঁচিয়ে দেবে।

আশার মােম জ্বলে উঠলাে বেহুলার চোখে, মনে, সারা চেতনায়। সে স্বর্গে গেলাে। দেবতারা বসে আছে; তাদের সামনে বেজে উঠলাে বেহুলা, বেজে উঠলাে তার পায়ের নূপুর। বেহুলার নাচে চঞ্চল হয়ে উঠলাে চারদিক, তার নূপুরের ধ্বনিতে ভরে গেলাে স্বর্গলােক। বেহুলার নৃত্যে এক অসাধারণ ছন্দ। মুগ্ধ হলাে দেবতারা। তারা বেহুলাকে বর প্রার্থনা করতে বললাে। সে তার স্বামীর প্রাণ ভিক্ষা করলাে। মহাদেব রাজি হলাে তাতে। মনসা এসে বললাে, আমি লখিন্দরকে ফিরিয়ে দিতে পারি, যদি চাঁদ আমার পুজো করে। বেহুলা তাতে রাজি হলাে, এবং বললাে, তাহলে তােমাকে ফিরিয়ে দিতে হবে আমার শ্বশুরের সব কিছু। ফিরিয়ে দিতে হবে তাঁর পুত্রদের, তাঁর সমস্ত বাণিজ্যতরী। রাজি হলাে মনসা।

মনসা সব ফিরিয়ে দিলাে, বেঁচে উঠলাে লখিন্দর, ভেসে উঠলাে চোদ্দ ডিঙ্গা। চাঁদ পাগলের মতাে ছুটে এলাে বেহুলার কাছে। কিন্তু এসে যেই শুনলাে যে তাকে মনসার পুজো করতে হবে, তখন তার সকল আনন্দ নিভে গেলাে, সে দৌড়ে সরে গেলাে সবকিছুর থেকে। বেহুলা গিয়ে কেঁদে পড়লাে চাঁদের পায়ে। যে-চাঁদ মনসাকে চিরদিন অপমান করেছে, যে কোনােদিন পরাজিত হতে চায় নি, সে-চাদ বেহুলার অশ্রুর কাছে পরাজিত হলাে। বেহুলা বললাে, তুমি শুধু বাঁ হাতে একটি ফুল দাও, তাহলেই খুশি হবে মনসা। চাঁদ বললাে, আমি অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে বাঁ হাতে ফুল দেবাে। তাই হলাে। মুখ ফিরিয়ে বা হাতে একটি ফুল হেলাভরে ছুঁড়ে দিল চাদ। আর পৃথিবীতে প্রচারিত হলাে মনসার পুজো।

কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী

কবির নাম মুকুন্দরাম চক্রবর্তী। তাঁর কাব্যের নাম চণ্ডীমঙ্গলকাব্য। কবির উপাধি ছিলাে কবিকঙ্কন, উপাধিটি চমৎকার। মুকুন্দরাম চক্রবর্তী মধ্যযুগের একজন শ্রেষ্ঠ কবি; তাঁর কাব্য বাঙলা সাহিত্যে গর্বের ধন। কিন্তু এ-মহান কবি সম্বন্ধে আমরা জানি কতােটুকু? খুব সামান্য। কবি কাব্যের শুরুতে তাঁর জীবনকাহিনী বলেছেন। এ-কাহিনী সংক্ষিপ্ত, কবির সকল পরিচয় জানা যায় না। তবু আমাদের পিপাসা মেটাতে হয় কবির স্বরচিত সে-সামান্য কাহিনীর ঠাণ্ডা জলেই। তাঁর বইতে যে-পরিচয় পাওয়া যায়, তাতে মনে হয় কবির জন্ম হয়েছিলাে যােড়শ শতাব্দীর প্রথম দিকে, আর তিনি কাব্য লিখেছিলেন ১৫৭৫ অব্দের কাছাকাছি সময়ে।

কবির জীবনের যে-সামান্য কাহিনী আমরা জানি তাতে বিস্মিত হবার মতাে কোনাে উপাদান নেই। মনে হয় কবি ছিলেন সহজ সরল, তাঁর সারাটি জীবন কেটেছে শাদামাটাভাবে। শুধু তাঁর জীবনের শুরুতে দেখা দিয়েছিলাে কিছুটা সংঘাত। কবির নিজের ভাষায় সে কাহিনীর কিছুটা : শুন ভাই সভাজন কবিত্বের বিবরণ এই গীত হইল যেন মতে। উড়িয়া মায়ের বেশে, কবির শিয়র দেশে, চণ্ডিকা বসিল আচম্বিতে ॥ সহর সিলিমবাজ তাহাতে সজ্জনরাজ নিবসে নিয়ােগী গােপীনাথ। তাঁহার তালুতে বসি দামিন্যায় চাষ চষি নিবাস পুরুষ ছয় সাত ॥ ধন্য রাজা মানসিংহ বিষ্ণুপদাম্বুজ-ভৃঙ্গ গৌড়-বঙ্গ-উৎকল-অধিপ। সে মানসিংহের কালে প্রজার পাপের ফলে ডিহিদার মামুদ সরিপ ॥ উজির হলাে রায়জাদা বেপারিরে দেয় খেদা, ব্রাহ্মণবৈষ্ণবের হল্য অরি।

মাগে কোণে দিয়া দড়া পনর কাঠায় কুড়া নাহি শুনে প্রজার গােহারি । কবি বলছেন, ভাইয়েরা শােননা, আমি কী করে কবি হলাম। শুয়ে ছিলাম আমি, হঠাৎ আমার শিয়রে এসে বসলাে দেবী চণ্ডী। আমাকে তার গান রচনা করতে বললাে। এটুকু ব’লে কবি শুরু করেন তাঁর জীবনকাহিনী। সিলিমবাজ নামে এক শহর ছিলাে, তার জমিদার গােপীনাথ নিয়োেগী। কবির বসবাস গােপীনাথের তালুকে, দামুন্যা গ্রামে। কবির পূর্বপুরুষেরা অনেক দিন ধরে এ-গ্রামে বসবাস করে আসছেন। তারপর এলাে মানসিংহের রাজত্ব, গৌড়-বঙ্গ-উৎকলের সে রাজা। তার সময়ে কবির গ্রামের ডিহিদার হলাে মামুদ শরিফ । সে ছিলাে বড়াে অত্যাচারী। কবি তার অত্যাচারের বিবরণ দিয়েছেন। মামুদ শরিফ ব্রাহ্মণ বৈষ্ণব সকলের সাথে শত্রুতা করতে লাগলাে। সে জমির মাপ নিতে লাগলাে জমির কোণ থেকে কোণে দড়ি ধ’রে, তাতে জমির আয়তন বেশি মাপা হতে লাগলাে। পনেরাে কাঠায় এক কুড়া ধরতে লাগলাে। সে প্রজাদের কোনাে অভিযােগ শােনে ।

বেশ দীর্ঘ বিবরণ দিয়েছেন কবি। কবি আর তার পরিবারের চিরদিনের বসবাস যেগ্রামে, যে-গৃহে, সেখানে থাকতে পারলেন না। গ্রাম ছেড়ে তিনি পালালেন। তার সাথী হলাে পরিবারের লােকজন, আর ভাই রামানন্দ ও অনুচর দামােদর নন্দী। নদী বেয়ে এগােতে লাগলেন গন্তব্যহীন কবি। পথে দেখা দিলাে বিপদ, কবি পড়লেন রূপরায় নামক এক ডাকাতের কবলে। রূপরায় কবির সব কিছু হরণ করলাে। কবিকে আশ্রয় দিলেন যদুকুণ্ডু নামে এক লােক। কবি আবার যাত্রা শুরু করলেন, তাঁর নৌকো চলছে গােড়াই নদী বেয়ে, এসে পৌছােলেন একদিন তেউট্যা নামক এক স্থানে। এর পরে আবার শুরু হলাে নৌযাত্রা, এবারের নদীর নাম দারুকেশ্বর।

কবি পৌছােলেন বাতনগিরিতে, সেখান থেকে গেলেন কুচুট শহরে। কবির জীবনটা এ-সময়ে দুঃখে ভরা; –আহার নেই, বস্ত্র নেই, গৃহ নেই। এ-কুচুট শহরেই কবিকে ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে চণ্ডী কবিতা রচনা করতে বললাে। এরপর কবি আসেন আড়রা গ্রামে, সেখানে এসে কবি একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন। এএলাকার জমিদার বাঁকুড়া রায়। সে বেশ ভালাে লােক, কবিকে আশ্রয় দিলাে। জমিদারের ছিলাে এক পুত্র, নাম রঘুনাথ। কবি রঘুনাথের গৃহশিক্ষক নিযুক্ত হলেন। পিতার মৃত্যুর পরে রঘুনাথ হলাে জমিদার, আর তার সময়েই কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী লেখেন অমর কাব্য চণ্ডীমঙ্গল। | কবির পিতামহের নাম ছিলাে জগন্নাথ মিশ্র, পিতার নাম হৃদয় মিশ্র, বড়াে ভাইয়ের নাম কবিচন্দ্র।

তাঁর পুত্রের নাম শিবরাম, মেয়ের নাম যশােদা, পুত্রবধূর নাম চিত্রলেখা। এসব পাওয়া গেছে তাঁর নিজের লেখা জীবনকাহিনীতেই। কবি মুকুন্দরাম বড়াে কবি। তাঁর কবিতা অবশ্য কবিতা বলতে আমরা যে হৃদয়মাতানাে, মনভােলানাে জিনিশ বুঝি, তা নয়। তাঁর চণ্ডীমঙ্গলকাব্য হচ্ছে মধ্যযুগের উপন্যাস। তিনি জীবনের বাস্তব দিক এমনভাবে বর্ণনা করেছেন যে বিস্মিত হতে হয়। মুকুন্দরাম চক্রবর্তী কল্পনা করতে জানতেন না, খুব চতুর ঝকঝকে কথা বলতে জানতেন না; তিনি ছিলেন একজন বড়াে দর্শক। তার চারপাশে যা তিনি দেখতে পেতেন, তাই তিনি লিখতেন। এজন্যে তাঁর কাব্যে বাস্তবের বর্ণনা খুব পরিচ্ছন্ন। তিনি চারপাশে দেখেছেন কালকেতুর মতাে সহজ-সরল নির্বোধ ধরনের পুরুষ; দেখেছেন ফুল্লরার মতাে শ্রীময়ী গৃহিণী। দেখেছেন মুরারি শীলের মতাে ধূর্ত বণিক এবং ভাড়দত্তের মতাে ভণ্ড।

এদের তিনি বাস্তব জগতে যেমন হয়, তেমন করে সৃষ্টি করেছেন। এর ফলে তাঁর কাব্যে জীবন্ত হয়ে আছে কয়েকটি চরিত্র। উপন্যাসেই চরিত্র সৃষ্টি হয়ে থাকে, কবিতায় নয়। এজন্যে অনেক বলেন, কবি মুকুন্দরাম যদি মধ্যযুগে জন্মগ্রহণ না করে আধুনিক কালে জন্মাতেন, তবে তিনি কবি না হয়ে হতেন ঔপন্যাসিক। কেমন ঔপন্যাসিক? বঙ্কিমচন্দ্রের মতাে কল্পনাপ্রধান ঔপন্যাসিক নয়, হতেন শরৎচন্দ্র বা তারাশঙ্কর বা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতাে বাস্তবতার শিল্পী। তিনি যে মানুষকে চিনেছিলেন ভালােভাবে। কালকেতু দেবীর কৃপায় অনেক ধন পেয়েছে। কালকেতু জীবনে সােনা দেখে নি। সে সােনা লাভের পর সােনা ভাঙাতে যায় মুরারি শীল নামের এক বেণের কাছে। বেণে চতুর, কালকেতু বােকা। বেণে ভাবলাে, দেখি না একটু বাজিয়ে যদি কালকেতুকে ঠকাতে পারি। তাই বেণে মুরারি শীল বললাে : সােনা রূপা নহে বাপা এ বেঙ্গা পিতল। ঘষিয়া মাজিয়া বাপু করেছ উজ্জ্বল। মুরারি বলছে, এ সােনারুপাে নয়, পেতল। তুমি একে ঘষেমেজে উজ্জ্বল করে এনেছাে। কালকেতু বললাে, এ আমি দেবীর কাছ থেকে পেয়েছি। কবির ভাষায় :    কালকেতু বলে খুড়া না কর ঝগড়া। অংগুরী লইয়া আমি যাই অন্য পাড়া।

তখন বেণের টনক নড়ে। সে তাে চিনেছে এ-সােনার মতাে সােনা হয় না। তাই বেণে শেষে সােনা রেখে দেয়। এভাবে দেখা যায় মুকুন্দরাম চক্রবর্তী তার সকল পাত্রপাত্রীকে জীবন্ত করে এঁকেছেন, মধ্যযুগে এর তুলনা বেশি পাই না। কবি মুকুন্দরামের আরাে একটি বড়াে বৈশিষ্ট্য তিনি নির্বিকার। কবিরা আবেগে ফেটে পড়ে, বেদনায় কাতর হয়। কিন্তু এ-কবি অন্য রকম; আবেগ তাঁকে বিহ্বল করে না, বেদনা তাকে কাতর করে না, সুখ তাকে উল্লসিত করে না। কবি সব সময় সমান নির্বিকার, তিনি সব কিছুকে সহজভাবে গ্রহণ করেছেন। এ হচ্ছে একজন উৎকৃষ্ট ঔপন্যাসিকের গুণ। ঔপন্যাসিক তার পাত্রপাত্রীর সুখদুঃখে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন না, তিনি থাকেন ওই আনন্দবেদনার জগৎ থেকে দূরে । মুকুন্দরামও তেমনি।

মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গলকাব্য-এর প্রথম অংশের নায়ক কালকেতু, নায়িকা কালকেতুর স্ত্রী ফুল্লরা। এ-কাব্যে আছে আরাে অনেক পাত্রপাত্রী; যেমন, মুরারি শীল, ভাড়দত্ত, কলিঙ্গের রাজা। আছে বনের পশুরা, যাদের আচরণ একেবারে মানুষের মতাে। পশুরা যখন দেবীর কাছে প্রার্থনা জানায় কালকেতুর বিরুদ্ধে, তখন মনে হয় গরিব জনসাধারণ অভিযােগ জানাচ্ছে রাজার কাছে। কবি মুকুন্দরামের কাব্য পড়ে মনে হয় তিনি ছিলেন সহজ সরল সুখী রাষ্ট্রব্যবস্থাকামী। কালকেতু যখন রাজ্য স্থাপন করে তখন চাষী বুলান মণ্ডলকে সে যে-কথা বলে, তাতে এর পরিচয় আছে। ওই অংশ তুলে দিচ্ছি :

আমর নগরে বৈস যত ভূমি চাহ চষ
তিন সন বই দিও কর। হাল পিছে এক তংকা না করাে কাহার শংকা
পাট্টায় নিশান মাের ধর। খন্দে নাহি নিব বাড়ী রয়ে বসে দিও কড়ি
ডিহিদার না করিব দেশে। সেলামি কি বাঁশগাড়ি নানা বাবে যত কড়ি

না লইব গুজরাট বাসে । কালকেতু বুলান মণ্ডলকে বলছে, তুমি আমার নগরে এসে ইচ্ছেমতাে জমি চাষ করাে । তিন বছর পরপর কর দিয়াে। তুমি কর দেবে হালপ্রতি মাত্র এক টাকা। যখন ফসল পাকবে তখন আমার লােকেরা কোনাে অত্যাচার করবে না তােমাকে, এদেশে কোননা ডিহিদার থাকবে না। ডিহিদার মামুদ শরিফের অত্যাচারে কবি গ্রাম ছেড়েছিলেন; তাই তিনি কালকেতুর রাজ্যে কোনাে ডিহিদার রাখেন নি। গুজরাটে কোনাে ওপরি কর থাকবে না। কবি চেয়েছিলেন সুখী সাধারণ জীবন, যে-জীবন তাঁর দেশের মানুষ কখনাে পায় নি।

আরো পড়ুন

লাল নীল দীপাবলি বা বাংলা সাহিত্যের জীবন | হুমায়ুন আজাদ [03]

Bcs Preparation

লাল নীল দীপাবলি বা বাংলা সাহিত্যের জীবন | হুমায়ুন আজাদ [02]

Bcs Preparation