সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২১
Home » লাল নীল দীপাবলি বা বাংলা সাহিত্যের জীবন | হুমায়ুন আজাদ [02]
লাল নীল দীপাবলি

লাল নীল দীপাবলি বা বাংলা সাহিত্যের জীবন | হুমায়ুন আজাদ [02]

লাল নীল দীপাবলি বা বাংলা সাহিত্যের জীবন | হুমায়ুন আজাদ [03]

রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র

লাল নীল দীপাবলি : দেবী অন্নদা নদী পার হলাে ঈশ্বরী পাটনির খেয়ানৌকোয়। তীরে নেমে মাঝিকে জিজ্ঞেস করলাে, কী বর চাও তুমি, মাঝি? যা চাও তাই পাবে। মাঝি গরিব মানুষ, খেয়া পারাপার করে তার জীবন চলে। মাঝি দেবীর কাছে চাইতে পারতাে রাজ্য, বাড়িভর্তি সােনারুপাে, মুক্তোপান্না। তার অভাবের দিন কেটে যেতে দেবীর দয়ায়! মাঝি ওসব কিছু চাইলাে না, সে দেবীর কাছে নিবেদন করলাে একটি ছােটো প্রার্থনা। বললাে, আমার সন্তান যেনাে থাকে দুধে ভাতে।’ মাঝির এ-প্রার্থনার মধ্যে আমরা মধ্যযুগের আঠারােশতকের জীবনের পরিচয় পাই। যে-কবি এ-পংক্তিটি রচনা করেছেন, তিনি মধ্যযুগের একজন শ্রেষ্ঠ কবি। নাম ভারতচন্দ্র রায়; উপাধি রায়গুণাকর।

ভারতচন্দ্র জন্মেছিলেন আঠারােশতকের প্রথম দিকে, আনুমানিক ১৭১২ খ্রিস্টাব্দে। তিনি মধ্যযুগের আরেক বড়াে কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর থেকে প্রায় দুশাে বছরের ছােটো। ভারতচন্দ্র যখন জন্ম নেন, তখন মধ্যযুগ শেষ হয়ে আসছে। আগে সমাজে যে-স্থিরতা ও শান্তি ছিলাে, তাও নষ্ট হচ্ছে দিনেদিনে। সাহিত্যের একটি যুগ যখন শেষ হয়ে আসতে থাকে তখন শেষের বছরগুলােতে দেখা দেয় নানারকম পতন। সমাজে যেমন সাহিত্যেও তেমন। ভারতচন্দ্রের সময়ে সমাজের পতন শুরু হয়েছিলাে, তাঁর মৃত্যুর তিন বছর আগে আমাদের দেশ দখল করে নেয় শাদা ইংরেজরা। ভারতচন্দ্র এক পতনশীল সমাজের কবি, তবু তিনি প্রতিভাবলে অসাধারণ সাহিত্য রচনা করে গেছেন।

ভারতচন্দ্র বর্ধমানের (বর্তমান হাওড়া জেলা] পেঁড়ােবসন্তপুর বা পাণ্ডুয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম নরেন্দ্রনারায়ণ রায়। ভারতচন্দ্রের জীবন বেশ রােমাঞ্চপূর্ণ । তার জন্মের পরেই তাঁদের পরিবারে নেমে আসে দুর্দিন। ১৭১৩ সালে বর্ধমানের রাজা রসুট আক্রমণ করে, এবং জয় করে নেয় ভবানিপুরের গড়। তখনকার ভুরসুট পরগণায় ছিলাে পাণ্ডুয়া গ্রাম। এ-গ্রাম চলে যায় বর্ধমানের রাজার অধিকারে। এর ফলে ভারতচন্দ্রের পিতা নরেন্দ্রনারায়ণ রায় হারিয়ে ফেলেন তার জমিজমা, ধনসম্পদ। ভারতচন্দ্রের বয়স যখন দশের মতাে তখন তিনি পালিয়ে যান মামাবাড়ি। মামারা যে-গ্রামে বাস করতাে, তার নাম নওয়াপাড়া। সেখানে বসবাসের সময়ে তিনি এক পণ্ডিতের টোলে সংস্কৃত ব্যাকরণঅভিধান পড়েন। তাঁর পড়াশােনাটা হয়েছিলাে বেশ ভালাে রকমের, বেশ পণ্ডিত হয়ে উঠেছিলেন অল্প বয়সেই ভারতচন্দ্র।

আরো পড়ুন : লাল নীল দীপাবলি বা বাংলা সাহিত্যের জীবন | হুমায়ুন আজাদ [01]

তিনি বিয়ে করেন মাত্র চোদ্দ বছর বয়সে বিয়ে করে পড়া শেষ করে ভারতচন্দ্র বাড়ি ফিরে আসেন। কিন্তু সেখানে অভিনন্দনের বদলে লাভ করেন তিরস্কার। তখন রাজভাষা ছিলাে ফারসি, তাই সমাজে ফারসির মর্যাদা খুব। কেননা ফারসি শিখলে পাওয়া যেতাে ভালাে চাকুরি। কিন্তু তা না শিখে কবি শিখেছেন মৃতভাষা; সমাজে যার কদর কম, সে সংস্কৃত ভাষা। বাড়ির লােকেরা তাকে সারাক্ষণ জ্বালাতে থাকে এজন্যে। ভারতচন্দ্র এতে ক্ষুব্ধ হন। মনস্থির করেন তিনিও ফারসি শিখবেন এবং অনেকের চেয়ে ভালােভাবে শিখবেন। আবার পালান ভারতচন্দ্র, এবার আসেন হুগলি জেলার দেবানন্দপুরের রামচন্দ্র মুনশির বাড়িতে, এবং শিখতে থাকেন অর্থকরী রাজভাষা ফারসি। খুব উৎসাহের সাথে শিখতে থাকেন ফারসি ভাষাটি ভারতচন্দ্র। তাঁর শিক্ষক এতে খুব মােহিত হন। রামচন্দ্র মুনশির বাড়িতেই তিনি সর্বপ্রথম কবিতা রচনা করেন। ভারতচন্দ্র কবি হন।

ফারসি ভাষাটি ভালােভাবে শিখে ১৭২৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি বাড়ি ফেরেন। সম্পত্তি দেখাশােনার ভার পড়ে তাঁর ওপর, একাজে তিনি বর্ধমান যান। এখানে ঘটে এক অঘটন, কী এক কারণে কবিকে গ্রেফতার করে বর্ধমানের রাজা। কিন্তু বেশিদিন বন্দী থাকেন নি; পালান তিনি কারাগার থেকে। এমনভাবে পালান যাতে বর্ধমানরাজ তাঁকে আর ধরতে না পারে। পালিয়ে বর্ধমানের রাজার রাজ্যের সীমার বাইরে চলে যান কবি, হাজির হন ওড়িষ্যার কটকে। ১৭৪২ থেকে ১৭৪৫ পর্যন্ত তিনি ঘুরে বেড়ান ওড়িষ্যায়। এর পরে তিনি হন সন্ন্যাসী, সন্ন্যাসীর বিচিত্র পােশাকে কিছুদিন কাটান ভারতচন্দ্র। কিন্তু আত্মীয়দের হাতে ধরা পড়তে বেশি দেরি হয় নি। সন্ন্যাসীদের সাথে একবার তিনি যাচ্ছিলেন বৃন্দাবনে, পথে হুগলি জেলার কৃষ্ণনগর গ্রাম। সেখানে তাঁর সাথে দেখা হয় তার কিছু আত্মীয়ের। কবিকে ছাড়তে হয় সন্ন্যাসীর বেশ, ফিরে আসতে হয় আবার সাধারণ মানুষের ভিড়ে।

ভারতচন্দ্র আত্মীয়দের হাতে ধরা না পড়লেও একদিন না একদিন সন্ন্যাসীর বেশ ফেলে বাড়ি ফিরে আসতেনই। কেননা তার চরিত্রের মধ্যেই ছিলাে না সন্ন্যাসী হওয়ার বীজ। তিনি বরং সন্ন্যাসীদের উপহাস করতে পারেন। সন্ন্যাসীবেশে দেশেদেশে যখন আর ঘােরা তার পক্ষে সম্ভব হলাে না, ফিরে এলেন দেশে, করতে লাগলেন চাকুরির চেষ্টা। ফরাশডাঙ্গায় তখন ফরাশি সরকারের বেশ বড়াে কর্মচারী এক ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী। ভারতচন্দ্র গিয়ে ধরলেন তাকে। ইন্দ্রনারায়ণ দেখলাে ভারতচন্দ্র ভালাে কবি, ছন্দ গাঁথেন অনায়াসে, তাই ভাবলাে এর হওয়া উচিত কবির চাকুরি।

সে নবদ্বীপের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের কাছে পাঠালাে ভারতচন্দ্রকে। ভারতের গুণে মুগ্ধ হলাে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র; ভারতচন্দ্রকে নিজের সভাকবি হিশেবে বরণ করে নিলাে। কৃষ্ণচন্দ্র ভারতচন্দ্রকে উপাধি দিয়েছিলাে রায়গুণাকর। ভারতচন্দ্র কবি হিশেবে লাভ করেন পরম খ্যাতি এবং সাংসারিক জীবনেও তার সাফল্য অনেকের ঈর্ষার বস্তু হয়েছিলাে। তিনি মাসিক বেতন পেতেন চল্লিশ টাকা, তাছাড়া পেয়েছিলেন রাজার কাছ থেকে বেশ জমিজমা।

ভারতচন্দ্র ছিলেন হাস্যরসিক। একটি মজার গল্প আছে ভারতচন্দ্র সম্বন্ধে। কবি তাঁর বিখ্যাত কাব্য “বিদ্যাসুন্দর” রচনা শেষ করেছেন। রচনা শেষ করেই তিনি পা বাড়ালেন রাজার উদ্দেশে। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে উপহার দিলেন কাব্যটি। রাজা তখন অন্য কাজে বিশেষ ব্যস্ত, তাই কাব্যটির পাতা না উল্টিয়ে পাশে রেখে দিলাে। ভারতচন্দ্র বলে উঠলেন, মহারাজ করছেন কী, সব রস যে গড়িয়ে পড়বে!’ রাজা তখন অন্য কাজ রেখে চোখের সামনে খুলে ধরলাে “বিদ্যাসুন্দর কাব্য”, যে-কাব্য বাঙলা ভাষায় নানা কারণে আলােড়ন জাগিয়ে যাচ্ছে আজ দুশাে বছর ধরে।

ভারতচন্দ্র ছিলেন রাজসভার কবি, তাই তাঁর কাব্যে আছে চাতুর্য, বুদ্ধির খেলা, আছে পাণ্ডিত্য। তিনি মুকুন্দরামের মতাে সহজ সরল নন, সহজ অনুভূতি তাকে মুগ্ধ করে না। ভারতচন্দ্র সর্বদা খুঁজেছেন এমন বস্তু যা পাঠককে চমকে দেবে। তিনি কথা বানিয়েছেন ধারালাে করে, চকচকে তরবারির মতাে। এ-কবির সব কিছুতে আছে বিদ্রুপ, তিনি সকলকে ঠাট্টা করে গেছেন। তাঁর কাব্য একটি, নাম অন্নদামঙ্গলকাব্য। কাব্যটির আছে তিনটি ভাগ; এক ভাগের নাম ‘অন্নদামঙ্গল’, আরেক ভাগের নাম ‘বিদ্যাসুন্দর’, এবং আরেক ভাগ ভবানন্দ-মানসিংহ কাহিনী। ভারতচন্দ্র এ-কাব্যে তাঁর রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পূর্বপুরুষ ভবানন্দের গুণকীর্তন করতে চেয়েছিলেন।

ভারতচন্দ্রের কথা মনে হলেই মনে পড়ে তাঁর সময়কে। সে-সময় নানা দিক দিয়ে পতিত হচ্ছে, সমাজের ভিত ভেঙে যাচ্ছে, দেশের শাসনব্যবস্থায় নানা বিপর্যয় দেখা দিচ্ছে। কাল যখন নষ্ট হয়ে যায়, তখন কবিরাও নষ্ট হন। ভারতচন্দ্রেরও হয়েছিলাে তেমনি। তিনি জীবনকে গভীরভাবে না দেখে দেখেছেন হাল্কাভাবে, বাঁকা দৃষ্টিতে।

তবে তাঁর প্রতিভা ছিলাে অসাধারণ। চমৎকার কথা বলায়, ছন্দের আন্দোলন সৃষ্টিতে তাঁর জুড়ি নেই মধ্যযুগে। কথা বলেন তিনি বিস্ময়কর চাতুর্যের সঙ্গে। যেমন মধ্যযুগের সকল কবিই বলেছেন, তার নায়িকা দেখতে অত্যন্ত সুন্দরী, দেখতে একেবারে চাঁদের মতাে। এ নিয়ে তামাশা করেছেন ভারতচন্দ্র। তিনি তার নায়িকার রূপ বর্ণনা করতে এসে দেখলেন, এ বড়াে কঠিন কাজ, কেননা কয়েকশাে বছর ধরে কয়েকশাে কবি বলে গেছেন, তাঁদের নায়িকারা দেখতে চাঁদের মতাে। তাই ভারতচন্দ্র লিখলেন : কে বলে শারদ শশী সে মুখের তুলা। পদনখে পড়ি তার আছে কতগুলা

এমন চমত্তার কথা তিনি অবিরাম বলেছেন, তাঁর অনেক কথা প্রবাদে পরিণত হয়েছে। যেমন, মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন’, নগর পুড়িলে দেবালয় কি এড়ায়। ছন্দে ছিলাে তাঁর অসীম অধিকার, তাই তাঁর কবিতা পড়ার সময়ে বিচিত্র ছন্দের রাজ্যে প্রবেশ করেছি বলে মনে হয়।

উজ্জ্বলতম আলাে : বৈষ্ণব পদাবলি

মঙ্গলকাব্য থেকে বৈষ্ণব পদাবলিতে আসা হলাে একটি গুমােট সালােকিত দালানের ভেতর থেকে উজ্জ্বল সবুজ দক্ষিণের বাতাসে মাতাল বনভূমিতে আসা। মঙ্গলকাব্য পড়তে পড়তে ক্লান্তি আসে; কেননা এগুলাের আকার বিরাট, আর এতাে অকাব্যিক বিষয় এগুলােতে ইনিয়েবিনিয়ে বলা হয় যে বেশিক্ষণ পড়া যায় না। অন্যদিকে বৈষ্ণব পদাবলি হচ্ছে কেবল কবিতার রাজ্য, সেখানে বাজে বিষয়ের বাড়াবাড়ি নেই, ভালাে কবিতার যা ধন কবিরা এ-কবিতাগুলােতে সে-সব চয়ন করেছেন থরেবিথরে। আর এতাে আবেগও যে আছে মানুষের, তা এ-কবিতাগুলাে না পড়লে সত্যি বােঝা অসম্ভব। বৈষ্ণব কবিতার জন্যেই অনেক কিছুর নাম শুনলেই আমরা আবেগে কাতর হয়ে পড়ি।

কোনাে বাঙালি যদি শশানে যমুনা নদীর নাম, বা তমাল তরুর কথা, তাহলে তার পক্ষে কিছুক্ষণের জন্যে হ’লেও আনমনা না হয়ে উপায় থাকে না। এ-বিষয়গুলাে বৈষ্ণব কবিরা এতাে মধুর-নিবিড় আবেগে বর্ণনা করেছেন যে আমাদের হৃদয়ের মধ্যে সেগুলাে স্থান করে নিয়েছে। আমরা অনেকেই তমাল তরু দেখি নি, দেখি নি যমুনা নদী, তবু কেননা এরা আমাদের স্বপ্নে ভরে তােলে? এর মূলে আছে বৈষ্ণব কবিতা, যার প্রধান পাত্রপাত্রী রাধা আর কৃষ্ণ। রাধা এবং কৃষ্ণকে নিয়ে মধ্যযুগে সবচেয়ে সৌরভময় ফুল ফুটেছিলাে, সে-ফুলের নাম বৈষ্ণব কবিতা।

বৈষ্ণব কবিতা বাঙলা কবিতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। একে যদি আলাের সাথে তুলনা করি তাহলে বলবাে মধ্যযুগে এমন আলাে আর জ্বলে নি।
চতুর্দশ শতকের শেষ দিক থেকে বৈষ্ণব কবিতা রচিত হতে থাকে। এর প্রধান পাত্রপাত্রী রাধা ও কৃষ্ণ। এ-সময়ে বিশেষ কোনাে ধর্মীয় আবেগে রচিত হয় নি বৈষ্ণব পদাবলি। ১৪৮৬ অব্দে জন্ম নেন চৈতন্যদেব (১৪৮৬-১৫৩৩)। তিনি প্রচার করেন বৈষ্ণব ধর্ম এবং তার পর থেকে এ-কবিতার মধ্যে বৈষ্ণব দর্শন স্থান পেতে থাকে। অসংখ্য কবি রচনা করেছেন বৈষ্ণব কবিতা, সকলের নামও আমরা জানি না। কেবল বৈষ্ণব কবিরাই একবিতা রচনা করেন নি, অনেক মুসলমান কবিও রয়েছেন, যাঁরা পরম আবেগে চমৎকার বৈষ্ণব পদ রচনা করেছেন।

অনেক কবি ছিলেন, তাঁদের মধ্যে অনেকে ছিলেন ভক্ত কবি। ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেন (১৮৬৬-১৯৩৯] ১৬৫ জন বৈষ্ণব কবির নাম জানিয়েছেন আমাদের। এ ছাড়াও ছিলেন আরাে অনেক কবি, যাদের নাম কালস্রোতে হারিয়ে গেছে। কোনাে কোনাে বৈষ্ণব কবি আবার বেশ মজার কাজ করেছেন। তারা খ্যাতি কামনা করেন। নি, তারা চেয়েছেন নিজেদের রচিত কবিতাকে শুধু আমােদর উদ্দেশে ভাসিয়ে দিতে। তাই তাঁরা কবিতায় নিজেদের নাম ব্যবহার না করে ব্যবহার করেছেন কখনাে ছদ্মনাম, কখনাে ব্যবহার করেছেন পূর্ববর্তী কোন মহৎ কবির নাম। তাই তাদের আর পৃথক করে আজ চেনা যায় না। কয়েকজন কবি আছেন অতি বিখ্যাত কবি, বৈষ্ণব কবিতার কথা উঠলেই তাদের নাম মনে আসে।

তারা হচ্ছেন বিদ্যাপতি (জন্ম ১৩৭৪], চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস (জন্ম ১৫২০-১৫৩৫, গােবিন্দদাস (১৫৩৪-১৬১৩]। বৈষ্ণব কবিতার তারা চার মহাকবি। আরও যে অনেক কবি আছেন, তাদের কিছু নাম : অনন্তদাস, উদ্ধদাস, নরােত্তম দাস, নাসির মামুদ, বলরাম দাস, বৈষ্ণব দাস, লােচন দাস, শ্যাম দাস, সেখ জালাল, শেখর রায়, তুলসী দাস। বৈষ্ণব কবিতা ছােটোছােটো। কবিরা রাধা ও কৃষ্ণের মনের কথা একবিতাগুলােতে বলেছেন। মনের কথা মানেই হলাে আবেগ, সুখের আবেগ, বেদনার আবেগ। আসলে এ-কবিতাগুলােতে রাধাকৃষ্ণের নামে কবিদের মনের আবেগ লক্ষধারায় প্রবাহিত হয়েছে। আর কে না জানে যে ভালাে কবিতার বিষয় হলাে মনের কথা? মধ্যযুগে এ-রকম আর দেখা যায় নি।

মঙ্গলকাব্য পড়লে বুঝতে কষ্ট হয় যে মানুষের মন বলে একটি বস্তু আছে এবং সে-মন সুখে উল্লসিত হয়, বেদনায় হয় কাতর। বৈষ্ণব কবিতায় এসে দেখা যায় মনের রাজত্ব, যেননা মন আর তার আকুলতা ছাড়া বিশ্বের সব কিছু মিথ্যে। বৈষ্ণব কবিরা তাদের কবিতায় ঘর সংসার সমাজ বিশ্ব সকল কিছুকে মিথ্যে বলে ঘােষণা করেছেন; একমাত্র সত্যি বলে দেখিয়েছেন হৃদয়কে। তাই বৈষ্ণব কবিতায় সর্বত্র দেখা যায় হৃদয়ের জয় । হৃদয়ই বৈষ্ণব পদাবলির বিশ্ব।

বৈষ্ণব কবিতার বিষয় রাধা ও কৃষ্ণের ভালােবাসা। এরা একজন চায় অপরজনকে, কিন্তু এদের মধ্যে বিপুল বাধা। এ-বাধাকে সরাতে চেয়েছেন কবিরা। এ-প্রসঙ্গে একটি কথা মনে রাখা দরকার, তা হচ্ছে মধ্যযুগের সব কবিতাই ধর্মের বাহন। বৈষ্ণব কবিতাও তাই। বৈষ্ণবরা মনে করে এই যে সৃষ্টি তার একজন স্রষ্টা আছে। এ-স্রষ্টা কিন্তু নির্দয় নয়, সে তার সৃষ্টিকে ভালােবাসে। সৃষ্টিও তার স্রষ্টাকে ভালােবাসে। তাই সৃষ্টি ও স্রষ্টা উভয়ে চায় মিলিত হতে, কিন্তু পারে না। যে-তত্তের কথা বললাম, বৈষ্ণব কবিরা রাধা ও কৃষ্ণের মধ্য দিয়ে সে-কথাই বােঝাতে চেয়েছেন। রাধা হচ্ছে সৃষ্টি বা বৈষ্ণবদের ভাষায় জীবাত্মা’ এবং কৃষ্ণ হচ্ছে স্রষ্টা বা বৈষ্ণবদের ভাষায় ‘পরমাত্মা’। এ-জীবাত্মা-পরমাত্মার মিলনবিরহের কথা বলতে চেয়েছেন বৈষ্ণব কবিরা। কিন্তু আমাদের ধর্মের বা তত্ত্বের দিকে বিশেষ আকর্ষণ নেই, আমরা প্রাণভরে চাই শুধু অসাধারণ এ-কবিতাগুলােকে। বৈষ্ণব কবিতা গীতিকবিতা। যেনাে প্রাণের ভেতর থেকে আকুল হয়ে বেরিয়ে এসেছে সুরের মালা।

বৈষ্ণব কবিতার কোনােটির বিষয় কৃষ্ণের রূপ, কোনােটির বিষয় রাধার রূপ, কোনােটির বিষয় দুজনের মিলন। এ-রকম অনেক বিষয়কে তাদের কবিতার মধ্যে ধরে রেখেছেন কবিরা। বিষয় অনুসারে এ-কবিতাগুলােকে নানা ভাগে ভাগ করা হয়। ভাগগুলাের কোনােটির নাম অনুরাগ, কোনােটির নাম বংশী, কোনােটির নাম আক্ষেপ, আবার কোনােটির নাম বিরহ ইত্যাদি। এর ফলে সমস্ত বৈষ্ণব কবিতা মিলে গড়ে উঠেছে এক চমৎকার গীতিনাট্য। অন্য এক রকমেও এ-কবিতাগুলােকে ভাগ করা যায়। সেটি হলাে রসের ভাগ। মানুষের মনের যে-আবেগঅনুভূতি নিয়ে রচিত হয় সাহিত্য, তাকে প্রাচীনকালের সাহিত্যতাত্ত্বিকেরা কতকগুলাে ‘রস’-এ ভাগ করেছেন। যেমন করুণরস, বীররস ইত্যাদি। বৈষ্ণবদের মতে রস পাঁচ প্রকার। তাঁরা পাঁচ রকমের রস পরিবেশন করেছেন কবিতায়। রসগুলাে হচ্ছে শান্ত, দাস্য, বাৎসল্য, সখ্য, মধুর।

বৈষ্ণব কবিরা যেমন সংখ্যাহীন, তেমনি অসংখ্য তাদের রচিত কবিতা। কারাে পক্ষে বলা সম্ভব নয় ঠিক কতােগুলাে বৈষ্ণব কবিতা আছে বাঙলা ভাষায়। মধ্যযুগে কবিতা রচিত হতাে মুখেমুখে, গাওয়া হতাে গানের আসরে। সাধারণত ওগুলাে লিখে রাখা হতাে না; মানুষ ওগুলােকে গেঁথে রাখতে নিজেদের স্মৃতিতে। কিন্তু স্মরণশক্তি ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে, এবং যিনি মুখস্থ করে রেখেছেন, তাঁর মৃত্যুর পরে ওগুলাে হারিয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। এভাবে অনেক পদ হারিয়ে গেছে, আমাদের কাছে এসে পৌছােতে পারে নি। তাই মধ্যযুগেই শুরু হয়েছিলাে এ-গানগুলােকে সংকলিত করার চেষ্টা। এর ফলে বেঁচে আছে গানগুলাে। বৈষ্ণব কবিতা যিনি সবার আগে সংকলন করেন, তার নাম বাবা আউল মনােহর দাস।

হুগলি জেলার বদনগঞ্জে তার সমাধি রয়েছে। তিনি সম্ভবত ষােড়শ শতাব্দীর শেষপ্রান্তে বৈষ্ণব কবিতা সংকলন করেন। তাঁর এ-সংকলনগ্রন্থটি আকারেও বিশাল, এর নাম পদসমুদ্র। আসলেই এটি এক মহাসাগর, কবিতার মহাসমুদ্র। তিনি এ-গ্রন্থে সংগ্রহ করেন পনেরাে হাজার বৈষ্ণব কবিতা। তার পরে যিনি বৈষ্ণব কবিতা সংকলন করেন, তিনি রাধামােহন ঠাকুর। তাঁর বইয়ের নাম পদামৃতসমুদ্র। আঠারােশতকের প্রথম দিকে আরাে একটি বৈষ্ণব কবিতাসংকলন প্রকাশ করেন বৈষ্ণব দাস। তাঁর বইয়ের নাম পদকল্পতরু। এর পরে আরাে অনেক সংকলন হয়েছিলাে, যেমন গৌরীমােহন দাস কবিতা সংকলন করেছিলেন পদকল্পলতিকা নামে, হরিবল্লভের সংকলনের নাম গীতিচিন্তামণি, প্রসাদ দাসের সংকলনের নাম পদচিন্তামণিমালা। এ-সব সংকলনে তিরিশ হাজারেরও অধিক কবিতা সংকলিত হয়েছিলাে।

আরো পড়ুন :   লাল নীল দীপাবলি বা বাংলা সাহিত্যের জীবন | হুমায়ুন আজাদ [01]

বৈষ্ণব কবিতা আকারে ছােটো; এ-কবিতায় জীবনের সমস্ত মােটা কথা পরিহার করে ঘেঁকে তােলা হয়েছে মনের আবেগের সারটুকু। তাই এখানে পাওয়া যায় মানুষের দুঃখের এবং আনন্দের সারসত্তা। রাধার আনন্দ, রাধার বেদনায় আমরা নিজেদের আনন্দবেদনাকে পাই। মধ্যযুগে, এ-কাজটি করতে পেরেছিলেন বৈষ্ণব কবিরা। বৈষ্ণব কবিরা ছিলেন অতিশয় সৌন্দর্যচেতন। সেকালে তাঁরা সৌন্দর্যের যে-সূক্ষ্ম বর্ণনা দিয়েছেন, তা বিস্ময়কর।

রাধা বা কৃষ্ণের সৌন্দর্য বর্ণনার কালে, বা তমালের একটি শাখা বর্ণনার কালে, অথবা যমুনার নীলজলের কথা বলার সময় তারা পৃথিবীকে স্বপ্নলােকে পরিণত করেছেন। তাঁদের সাথে তুলনা করা যায় শুধু আর একজন কবিকে, তার নাম রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথ যদি মধ্যযুগে জন্ম নিতেন, তবে তিনি হতেন একজন বৈষ্ণব কবি। | অপূর্ব এ-সব কবিতার উপমা; অতুলনীয় এগুলাের ছবি। ভাষার ওপর তাঁদের অধিকার ছিলাে বিধাতার মতাে; তারা বেছে নিয়েছিলেন বাঙলা ভাষার সে-সব শব্দ, যা মনােহর, মায়াবী, স্বপ্নের মতাে। তাই বিদ্যাপতির কবিতা, চণ্ডীদাসের কবিতা আমাদের আকুল করে তােলে। তারা যখন উপমা দেন মনে হয় এ-রকম আর হয় না; তাঁরা যখন হৃদয়াবেগ প্রকাশ করেন তাতে আমরা আবেগাতুর হয়ে পড়ি। বিদ্যাপতি কবিতা রচনা করতেন ব্রজবুলি নামক এক ভাষায়। এটি বাঙলা ভাষা নয়, আবার একে অবাঙলাও বলা যায় না। এতে সামান্য কৃত্রিমতা আছে, তবে এতে আছে সুমধুর ধ্বনি, সুর; তাই এতে মুগ্ধ হয়ে থাকা যায় না। বিদ্যাপতির একটি পদ তুলে আনছি এখানে, যার ভাষা আর কল্পনার মধুরতায় বিভাের হতে হয় : যব গােধূলি সময় বেলি। ধনি মন্দির বাহির ভেলি । নব জলধর বিজুরি রেহা দ্বন্দ্ব পসারি গেলি । ধনি—অল্প বয়েসী বালা। জনু গাঁথনি পুহপ-মালা। ভাষাটি বুঝতে একটু কষ্ট হচ্ছে হয়তাে।

কিন্তু একবার বুঝে ফেললে উল্লসিত হ’তে হবে। রবীন্দ্রনাথ বাল্যকালে এ-ভাষার যাদুতে এতাে মুগ্ধ হয়েছিলেন যে তিনি এ-ভাষা শিখে অনেক কবিতা লিখেছিলেন। এ-ভাষার নামই ব্রজবুলি। এ-ভাষায় কোনাে অমধুর শব্দ নেই। কঠিন শব্দ নেই। যে-সকল শব্দ উচ্চারণ করলে শুনতে ভালাে লাগে না, তাদের বদলে এখানে সুন্দর করা হয়। এজন্যে ব্রজবুলি খুব মিষ্টি, সুরময়, গীতিময় ভাষা। ওপরের অংশে এজন্যে ‘বেলা হয়েছে ‘বেলি’, বিদ্যুৎ’ হয়েছে ‘বিজুরি’, ‘রেখা হয়েছে ‘রেহা। কবি রাধার বর্ণনা দিচ্ছেন কবিতাটিতে। রাধা খুব রূপসী, তখন গােধূলি বেলা। কবি বলছেন, যখন গােধূলি বেলা, তখন রাধা ঘর থেকে বাইরে এলাে। সে এক অপরূপ দৃশ্য। কবি রাধার বাইরে আসার দৃশ্যকে একটি উপমা দিয়ে বুঝিয়েছেন। বলছেন, হঠাৎ যেনাে মেঘের কোলে বিদ্যুৎ চমকে গেলাে। তারপর বলছেন, রাধা অল্প বয়সের মেয়ে। কিন্তু কেমন মেয়ে ? যেনাে ফুলের গাঁথা মালা।

সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে বৈষ্ণব কবিতায় যেমন শিউলি ভােরের বেলা ছড়িয়ে থাকে শিউলি বনের অঙ্গনে। এ-কবিতায় ঢল ঢল কাঁচা অঙ্গের লাবণ্যে বিশ্ব ভেসে যায়। কৃষ্ণ এখানে সৌন্দর্য ছড়ায়, রাধা এ-কবিতায় সৌন্দর্যের দেবী হয়ে আসে। চারদিকে ভাসে রাধার মনের আকুল কান্নার মধুর ধ্বনি। বৈষ্ণব কবিতার রাজ্যে সারাক্ষণ বাঁশি বেজে যাচ্ছে, সে-বাঁশিতে পাগল হয় রাধা, পাগল হই আমরা, সবাই। এমনকি নাম শুনেও রাধা আকুল হয়ে ওঠে কৃষ্ণের জন্যে। চণ্ডীদাসের একটি পদে রয়েছে :

সই কেবা শুনাইল শ্যাম নাম। কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল গাে
আকুল করিল মাের প্রাণ। জানি কতেক মধু শ্যাম নামে আছে গাে
বদন ছাড়িতে নাহি পারে। জপিতে জপিতে নাম অবশ করিল গাে
কেমন পাইব সই তারে ।

এ-পদটি সহজ সরল, কিন্তু এর আবেগ তীব্র বাঁশরির সুরের মতাে। রাধা শুধু শ্যাম অর্থাৎ কৃষ্ণের নাম শুনেছে, তাতেই সে আকুল হয়ে উঠেছে। কবি তার হৃদয়ের আকুলতাকে ছন্দে গেঁথে দিলেন, আর যুগযুগ ধরে সে-ছন্দের ঢেউ রাধার আকুলতা হয়ে আমাদের বুকে এসে দোলা দিতে লাগলাে।
বৈষ্ণব কবিতার চার মহাকবি বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, গােবিন্দদাস, জ্ঞানদাস। তাদের মধ্যে বিদ্যাপতি ও গােবিন্দদাস লিখেছেন ব্রজবুলি ভাষায়, আর চণ্ডীদাস ও জ্ঞানদাস লিখেছেন খাঁটি বাঙলা ভাষায়। বিদ্যাপতি ও গােবিন্দদাস বেশ সাজানােগােছানাে, তাঁরা আবেগকে চমৎকাররূপে সাজাতে ভালােবাসেন। ভেবেচিন্তে, চমত্তার উপমাউৎপ্রেক্ষায় গেঁথে এ-দুজন কবিতা লিখেছেন।

অন্যদিকে চণ্ডীদাস ও জ্ঞানদাস সহজ সরল আবেগ প্রকাশ করেন সহজ সরল ভাষায়; কিন্তু ভাষার মধ্যে সঞ্চার করে দিয়েছেন নিজেদের প্রাকৃত হৃদয়ের তীব্র চাপ। এ-দুজনের কবিতা যেনাে বনফুল; আর বিদ্যাপতি ও গােবিন্দদাসের কবিতা বাগানের লালিত পুষ্প। জ্ঞানদাসের একটি কবিতার কয়েকটি পংক্তি তুলে আনছি : রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভাের। প্রতি অঙ্গ লাগি কান্দে প্রতি অঙ্গ মাের। হিয়ার পরশ লাগি হিয়া মোের কান্দে। পরাণ পীরিতি লাগি থির নাহি বান্ধে । গােবিন্দদাসও মহান কবি, তাঁর কল্পনা মােহকর।

তিনি কল্পনাকে চমৎকার অলঙ্কার পরিয়ে দেন। তার কয়েকটি পংক্তি : যাহা যাহা নিকসয়ে তনু তনু জ্যোতি। তাহা তাহা বিজুরি চমকময় হােতি। যাহা যাহা অরুণচরণ চল চলই। তাহা তাহা থল-কমল-দল খলই । গােবিন্দদাসের ভাষাটি একটু কঠিন, কিন্তু এর ভেতরে আছে সৌন্দর্য। কবি এখানে রাধার বর্ণনা দিচ্ছেন। রাধা খুব সুন্দর, তা সবাই জানি; কবি সে-সৌন্দর্য কী রকম, তা বলছেন। রাধা তার সখীদের সাথে যাচ্ছে। কবি বলছেন, রাধার শরীর থেকে যেখানে ছলকে পড়ছে সৌন্দর্য, সেখানে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। যেখানে রাধা রাখছে তার আলতারাঙানাে পা, সেখানেই যেনাে রাধার পা থেকে ঝরে পড়ছে স্থলপদ্মের লাল পাপড়ি। এমন অনেক সুন্দর বর্ণনা আছে বৈষ্ণব কবিতায়। বৈষ্ণব কবিতা মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ কবিতা।

বিদ্যাপতি

বিদ্যাপতি ছিলেন রাজসভার মহাকবি। রাজার নাম শিবসিংহ, রাজার রাজধানীর নাম মিথিলা। বিদ্যাপতি বাঙলা ভাষায় একটি কবিতা লিখেন নি, তবুও তিনি বাঙলা ভাষার কবি। বিদ্যাপতি লিখতেন ব্রজবুলি নামক একটি বানানাে ভাষায়। এ-ভাষাটিতে আছে হিন্দি শব্দ, আছে বাঙলা শব্দ এবং আছে প্রাকৃত শব্দ। বিভিন্ন শ্রেণীর শব্দ মিলে অবাককরা এক মধুর ভাষা ব্রজবুলি। এ-ভাষাতে বৈষ্ণব কবিতা রচনা করেছেন কবি বিদ্যাপতি। কবি বিদ্যাপতি বেঁচে ছিলেন পঞ্চদশ শতকে। তখন মিথিলা ছিলাে জ্ঞান ও সাহিত্যচর্চা কেন্দ্র। সেকালের বাঙলার ছেলেরা জ্ঞানার্জনের জন্যে যেতাে মিথিলায়, আর বুক ভরে নিয়ে আসতাে বিদ্যাপতির মধুর কবিতাবলি। এভাবে বিদ্যাপতির কবিতা হয়েছে বাঙলা কবিতা এবং বিদ্যাপতি হয়েছেন বাঙলার কবি। বিদ্যাপতিকে ছাড়া বৈষ্ণব কবিতার কথা ভাবাই যায় না। বিদ্যাপতি শুধু ছােটোছােটো বৈষ্ণব কবিতার মালা রচনা করেন নি, তার আরাে অনেক গ্রন্থ আছে। তিনি সংস্কৃত ভাষায় রচনা করেন পুরুষপরীক্ষা নামে একটি বই। বিদ্যাপতির এ-জাতীয় আরাে কয়েকটি বই : কীর্তিলতা, গঙ্গাবাক্যাবলী, বিভাগসার। কবির রচনায় মােহিত হয়েছিলাে তাঁর রাজা শিবসিংহ। এজন্যে সে বিদ্যাপতিকে একটি চমৎকার উপাধিতে ভূষিত করে। উপাধিটি হলাে ‘কবিকণ্ঠহার’।

বিদ্যাপতি আমাদের প্রিয় তাঁর অতুলনীয় বৈষ্ণব কবিতাগুলাের জন্যে। একবিতাগুলাের ভাব-ভাষা-প্রকাশরীতি মােহনীয়। কবি বিদ্যাপতি আবেগে ভেসে যেতেন না চণ্ডীদাসের মততা, তিনি তাঁর ভাবকে পরিয়ে দিতেন সুন্দর ভাষা এবং ভাষাকে সাজিয়ে দিতেন শােভন অলঙ্কারে। উপমা-রূপক তিনি ব্যবহার করেন কথায় কথায়, তার উপমারূপক ঝাড়লণ্ঠনের মতাে আলাে দেয় কবিতা ভ’রে। আধুনিক কালে এক কবি বলেছেন, উপমাই কবিত্ব। অনেকে বলেন, রূপকই কবিত্ব। এ-কথার সত্যতা আমরা বুঝতে পারি বিদ্যাপতির কবিতা পড়লে। বিদ্যাপতির একটি ছােটো কবিতা উদ্ধৃত করছি। কবিতাটিতে রাধা বলছে কৃষ্ণ তার কে হয়। একথা বােঝাতে রাধা অবিরাম সাহায্য নিচ্ছে রূপকের। একটি রূপকের পর ব্যবহার করছে আরেকটি রূপক, এবং পরে আরেকটি, এবং আরাে আরাে। পদটি হয়ে উঠেছে রূপকের দীপাবলি। কবিতাটি :

হাথক দরপণ মাথক ফুল।
নয়নক অঞ্জন মুখক তাম্বুল ॥
হৃদয়ক মৃগমদ গীমক হার।
দেহক সরবস গেহক সার ॥
পাখীক পাখ মীনক পানি।
জীবক জীবন হাম তুই জানি ।
তুহু কৈসে মাধব কহ তুহু মােয়।
বিদ্যাপতি কহ পুঁহু দোহা হয় ।

কবিতাটিতে রাধা ভালােভাবে জানতে চাইছে কৃষ্ণ তার কে হয় ? তখন রাধা বসে কাব্যিক হিশেবনিকেশে। রাধার মনে হয় কৃষ্ণ তার হাতের আয়না, যাতে সে নিজেকে দেখে থাকে। তারপর মনে হয় কৃষ্ণ তার মাথার ফুল, যা তার শােভা বাড়িয়ে দেয়। তারপর বলতে থাকে এভাবে তুমি আমার চোখের কাজল, মুখের লাল পান। তুমি আমার হৃদয়ের সৌরভ, গ্রীবার অলঙ্কার। তুমি আমার শরীরের সর্বস্ব, আমার গৃহের সার। পাখির যেমন থাকে পাখা এবং মাছের যেমন জল, তুমি ঠিক তেমনি আমার। রাধা বলছে, প্রাণীরা যেমন জানে নিজেদের প্রাণকে তুমি ঠিক তেমনি আমার।

এতে ব’লেও তৃপ্তি হয় না রাধার, কেননা এখনাে সে বুঝতে পারে নি পরম পুরুষ কৃষ্ণ তার কে হয়। তাই শেষ চরণের আগের চরণে কৃষ্ণকেই জিজ্ঞেস করে, বলাে প্রভু তুমি আমার কে? উত্তরটি দেন কবি বিদ্যাপতি নিজে। কবি বলেন, তােমরা দুজনে অভিন্ন। চমত্তার নয়? বিদ্যাপতির কল্পনা অসাধারণ ভাষা লাভ করেছে। এ-রকম ভালাে তাঁর সব কবিতাই, পড়তে পড়তে মন ভরে যায়।

আরেকটি আনন্দের অসাধারণ কবিতার কথা বলি। কবিতাটির বিষয় হলাে বহুদিন পর, বহু নিশীথের পর কৃষ্ণ ফিরে এসেছে রাধার কাছে। রাধার আনন্দ আর ধরে না, কেননা এতােদিনে তার বেদনার দিন ফুরােলাে। কৃষ্ণ কাছে ছিলাে না বলে আগে রাধার চাঁদের আলাে ভালাে লাগে নি, চন্দনের শীতল ছোঁয়াকে মনে হয়েছে বিষের মতাে। কৃষ্ণ এসেছে, রাধার মন আনন্দে তাই নাচছে রঙিন ময়ূরের মতাে। তাই রাধা বলছে :

আজু রজনী হম ভাগে গমাওল।
পেখল পিয়া মুখ চন্দা। জীবন যৌবন সফল করি মানল
দশদিশ ভেল নিরদার আজু মঝু গেহ গেহ করি মানল
আজু মঝু দেহ ভেল দেহা।… সেই কোকিল অব লাখ ডাকউ
লাখ উদয় করুচন্দা।

অর্থাৎ অনেক ভাগ্যে আজ আমার রাত পােহালাে; দেখলাম প্রিয়মুখ । আমার জীবন আজ সফল, দশদিক এখন আনন্দময়। আজ আমার গৃহ হলাে গৃহ, দেহ হলে দেহ। এখন কোকিল ডাকুক লাখে লাখে, লাখে লাখে উদয় হােক চাঁদ।

চণ্ডীদাস

চণ্ডীদাস বাঙলা কবিতার একজন শ্রেষ্ঠ কবি। তার হৃদয় ভরা ছিলাে অসাধারণ আবেগে, এতাে আবেগ রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কোনাে বাঙালি কবির নেই। তাঁর কবিতা পড়ার অর্থ হলাে আবেগের স্রোতে ভেসে যাওয়া। তবে এ-আবেগ বানানাে নয়, ফিকে নয়; টসটসে তার আবেগ। তিনি আবেগকে ঠিক ভাষায় সাজিয়ে দিতে পেরেছেন। এ-মহাকবিকে নিয়ে এক বড়াে সমস্যা আছে বাঙলা সাহিত্যে। সমস্যাটি বিখ্যাত চণ্ডীদাস-সমস্যা’ নামে। আমরা চণ্ডীদাস নামের বেশ কয়েকজন কবির কবিতা পেয়েছি। তাদের কারাে নাম বড়ু চণ্ডীদাস, কারাে নাম দ্বিজ চণ্ডীদাস, কারাে নাম দীন চণ্ডীদাস। এজন্যে প্রশ্ন উঠেছে কজন চণ্ডীদাস ছিলেন আমাদের ? এ নিয়ে অনেক আলােচনা হয়েছে। আজকাল মনে করা হয় তিনজন চণ্ডীদাস আছেন আমাদের : একজনের নাম বড় চণ্ডীদাস, আরেকজনের নাম দীন চণ্ডীদাস, এবং অন্যজনের নাম দ্বিজ চণ্ডীদাস। এখানে দ্বিজ চণ্ডীদাসের কথা বলছি।

বড় চণ্ডীদাস আমাদের প্রথম মহাকবি। তাঁর একটি কাব্য পাওয়া গেছে; নাম শ্রীকৃষ্ণকীর্তন। এটি এক দীর্ঘ কাব্য, অনেকগুলাে পদ বা কবিতার সমষ্টি। বড় চণ্ডীদাস কাহিনী বলার ও আবেগ প্রকাশের অসাধারণ ক্ষমতা রাখেন। তাঁর কবিতা থেকে কিছু অংশ তুলে দিচ্ছি : কে না বাঁশী বা বড়ায়ি কালিনী নইকুলে। কে না বাঁশী বাএ বড়ায়ি এ গােঠ গােকুলে। আকুল শরীর মাের বেআকুল মন। বাঁশীর শবদে মাে আউলাইলো রান্ধন। কে না বাঁশী বা বড়ায়ি সে না কোন জনা। দাসী হজঁ তার পাএ নিশিবো আপনা… অঝর ঝর মাের নয়নের পাণী।

বাঁশীর শবদে বড়ায়ি হারায়িলো পরাণী। দ্বিজ চণ্ডীদাস জন্মগ্রহণ করেছিলেন চতুর্দশ শতকের শেষভাগে, বীরভূম জেলার নানুর গ্রামে। তিনি ছিলেন বাশুলীদেবীর ভক্ত। তার সম্বন্ধে অনেক উপকথা প্রচলিত আছে। এউপকথাগুলাের মধ্যে সত্য কতটুকু আছে তা আজ আর যাচাই করে দেখা সম্ভব নয়, তবে এসব থেকে বুঝতে পারি কবি হিশেবে তিনি লাভ করেছিলেন অসীম জনপ্রিয়তা। তার সহজ সরল কথার তীব্র আবেগ বাঙলাদেশকে আকুল করে তুলেছিলাে। বৈষ্ণব ধর্মের প্রবর্তক চৈতন্যদেব পাগলের মতাে জপ করতেন চণ্ডীদাসের পদাবলি।

চণ্ডীদাসের জনপ্রিয়তার কারণ তাঁর রাধা। রাধার আবেগ, আচরণ, সকাতর হৃদয় এতাে মােহনীয় যে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। রাধা মানবীরূপে মানুষের হৃদয়ের আবেগ। মানুষের হৃদয়ের আকুলতা তার মধ্যে রূপ লাভ করছে। রাধার সব আবেগ ও কাতরতা কৃষ্ণের জন্যে। কৃষ্ণের নাম শুনেই রাধা কৃষ্ণের জন্যে অধীর হয়, সব সময় সে কৃষ্ণের কথা ভাবে, সব কিছুতে সে দেখতে পায় সুন্দর কৃষ্ণকে। আকাশের মেঘ, যমুনার নীল জল, ময়ূরের কণ্ঠের উজ্জ্বল রঙে রাধা খুঁজে পায় শ্যাম বা কৃষ্ণকে। চণ্ডীদাস জটিল নন, অনেক ভেবে তিনি কবিতা রচনা করেন না। অতি সহজে এতাে গভীর কথা তিনি বলেন যে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। চণ্ডীদাসের একটি সকাতর পদের কিছু অংশ তুলে দিচ্ছি : বহু দিন পরে বধুয়া এলে। দেখা না হইত পরাণ গেলে। এতেক সহিল অবলা বলে। ফাটিয়া যাইত পাষাণ হ’লে । দুখিনীর দিন দুখেতে গেল। মথুরা নগরে ছিলে ত ভাল । এই সব দুখ কিছু না গণি। তােমার কুশলে কুশল মানি।

চণ্ডীদাসের কবিতা স্বত্ব ত কোমল আবেগের প্রকাশ, গীতিময় ও অন্তরঙ্গ। অনেকটা দীর্ঘশ্বাসের মতাে। চণ্ডীদাসের ভাষাও সহজ সরল, তার আবেগের মতাে নিরাভরণ। তাঁর পদ অরণ্যের নির্জন পুষ্পের মতাে চিরস্নিগ্ধ, গােপন সুবাস বিলিয়ে চলছে শতাব্দীর পর শতাব্দী।

চৈতন্য ও বৈষ্ণবজীবনী

চৈতন্যদেব এক অক্ষরও কবিতা লেখেন নি, তবু তিনি বাঙলা সাহিত্যের ইতিহাসে অধিকার করে আছেন বড়াে স্থান। বাঙলা সাহিত্যে তার প্রভাব অসীম। তিনি মধ্যযুগের বাঙলাদেশে জাগিয়েছিলেন বিশাল আলােড়ন, তাতে অনেকখানি বদলে গিয়েছিলাে বাঙলার সমাজ ও চিন্তা ও আবেগ। তিনি সাহিত্যে যে-আলােড়ন জাগান, তা তাে তুলনাহীন। মধ্যযুগের সমাজ ছিলাে সংস্কারের নিষ্ঠুর দেয়ালে আবদ্ধ, চৈতন্যদেব তার মধ্যে আনেন আকাশের মুক্ত বাতাস। তিনি প্রচার করেন ভালােবাসার ধর্ম, যাকে বলা হয় বৈষ্ণব ধর্ম। এর ফলে মধ্যযুগের মানুষ লাভ করে কিছুটা মানুষের মর্যাদা; এবং মধ্যযুগের কবি বলেন, সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।’ চৈতন্যদেবের আবির্ভাবে বাঙলার জীবনে, সমাজে এসেছিলাে জাগরণ। এর ফলেই বাঙলা সাহিত্য ফুলেফুলে ভরে ওঠে।

চৈতন্যদেব প্রেমের অবতার। তাঁর সম্পর্কে গভীর আবেগে দীনেশচন্দ্র সেন লিখেছেন যে প্রেম পৃথিবীতে একবার মাত্র রূপ গ্রহণ করেছিলাে, তা বাঙলাদেশে। তাঁর কথায় যেমন আছে আবেগ, তেমনি রয়েছে সত্য। চৈতন্যদেব জন্মেছিলেন ১৪৮৬ অব্দে নবদ্বীপে। তাঁর পিতার নাম জগন্নাথ মিশ্র; মায়ের নাম শচীদেবী। ভালােবেসে চৈতন্যদেবকে মানুষ নানা নামে ডাকে। তাঁর আসল নাম ছিলাে বিশ্বম্ভর, ডাক নাম নিমাই। তাঁর গায়ের রঙ ছিলাে গৌরবর্ণ, তাই তার আরেক নাম গৌরাঙ্গ, সংক্ষেপে গােরা। বাল্যে চৈতন্য ছিলেন যেমন দুষ্ট, তেমনি মেধাবী। বেশ ভালােভাবে পড়াশুনা করে যৌবনেই চৈতন্য পণ্ডিত হিশেবে বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। ছাত্রদের পড়ানাের জন্যে একটি ইস্কুল খােলেন তিনি।

আরো পড়ুন :   লাল নীল দীপাবলি বা বাংলা সাহিত্যের জীবন | হুমায়ুন আজাদ [03]

কিন্তু বেশিদিন তা চলে নি। একবার গয়া যান চৈতন্য। সেখানে দেখা পান ঈশ্বরপুরীর এবং দীক্ষা গ্রহণ করেন তাঁর কাছে। এরপরে গােরা হয়ে ওঠেন শ্রীচৈতন্য। তিনি নিজেকে বিলিয়ে দেন ভগবত প্রেমে, মেতে ওঠেন হরিসংকীর্তন এবং ভগবতপাঠে। এরপর সারাজীবন কেটেছে তাঁর কৃষ্ণপ্রেমে। তিনি প্রচার করেছেন প্রেম। তার অপূর্ব ধর্মে ধীরেধীরে এসে যােগ দিয়েছে প্রেমপাগল মানুষেরা। চৈতন্যদেব কৃষ্ণপ্রেমকে জীবনের সারকথা বলে মেনে নিয়েছিলেন। সেখানে মানুষে মানুষে কোনাে ভেদ নেই, সবাই সমান। এ যে কতাে বড়াে ঘােষণা, তা মধ্যযুগের পটভূমি ছাড়া বােঝা কঠিন। তখন মানুষে মানুষে ছিলাে সীমাহীন প্রভেদ, এমনকি ধর্মেও সকলের অধিকার ছিলাে না। এ-সময়েই শ্রীচৈতন্য বলেন, মুচি হয়ে শুচি হয় যদি কৃষ্ণ ভজে। এ-ঘােষণা মানুষকে বিরাট মূল্য দেয়। চৈতন্যদেব বেশিদিন বাঁচেন নি; মাত্র ৪৮ বছর বয়সে ১৫৩৩ সালে তিনি পুরীতে প্রাণত্যাগ করেন।

তার মৃত্যু সম্বন্ধে নানা অলৌকিক গল্প প্রচলিত আছে। কেউ বলেন, তিনি পুরীতে কৃষ্ণপ্রেমে এতাে পাগল ছিলেন যে সমুদ্রের নীল জলকে তার মনে হয়েছিলাে কৃষ্ণ। কৃষ্ণ মনে করে তিনি সমুদ্রে ঝাপিয়ে পড়ে প্রাণত্যাগ করেন। আবার কেউ বলেন, রথযাত্রার সময়ে তিনি নামকীর্তন করে নাচছিলেন, তখন তাঁর গায়ে আঘাত লাগে। তাতেই তিনি মারা যান।

বাঙলার জীবনে যেমন বাঙলা সাহিত্যেও তেমনি চৈতন্যদেবের প্রভাব অপরিসীম। অনেকটা তাকে কেন্দ্র করেই রচিত হয়েছে মধ্যযুগের গৌরব বিশাল বৈষ্ণব সাহিত্য। এসাহিত্যে আছে পদাবলি, আছে দর্শন, আছে জীবনীসাহিত্য। পদাবলির কথা আগেই বলেছি। বৈষ্ণব জীবনীসাহিত্যও মধ্যযুগের মূল্যবান সৃষ্টি, কেননা যে-মধ্যযুগ কেটেছে দেবতাদের গুণগানে, সেখানে বৈষ্ণবেরা বসিয়েছিলেন মানুষকে। দেবতার বদলে মানুষের প্রাধান্য বৈষ্ণব জীবনসাহিত্যের বড়াে বৈশিষ্ট্য।

আজকাল যেভাবে জীবনী রচিত হয়, বৈষ্ণবজীবনী তেমনভাবে রচিত হয় নি। এখন আমরা মানুষকে মানুষ হিশেবেই দেখতে ভালােবাসি, মানুষকে দেবতা করে তুলি না। মধ্যযুগে এটা সম্ভব ছিলাে না। এ-জীবনীগুলাে যারা রচনা করেছিলেন, তাঁরা ছিলেন ভক্ত। চৈতন্যদেবের ভক্তের চোখে চৈতন্যদেব সাধারণ মানুষ নন, তিনি অবতার। তাই এজীবনীসমূহে মানুষ অনেক সময় দেবতা হয়ে উঠেছেন। এখানে অবলীলায় স্থান পেয়েছে অলৌকিক ঘটনা, যেগুলােকে তারা সত্যি বলে ভাবতেন। আজকের চোখে নিছক কল্পনা, কিন্তু সেকালে তারা এগুলােকে অবিশ্বাস্য বলে অবহেলা করতে পারেন নি। তবু এজীবনীগুলাে বড়াে মূল্যবান। জীবনীগুলােতে সেকালের পরিচয় আছে, আছে সে-সময়ের সমাজের চিত্র। আর যাঁর জীবনকাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে, তাকেও আমরা অনেক সময় পাই মানুষ হিশেবে।

চৈতন্যদেবের মৃত্যুর অল্প পরে তার দুটি জীবনীগ্রন্থ লেখা হয় সংস্কৃত ভাষায়। বাঙলা ভাষায় প্রথম চৈতন্যদেবের যে-জীবনী লেখা হয়, তার নাম চৈতন্যভাগবত। যিনি লেখেন, তাঁর নাম বৃন্দাবন দাস {? ১৫০৭-১৫৮৯। এটি লেখা হয়েছিলাে চৈতন্যদেবের মৃত্যুর পনেরাে বছরের মধ্যে। বৃন্দাবন দাসকে এ-গ্রন্থ লেখার প্রেরণা দিয়েছিলেন নিত্যানন্দ প্রভু। এ-গ্রন্থের ঘটনাগুলাে তিনি শুনেছিলেন চৈতন্যের সহচরদের মুখে, আর তাকেই তিনি কাব্যরূপ দান করেন। এর মধ্যে অনেক অলৌকিক ঘটনাও আছে। এ-বইটি বিশাল।

বৃন্দাবন দাসের চৈতন্যভাগবত-এর পরে চৈতন্যদেবের আরাে একটি জীবনী রচনা করেন লােচন দাস [১৬শ শতকে]। এ-বইয়ের নাম চৈতন্যমঙ্গল। এটি চৈতন্যভাগবত-এর চেয়ে ছােটো বই। চৈতন্যদেবের জীবনী হিশেবে যে-বই সবচেয়ে বিখ্যাত, তার নাম চৈতন্যচরিতামৃত। এ-বইয়ের লেখক কৃষ্ণদাস কবিরাজ (১৫৩০–১৬১৫] । এ-বইটিতে চৈতন্যদেবের জীবনী বর্ণনার সাথে সাথে ব্যাখ্যা করা হয়েছে তাঁর দর্শন। কাব্য হিশেবেও এটি চমৎকার। নানা যুক্তির সাহায্যে কৃষ্ণদাস এ-বইতে বৈষ্ণব দর্শন ব্যাখ্যা করে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন। তার বর্ণনা সহজ সরল, তবে মাঝেমাঝে কবি চমৎকার উপমারূপক ব্যবহার করেছেন কঠিন তত্ত্ব ব্যাখ্যা করার জন্যে। রাধাকৃষ্ণ তত্ত্ব বােঝানাের জন্যে তিনি বলেন :

মৃগমদ তার গন্ধে যৈছে অবিচ্ছেদ। অগ্নি জ্বালাতে যৈছে নাহি কভু ভেদ । লীলারস আস্বাদিতে ধরে দুইরূপ। রাধাকৃষ্ণ ঐছে সদা একই স্বরূপ। কবি কৃষ্ণদাস কবিরাজ ছিলেন ভক্ত। বর্ধমানে কাটোয়ার কাছে ঝামটপুরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কাব্যে নিজের সম্বন্ধে যে-বিনীত ভাষণ করেছেন, তা শােনার মতাে: আমি অতি ক্ষুদ্র জীব পক্ষী রাঙাটুনি। সে যৈছে তৃষ্ণার পিয়ে সমুদ্রের পানি। তৈছে এক কণা আমি ছুঁইল লীলার। এই দৃষ্টান্ত জানিহ প্রভুর লীলার বিস্তার। আমি লিখি এই মিথ্যা করি অভিমান। আমার শরীর কাষ্ঠপুতুলী সমান । এর পরে জয়ানন্দ (জন্ম ? ১৫১২ রচনা করেন চৈতন্যমঙ্গল। চৈতন্যদেবের জীবনী ছাড়া বৈষ্ণব ধর্মের আর যারা প্রধান ব্যক্তি ছিলেন, তাদের জীবন নিয়েও বেশ কিছু বই লেখা হয়েছে।

অদ্বৈত আচার্য ছিলেন এমন এক ব্যক্তি। কৃষ্ণদাস তাঁর বাল্যকালের কথা লেখেন সংস্কৃত ভাষায়, বইটির নাম বাল্যলীলাসূত্র। পরে শ্যামানন্দ বইটি বাঙলা ভাষায় অনুবাদ করেন অদ্বৈততত্ত্ব নামে। তার সম্বন্ধে লেখা আরেকটি বইয়ের নাম অদ্বৈতপ্রকাশ। কেবল অদ্বৈতকে নিয়েই জীবনীগ্রন্থ রচিত হয় নি, তাঁর স্ত্রী সীতাদেবীকে নিয়েও জীবনীগ্রন্থ লেখা হয়েছে। সীতা দেবীর একটি জীবনী রচনা করেছেন বিষ্ণুদাস আচার্য, নাম “সীতাগুণকদম্ব”। আরেকটি জীবনী রচনা করেন লােকনাথ দাস, নাম সীতাচরিত। এ-সমস্ত বই রচিত হয়েছিলাে যােড়শ শতকে। সপ্তদশ শতকে জীবনীর বিষয়বস্তু অন্যরকম হয়ে দাঁড়ায়। এতােদিন যে-সকল জীবনী রচিত হয়, সেগুলাে প্রধানত চৈতন্যদেব ও অদ্বৈত আচার্যের এবং তাঁর স্ত্রীর জীবনী। সপ্তদশ শতাব্দীতে বৈষ্ণব জীবনী সাহিত্যের নায়ক হয়ে ওঠেন শ্রীনিবাস ও নরােত্তম। এসব গ্রন্থের একটি হচ্ছে নিত্যানন্দ দাসের প্রেমবিলাস। গুরুচরণ দাস রচনা করেন নিবাস ও তার পুত্রের বাল্যজীবনী, নাম প্রেমামৃত। বৈষ্ণব জীবনীগুলাের মূল্য অশেষ।

দেবতার মতাে দুজন এবং কয়েকজন অনুবাদক

কোনাে ভাষা শুধু মৌলিক সাহিত্যে সমৃদ্ধ হতে পারে না। যে-ভাষা যতাে ধনী, তার অনুবাদ সাহিত্যও ততাে ধনী। আমাদের ভাষায় যা নেই, তা হয়তাে আছে জর্মন ভাষায় বা ফরাশি ভাষায়। তাই আমাদের ভাষাকে আরাে ঋদ্ধ করার জন্যে আমরা অপর ভাষা থেকে অনুবাদ করি। বাঙলা সাহিত্যের মধ্যযুগে কবিরা অনুবাদে হাত দিয়েছিলেন, তাঁরা অনুবাদের আশ্চর্য ফসল ফলিয়েছিলেন। হিন্দু কবিরা সাধারণত অনুবাদ করেছেন তাঁদের পুরাণ কাহিনীগুলাে; মুসলমান কবিরা অনুবাদ করেছেন ফারসি, হিন্দি থেকে রােমাঞ্চকর উপাখ্যান।

এখানে হিন্দু কবিদের কথা বলবাে। তারা পুরাণ কাহিনী অনুবাদ করেছেন, অনুবাদ করেছেন রামায়ণ ও মহাভারত। রামায়ণ ও মহাভারত অনুবাদ করা সহজ কথা ছিলাে না। সমাজের ধর্মের যারা ছিলেন মাথা, তাঁরা বাঙলা ভাষায় এসব গ্রন্থের অনুবাদের ভীষণ বিরােধী ছিলেন। তাঁরা মনে করতেন সংস্কৃত থেকে ওসব পুণ্যগ্রন্থ যদি অনূদিত হয় বাঙলায়, তবে ধর্মের মর্যাদাহানি হবে। এ-রকম কিন্তু হয়েছে সব দেশেই। ইংরেজিতে বাইবেল অনুবাদ করতে গিয়ে অনেক বাধার মুখােমুখি হয়েছিলেন অনুবাদকেরা। জর্মন ভাষায় বাইবেল অনুবাদ করেছিলেন মার্টিন লুথার। তাঁকেও অনেক বিরােধিতা সহ্য করতে হয়েছিলাে। বাঙলা ভাষায় কোরান অনুবাদ করতে গিয়েও কম বাধা আসে নি।

তাই মধ্যযুগে কবিরা যখন বাঙলা ভাষায় রামায়ণ-মহাভারত অনুবাদ করতে যান, তখন তাদের সামনে মাথা তুলে দাঁড়ায় অনেক বাধা। কবিরা সে-সব বাধা অবহেলা করেছেন। কবিদের অনুপ্রেরণা দিয়েছেন তখনকার মুসলমান ম্রাটরা। মুসলমান সম্রাটদের উৎসাহে বাঙলা ভাষায় রামায়ণ-মহাভারত অনূদিত হতে পেরেছিলাে। অনুবাদ সাধারণত করেছেন হিন্দু কবিরা। এ-অনুবাদ কাজে তারা মুসলমান সম্রাটদের সহায়তা পেয়েছেন বলে তারা সম্রাটদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ।

রামায়ণ-মহাভারত শুধু ধর্মগ্রন্থ নয়। এ-দুটি বইয়ে রয়েছে নানা মনােহর কাহিনী। কাহিনীর মনোেহারিত্বে মুগ্ধ হয়েছিলেন মুসলমান রাজারা, আর বারবার তাঁরা কবিদের উৎসাহ দিয়েছেন রামায়ণ-মহাভারত অনুবাদ করতে। রামায়ণ ও মহাভারতের দুজন অনুবাদক আজ প্রায় দেবতার মর্যাদা লাভ করেছেন। তাঁরা হচ্ছেন রামায়ণের অনুবাদক কবি কৃত্তিবাস এবং মহাভারতের অনুবাদক কবি কাশীরাম দাস। এ-দুজন ছাড়াও আছেন। আরাে অনেক অনুবাদক, যাঁরা রামায়ণ-মহাভারত কবিতায় অনুবাদ করেছেন।

তাঁদের সকলের রচনা আজ আর পড়া হয় না, কিন্তু প্রবল ভক্তিতে বাঙলার হিন্দুরা পড়ে কৃত্তিবাসের রামায়ণ, কাশীরামের মহাভারত। মধ্যযুগের কোনাে অনুবাদই মূল রচনার হুবহু অনুবাদ নয়। কবিরা মূল কাহিনী ঠিক রেখে মাঝেমাঝে নিজেদের মনের কথাও বসিয়ে দিয়েছেন এখানেসেখানে। তাতে এগুলাে অনুবাদ হয়েও নতুন রচনা হয়ে উঠেছে। তাই আজ আর বলি না যে কাশীরাম অনুবাদ করেছেন মহাভারত, কৃত্তিবাস অনুবাদ করেছেন রামায়ণ। বলি, বাঙলায় মহাভারত লিখেছেন কাশীরাম দাস এবং রামায়ণ রচনা করেছেন কৃত্তিবাস।

বাঙলায় তারা দুজন বাল্মীকি এবং বেদব্যাসের সমান। মুসলমান রাজারা রামায়ণ-মহাভারত এবং অন্যান্য পুরাণকাহিনী অনুবাদের প্রেরণা দিয়েছিলেন কবিদের। তেমন কয়েকজন রাজার নাম বলছি। ১৩২৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত গৌড়ের রাজা ছিলেন নাসির খা। তার অনুপ্রেরণায় মহাভারতের একটি অনুবাদ হয়েছিলাে। অবশ্য এ-বইটি পাওয়া যায় নি। কৃত্তিবাস অনুবাদ করেছেন রামায়ণ। কৃত্তিবাসকে প্রেরণা, উৎসাহ ও সাহায্য দিয়েছিলেন রুকনুদ্দিন বারবক শাহ [১৪৫৯-৭৪]। পরাগল খান কবীন্দ্র পরমেশ্বর নামক এক কবিকে দিয়ে অনুবাদ করেছিলেন মহাভারতের অনেকখানি। পরাগল খানের পুত্রের নাম ছিলাে ছুটি খান। ছুটি ধানের উৎসাহে শ্রীকর নন্দী নামক আরেকজন কবি অনুবাদ করেছিলেন মহাভারতের আরাে অনেকখানি। এভাবে আরাে অনেক মুসলমান রাজার নাম পাওয়া যায়, যারা উৎসাহ দিয়েছিলেন এ-সব গ্রন্থ অনুবাদে। মুসলমান রাজারা রামায়ণ-মহাভারত অনুবাদে উৎসাহ দিয়েছিলেন নানা কারণে। তাঁরা গল্প শুনতে চেয়েছিলেন বলে উৎসাহ দিয়েছিলেন। তাঁরা হিন্দু প্রজাদের বশীভূত করতে চেয়েছিলেন বলে অনুবাদে উৎসাহ দিয়েছিলেন।

রামায়ণের প্রথম অনুবাদকই শ্রেষ্ঠ অনুবাদক; তার নাম কৃত্তিবাস। মহাভারতের বেলা ঘটেছে অন্যরকম। কাশীরাম দাস মহাভারতের শ্রেষ্ঠ অনুবাদক, তবে তিনি প্রথম অনুবাদক নন, বেশ পরবর্তী অনুবাদক। আমরা এখানে কৃত্তিবাস এবং কাশীরাম দাস সম্বন্ধেই বেশি কথা বলবাে। তার আগে অন্যান্য অনুবাদকের কথা কিছুটা বলে নিই। কৃত্তিবাস ছাড়া আর যারা রামায়ণ অনুবাদ করেছিলেন, তাঁদের একজন চন্দ্রাবতী (জন্ম ১৫৫০]। চন্দ্রাবতী মনসামঙ্গলের কবি বংশীদাসের কন্যা। রামায়ণের আরাে কয়েকজন অনুবাদকের নাম : ভবানীদাস, জগঞ্জাম রায়, রামমােহন বন্দ্যোপাধ্যায়, রামানন্দ ঘােষ, দ্বিজ মধুকণ্ঠ, কবিচন্দ্র। মহাভারতের অনুবাদও করেছেন অনেক কবি।

মহাভারতের প্রথম অনুবাদক শ্রীকর নন্দী। তিনি হােসেন শাহের সেনাপতি পরাগল খানের অনুপ্রেরণায় সর্বপ্রথম মহাভারত অনুবাদ করেন। মহাভারতের আরাে কয়েকজন অনুবাদকের নাম : নিত্যানন্দ ঘােষ, রামেশ্বর নন্দী, রাজীব সেন, সঞ্জয়, রামনারায়ণ দত্ত, রাজেন্দ্র দাস। হিন্দুধর্মের একটি পবিত্র বই অনুবাদ করেছিলেন মালাধর বসু। বইটি ভাগবত। মালাধর বসুও একজন মুসলমান রাজার প্রেরণায় ভাগবত অনুবাদ করেছিলেন। সে-রাজা তাকে ‘গুণরাজ খান’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। মালাধর বসু লিখেছেন, ‘গৌড়েশ্বর দিলা নাম গুণরাজ খান। মালাধর বসুর ভাগবতের অন্য নাম শ্রীকৃষ্ণবিজয়।

বাঙলা রামায়ণ মানেই কৃত্তিবাসের রামায়ণ। এ-বই কয়েক শশা বছর ধরে বাঙলার হিন্দুদের ঘরেঘরে পরম ভক্তিতে পঠিত হচ্ছে। রামসীতার বেদনার কথা কৃত্তিবাস পয়ারের চোদ্দ অক্ষরের মালায় গেঁথে বাঙালির কণ্ঠে পরিয়ে গেছেন। রামায়ণ কৃত্তিবাসের হাতে বাঙলার সম্পদে পরিণত হয়েছে; বাল্মীকির অসীম বৃহৎ জগৎ বাঙলাদেশে পরিণত হয়েছে। রামসীতা এবং আর সবাই হয়ে পড়েছে কোমল কাতর বাঙালি। যে-কৃত্তিবাস এমন অসাধারণ কাজ করে গেছেন, তাঁকে নিয়ে কিন্তু সমস্যার অন্ত নেই। কৃত্তিবাস কখন জন্মগ্রহণ করেছিলেন, কোন রাজার আশীর্বাদ লাভ করেছিলেন, এ নিয়ে বাঙলা সাহিত্যের ইতিহাসে বেশ বড়াে এক বিতর্ক রয়েছে।

আজ মনে করা হয় কবি কৃত্তিবাস তাঁর আত্মপরিচিতিতে যে-রাজার ইঙ্গিত করেছেন, তার নাম রুকনুদ্দিন বারবক শাহ। কৃত্তিবাস পঞ্চদশ শতকের কবি। তাঁর একটি দীর্ঘ আত্মপরিচিতি পাওয়া গেছে। এ-আত্মপরিচিতিতে তিনি অনেক কথা বলেছেন; বেলা ক-টার সময় তিনি রাজার দরবারে গেলেন, তখন রাজা কী করছিলেন, তাঁর চারপাশে কারা ছিলেন, এসব তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু কবি শুধু রাজার নামটি বলতে ভুলে গেছেন! এমন হয়েছে তাঁর জন্মকালের বিবরণ দিতে গিয়েও। কখন তাঁর জন্ম হলাে, কারা তাঁর পূর্বপুরুষ, তাঁর জন্মের সময় কোন তিথি ছিলাে, তিনি সব বলেছেন। শুধু ভুলে গেছেন তার জন্মের অব্দ বা সালটি উল্লেখ করতে! তাই কৃত্তিবাসকে নিয়ে মহাবিতর্ক, তিনি যেমন মহাকবি, তাকে নিয়ে বিতর্কটিও মহাকাব্যিক!

কৃত্তিবাসের আত্মপরিচিতিটি চমৎকার। এটি পড়লে বােঝা যায় কবি কী রকম ছিলেন। নিজের সম্বন্ধে তাঁর ছিলাে বড়াে বিশ্বাস; তিনি যে বড়াে কবি সে-সম্পর্কে তার নিজের কোনাে সন্দেহ ছিলাে না। উনিশশতকের মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত কৃত্তিবাসকে উদ্দেশ করে বলেছেন, কৃত্তিবাস, কীর্তিবাস কবি।’ রাজদরবারে যাওয়া সম্পর্কে তিনি যা লিখেছেন, তার কিছু অংশ তুলে দিচ্ছি : পাটের চাঁদোয়া শােভে মাথার উপর। মাঘ মাসে খরা পােহায় রাজা গৌড়েশ্বর । দাণ্ডাই গিয়া আমি রাজ-বিদ্যমানে। নিকটে যাইতে রাজা দিল হাসানে।… নানা ছন্দে শ্লোক আমি পড়িনু সভায়। শ্লোক শুনি গৌড়েশ্বর আমা পানে চায়। নানা মতে নানা শ্লোক পড়িলাম রসাল। খুশি হৈয়া রাজা দিলা পুষ্পমাল… পাত্রমিত্র সবে বলে শুন দ্বিজরাজে। যাহা ইচ্ছা হয় তাহা চাহ মহারাজে। কারাে কিছু নাহি লই করি পরিহার। যথা যাই তথায় গৌরব মাত্র সারা যত যত মহাপণ্ডিত আছয়ে সংসারে। আমার কবিতা কেহ নিন্দিতে না পারে … প্রসাদ পাইয়া বাহির হইলাম সত্বরে। অপূর্ব জ্ঞানে ধায় লােক আমা দেখিবারে ৪ চন্দনে ভূষিত আমি তােক আনন্দিত। সবে বলে ধন্য ধন্য ফুলিয়া পণ্ডিত মুনি মধ্যে বাখানি বাল্মীকি মহামুনি।

পণ্ডিতের মধ্যে কৃত্তিবাস গুণী । কবির স্নিগ্ধ মহান অহমিকার এমন প্রকাশ খুবই দুর্লভ। রাজা তাঁর কবিতায় মুগ্ধ হয়েছেন; রাজার পাত্রমিত্ররা কবিকে বলেছেন, তােমার যা ইচ্ছে তা তুমি চাইতে পারাে রাজার কাছে। কিন্তু কবি কৃত্তিবাস কিছুই চান না, কবিতাই তাঁর গৌরব; তাই বললেন, কারাে কিছু নাহি লই করি পরিহার । যথা যাই তথায় গৌরব মাত্র সার।’ কবির মহান ঔদ্ধত্যের প্রকাশরূপে পংক্তি দুটি অমর হয়ে আছে। কৃত্তিবাসের আত্মপরিচিতিটির এ-অংশ পড়লে বাঙলা ভাষার অন্য একটি সেরা কবিতার কথা মনে পড়ে। কবিতাটি রবীন্দ্রনাথের ‘পুরস্কার’। পুরস্কার’ কবিতাটি পড়লে মনে হয় রবীন্দ্রনাথের কবিতার নায়ক কৃত্তিবাস বা অন্যকালের কৃত্তিবাস রােম্যানটিক রবীন্দ্রনাথ।

‘পুরস্কার’ কবিতার নায়ক কবি। তিনি বাড়িতে ব’সে ব’সে শুধু কবিতা রচনা করেন। তাঁর হাঁড়িতে চাল নেই, মাথার ওপর ঘরের চাল পড়ােপড়াে। কবির সেদিকে দৃষ্টি নেই, তিনি মেতে আছেন কাব্যলক্ষ্মীকে নিয়ে। তাঁর কবিতা অসাধারণ, কিন্তু সেগুলােকে তিনি অর্থ উপার্জনের পণ্য হিশেবে ব্যবহার করেন না। একদিন কবির স্ত্রী অনেক বুঝিয়ে কবিকে রাজি করালেন রাজদরবারে যেতে। রাজা যদি খুশি হয় কবিতা শুনে, তবে আর কোনাে অভাব থাকবে না সংসারে। রাজার কাছ থেকে অনেক ধন চেয়ে আনতে পারবেন কবি। স্ত্রীর কথায় কবিতা নিয়ে যান রাজদরবারে। রাজা কবিকে কবিতা শােনাতে বলে। কবি শােনান কালজয়ী অমর কবিতা। ওই কবিতার কয়েক স্তবক :

শুধু বাঁশিখানি হাতে দাও তুলি বাজাই বসিয়া প্রাণমন খুলি, পুষ্পের মতাে সঙ্গীতগুলি
ফুটাই আকাশভালে। অন্তর হতে আহরি বচন। আনন্দলােক করি বিরচন, গীতরসধারা করি সিঞ্চন
সংসার ধূলিজালে।… সংসার মাঝে কয়েকটি সুর রেখে দিয়ে যাব করিয়া মধুর, দু’একটি কাঁটা করি দিব দূর
তার পরে ছুটি নিব।

আরাে অনেক স্তবক শােনান কবি, রাজা হয় আনন্দে আত্মহারা। রাজা কবিকে কী দান করবে ভেবে পায় না। কবিকে রাজা বলেন, আমার ভাণ্ডারে যা আছে তা থেকে যা ইচ্ছে তুমি নিতে পারাে, কবি। কবি কিন্তু কোনাে ধন চাইলেন না, তিনি শুধু চাইলেন রাজার কণ্ঠের ফুলমালাখানি। কৃত্তিবাস জন্মগ্রহণ করেছিলেন নদীয়ার ফুলিয়া গ্রামের এক বিখ্যাত পণ্ডিত পরিবারে। তাঁর পিতার নাম বনমালী। তিনি পদ্মা পেরিয়ে উত্তরে বরেন্দ্র অঞ্চলে গিয়েছিলেন বিদ্যালাভের জন্যে। সেখানে প্রচুর পড়াশুনাে করার পর কৃত্তিবাস যান গৌড়ের রাজার কাছে। এ-রাজা রুকনুদ্দিন বারবক শাহ। তারপরে লিখেন রামায়ণ। বাল্মীকির রামায়ণকে তিনি অপূর্বরূপে বাঙলা ভাষায় রূপান্তরিত করেন।

আরো পড়ুন :   লাল নীল দীপাবলি বা বাংলা সাহিত্যের জীবন | হুমায়ুন আজাদ [01]

তাঁর রামায়ণের অন্য নাম হলাে শ্রীরামপাঞ্চালি। বর্তমানে যে-কৃত্তিবাসী রামায়ণ প্রচলিত আছে, তাতে কৃত্তিবাসের রচনার আদিরূপ পাওয়া যায় না। কেননা তার পর কয়েক শাে বছর অতীত হয়েছে, কৃত্তিবাসের জনপ্রিয় কাব্যে কালেকালে নতুন কবিরা নিজেদের রচনা গেঁথে দিয়েছেন। তাছাড়া সেকালে কবিতা লিখিত হতাে খুব কম, সাধারণত গায়কেরা নিজেদের মুখেমুখে বাঁচিয়ে রাখতেন কবিতা। এভাবে এক গায়কের কণ্ঠ থেকে কবিতা চলে যেতাে অন্য গায়কের কণ্ঠে, তাতে অনেক পংক্তি পরিবর্তিত হতাে, কখনাে কোনাে অংশ হয়তাে বাদ পড়তাে, আবার নতুন কোনাে অংশ তৈরি করে নিতেন গায়কেরা। কৃত্তিবাসের রামায়ণ বাঙলার সবচেয়ে জনপ্রিয় গ্রন্থে পরিণত হয়েছিলাে।

বাঙালি হিন্দুরা রামসীতার পুণ্যকাহিনী পড়ার জন্যে পাঁচশাে বছর ধরে আর বাল্মীকির রামায়ণ খুলে ধরে না, তারা খুলে ধরে কৃত্তিবাসের রামায়ণ । কৃত্তিবাসের রামায়ণ ১৮০২ কিংবা ১৮০৩ সালে সর্বপ্রথম মুদ্রিত হয়। এটি ছেপেছিলেন শ্রীরামপুরের খ্রিস্টীয় পাদ্রিরা। এরপর ১৮৩০ সালে জয়গােপাল তর্কালঙ্কার কৃত্তিবাসের ভাষা বেশ মেঘেষে নতুন করে কৃত্তিবাসী রামায়ণ মুদ্রিত করেন। এখন এ-বইটিই চলছে, এটিকেই অকৃত্রিম কৃত্তিবাসী রামায়ণ মনে করে ভক্তিতে আকুল মনে পাঠ করছে ভক্তরা।

কৃত্তিবাসের হাতে রাজপুত্র রাম, রাজবধূ সীতার অনেক বদল ঘটেছে। বদলে গেছে লক্ষ্মণ, রাবণ। সবাই বাঙালিতে পরিণত। প্রাচীন মহিমা এ-বইতে রক্ষিত হয় নি বলে দুঃখ করার কিছু নেই, কেননা এটি নবরামায়ণ। রামায়ণ বলতে যেমন বাঙলায় বােঝায় কৃত্তিবাসের রামায়ণ, তেমনি মহাভারত বলতে বােঝায় কাশীরাম দাসের মহাভারত। কাশীরাম মহাভারতের প্রথম কবি নন, অনেক কবি যখন মহাভারত রচনা করে ভূলােক থেকে বিদায় নিয়েছেন তখন সতেরােশতকে দেখা দেন বাঙলার বেদব্যাস কাশীরাম দাস। তার মহাভারত অনেকদিন ধরে বাঙলার ঘরেঘরে গল্পের স্বাদ এবং ধর্মের পুণ্য বিলিয়ে আসছে। কাশীরামের বিখ্যাত স্তবকটি কে না জানে :

মহাভারতের কথা অমৃত সমান।
কাশীরাম দাস কহে শুনে পুণ্যবান।

কাশীরাম অবশ্য সারাটি মহাভারত অনুবাদ করেন নি। অনেকে মনে করেন কাশীরাম দাস ১৬০২ থেকে ১৬১০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে মহাভারত রচনা করেন। কাশীরামের পরিবারটি ছিলাে কবি-পরিবার, এক বংশে এতাে কবির জন্ম বেশি হয় নি। কাশীরামের পিতার নাম কমলাকান্ত। তাঁর বড়াে ভাই লিখেছেন শ্রীকৃষ্ণবিলাস নামে একটি কাব্য, ছােটো ভাই গদাধর লিখেছেন জগতমঙ্গল নামে একটি কাব্য। আর কাশীরাম তাে মহাকবি। প্রচলিত আছে যে কাশীরাম দাস মহাভারত পুরােপুরি অনুবাদ করে যেতে পারেন নি। এ সম্বন্ধে যে-শ্লোকটি প্রচলিত, তা হচ্ছে : আদি সভা বন বিরাটের কতদূর। ইহা রচি কাশীদাস গেলা স্বর্গপুর। ধন্য হইল কায়স্থ কুলেতে কাশীদাস। তিন পর্ব ভারত যে করিল প্রকাশ ॥ তার মৃত্যুর পরে তার ভাইয়ের ছেলে এবং আরাে কয়েকজন মিলে মহাভারতের অনুবাদ সম্পূর্ণ করেন। কাশীরামের মহাভারতের সাথে সংস্কৃত মহাভারতের অমিল অনেক। মহাভারতের শৌর্য সংঘাতের বিরাটত্ব এতে নেই; এ-কাব্য হয়ে উঠেছে বাঙালির মহাভারত এবং পরিণত হয়েছে বাঙলার সাধারণ সম্পত্তিতে।

ভিন্ন প্রদীপ : মুসলমান কবিরা

বাঙলাদেশে মুসলমানদের আগমন এক হাজার বছরের প্রথম প্রধান ঘটনা; দ্বিতীয় প্রধান ঘটনা ইংরেজদের আগমন। ব্রয়ােদশ শতকের প্রথম দশকে ইখতিয়ারউদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি নবদ্বীপের বুড়াে রাজা লক্ষণ সেনকে হঠাৎ আক্রমণ করে। রাজা পালিয়ে বাঁচে। শুরু হয় এদেশে নতুন যুগ। রাজা গেলাে বদলে। শুধু রাজা বদলালাে, তাই নয়; সে-কোন সুদূর থেকে এলাে বিদেশি রাজা। তাদের ধর্ম ভিন্ন, সংস্কৃতি ভিন্ন, চরিত্র ভিন্ন। তার ফলে দেশে এলাে বিরাট আলােড়ন। সমাজ, সংস্কৃতি, সাহিত্য, অর্থাৎ জীবনের সবদিকে পড়লাে তার প্রচণ্ড প্রভাব। মুসলমান রাজারা রাজ্যে একটু আরাম করে বসার পর এদেশের কবিদের দিতে লাগলাে উৎসাহ। কিন্তু বাঙলা সাহিত্যে মুসলমানেরা প্রবেশ করে কখন? চতুর্দশ শতকের শেষ দিকে বা পঞ্চদশ শতকের প্রথম পাদে দেখি বাঙলা ভাষায় কবিতা রচনায় হাত দিয়েছেন মুসলমান কবিরা। বেশ কয়েক শশা বছর লেগেছিলাে। অবশ্য একথা ভাবার কারণ নেই যে বিদেশ থেকে আসা মুসলমানেরা শুরু করেছিলাে বাঙলা কবিতা লেখা।

কবিতা যারা লিখেছেন, তাঁরা এদেশেরইবাঙালি; শুধু তারা ধর্ম বদলে হয়েছিলেন মুসলমান। বাঙলা ভাষায় প্রথম মুসলমান কবি শাহ মুহম্মদ সগীর। তিনি সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের রাজত্বকালে কাব্য রচনা করেন। তাঁর কাব্যের নাম ইউসুফ-জুলেখা। মুসলমান কবিরা কবিতা লেখা শুরু করলেন বাঙলা ভাষায়। তাদের কবিতা নানা দিক দিয়ে নতুন। তাঁরা সৃষ্টি করেন বাংলা কাব্যজগতে এক নতুন ধারা। মধ্যযুগের হিন্দু কবিদের সব কবিতা ধর্মকেন্দ্রিক। দেবতাদের নিয়ে তারা রচনা করেছেন তাঁদের কাব্যাবলি। মঙ্গলকাব্যে দেখি দেবতাদের লীলাখেলা। বৈষ্ণব পদাবলিতে পাই দেবতার চেয়ে বড়াে রাধা আর কৃষ্ণকে। আরাে আগে লেখা চর্যাপদ তাে ধর্মের নিয়মকানুনের কাব্য। তাই মধ্যযুগে ধর্ম ছাড়া কবিতা ছিলাে না। সেখানে মানুষ ছিলাে গৌণ, দেবতাই প্রধান। সাধারণ মানুষের জীবনের কথা কবিরা ভাবতে পারেন নি। মুসলমান কবিরা নিয়ে আসেন নতুন বিষয়বস্তু। মুসলমানদের দেবতা নেই। তাই তারা লেখেন মানুষের গল্প। এগল্প কখনাে ইউসুফ-জুলেখার, কখনাে লাইলি-মজনুর। এরা দেবতা নয়, মানুষ, যদিও অবাস্তব। আধুনিক কালে মানুষই সাহিত্যের মূল বিষয়।

মুসলমান কবিরা যে শুধু মানুষের কথা বলছেন, তা নয়। ধর্ম তাদের কবিতারও একটি বড়াে অংশ অধিকার করে আছে। এ-ধর্ম অবশ্য পুরােপুরি কোরানহাদিসের ধর্ম নয়। ইসলামের অনেক গল্প তারা নানা লৌকিক কাহিনীর সাথে মিশিয়ে পরিবেশন করেছেন। হিন্দুদের একটি বড় ঐতিহ্য রয়েছে, সে-ঐতিহ্য রামায়ণের, মহাভারতের। মুসলমানদের ঠিক এমন কোনাে কাহিনীভরা ঐতিহ্য নেই। তাই অনেক মুসলমান কবি হিন্দুদের অনুসরণে নতুন নতুন মুসলমান ঐতিহ্যের জন্ম দিয়েছেন। যেমন, ধরা যাক ইউসুফ-জুলেখার গল্প। এ-গল্প কোরানে আছে, বাইবেলে আছে। কিন্তু তা আছে সামান্য হয়ে, অত্যন্ত খসড়া আকারে। কবিরা সেই খসড়া গল্পের গায়ে নিজেদের কল্পনা মিশিয়ে নতুন কাহিনী গড়ে তুলেছেন তাঁরা।

মুসলমান কবিদের কবিতা সম্বন্ধে একটি কথা মনে রাখতে পারি। তা হচ্ছে তাদের কোনাে রচনাই মৌলিক নয়, তারা নিজেরা কোনাে গল্পের কাহিনী তৈরি করেন নি। তাদের সব রচনাই অনুবাদ। তারা অনুবাদ করেছেন হিন্দি থেকে, ফারসি থেকে, আরবি থেকে। এ-অনুবাদ আজকের দিনের অনুবাদের মতাে নয়। আজকের দিনে আমরা যে-বই অনুবাদ করি, তাকে অবিকৃত রাখতে চাই। মূল রচনার কোনাে অংশ বাদ দিই না, বা নিজেদের কোনাে রচনাংশ ওই বইয়ের মধ্যে জুড়ে দিই না। কিন্তু আমাদের কবিরা অন্য রকম করেছেন। তাঁরা মূল রচনার কোনাে অংশ হয়তাে পরিত্যাগ করেছেন, আবার কোথাও নিজের রচনাকে গেঁথে দিয়েছেন। হয়তাে তিনি আরবদেশের বই অনুবাদ করছেন।

মূল বইতে আছে মরুভূমির কথা। কিন্তু আমাদের কবিরা সেখানে বলেছেন স্নিগ্ধ সজল সবুজ বাঙলার মাঠের কথা। এর ফলে ওই বই অনুবাদ হয়েও আর অনুবাদ থাকে নি, হয়ে উঠেছে নতুন বই। মৌলিক বই। এজন্যে আমাদের কবিদের হাতে মরু অঞ্চলের লাইলিমজনু হয়ে উঠেছে বাঙলার তরুণতরুণী। | নানা রকমের কবিতা লিখেছেন মুসলমান কবিরা। তারা লিখেছেন কাহিনীকাব্য, লিখেছেন ধর্মীয় কাব্য। তারা লিখেছেন ইতিহাস ও কল্পনা মিলিয়েমিশিয়ে বড়ােবড়াে কাব্য। লিখেছেন শােককবিতা, লিখেছেন সঙ্গীতশাস্ত্র, জ্যোতিষশাস্ত্র সম্বন্ধীয় বই। সবই কবিতায় বা পদ্যে। ইউসুফ-জুলেখার কাহিনী লিখেছেন শাহ মুহম্মদ সগীর। হানিফা ও কয়রা পরীর গল্প লিখেছেন সাবিরিদ খান।

লাইলি-মজনুর প্রণয়ের কথা বলেছেন বাহরাম খান। এগুলাে বিদেশের কাহিনীর অনুবাদ। ইউসুফ-জুলেখার গল্প নিয়ে ফারসি ভাষায় বেশ কয়েকজন বড়াে কবি কাব্য লিখেছেন। তাঁদের মধ্যে আছেন ফেরদৌসি ও জামি। তাদের কারাে বইয়ের অনুবাদ করেছিলেন কবি সগীর। লাইলি-মজনুর গল্প অবলম্বনে ফারসি কবি জামি কাব্য লিখেছিলেন। এ-বইয়ের অনুবাদ হচ্ছে বাহরাম খানের লাইলি-মজনু। মুসলমান কবিরা যে কেবল বিদেশের গল্পেরই অনুবাদ করেছেন, তা নয়। ভারতববেস বিখ্যাত অনেক গল্প তাদের আকর্ষণ করেছে, এবং তারা সেগুলাে নিয়ে কাব্য লিখেছেন। মনােহর-মধুমালতীর কাহিনী লিখেছেন কবি মুহম্মদ কবির। বিদ্যাসুন্দরের কাহিনী নিয়ে চমৎকার বই লিখেছেন সাবিরিদ খান।

মুহম্মদ কবির ছিলেন যােড়শ শতকের শেষাংশের করি। তিনি তাঁর কাব্য মধুমালতী লেখা শুরু করেছিলেন ১৫৮৩ অব্দে। সাবিরিদ খানও সম্ভবত ষােড়শ শতকেরই কবি। তাঁর কাব্য আছে বেশ কয়েকটি। বিদ্যাসুন্দর ছাড়াও তিনি লিখেছেন রসুলবিজয় ও হানিফা ও কয়রা পরী নামক আরাে দুটি কাব্য। কবি হিশেবে খুব ভালাে কবি ছিলেন বাহরাম খান। তাঁর কাব্যের নাম লাইলি-মজনু। তিনিও ছিলেন সােড়শ শতাব্দীর কবি। বাহরাম খান তাঁর কাব্যের শুরুতে একটি বড়াে আত্মকাহিনী বলেছেন। সে থেকে জানা যায় তার পিতার নাম ছিলাে মুবারক খান। তিনি ছিলেন নিজাম শাহের ‘দৌলত উজির’ অর্থাৎ অর্থমন্ত্রী। মুবারক খান মারা গেলে নিজাম শাহ কবি বাহরাম খানকে অর্থমন্ত্রী পদটি দান করেন। কবি নগর চট্টগ্রামের চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন ।

নগর ফতেয়াবাদ দেখিতে পুরএ সাধ,
চাটিগ্রামে সুনাম প্রকাশ। মনােহর মনােরম অমর নগর সম,
শতে শতে অনেক নিবাস। লবণাম্বু সন্নিকট কর্ণফুলি নদীতট
শুভপুরী অতি দীপ্যমান। চৌদিক বিশাল গড় উজল বিস্তর সর
তাহে শাহা বদর পয়ান। আরেকজন কবি ছিলেন আফজল আলী। তিনি একটি কাব্য লিখেছিলেন, কাব্যটির নাম নসিহত্যামা। ইতিহাস ও কল্পনা মিলিয়ে কয়েকজন কবি কাব্য লিখেছিলেন।

এসব কাব্যে ইতিহাস প্রায় রূপকথায় পরিণত হয়েছে। এসব কাব্যে কবিদের উদ্দাম কল্পনা দেখে অবাক হতে হয়। এ-রকম কাব্য লিখেছিলেন জৈনুদ্দিন, সাবিরিদ খান, শেখ ফয়জুল্লাহ। কবি জৈনুদ্দিনের কাব্যের নাম রসুলবিজয়, শেখ ফয়জুল্লাহর কাব্যের নাম গাজিবিজয়। ফয়জুল্লাহ গােরক্ষবিজয় নামে আরাে একটি কাব্য লিখেছিলেন। এ-সময়ে আরাে বেশ কয়েকজন কবি ছিলেন। তাঁদের নাম চাঁদ কাজি, শেখ কবির, মােজাম্মিল। যাদের কথা বললাম তাঁরা সবাই প্রায় ষােড়শ শতাব্দীর কবি। এ-সময়ে মুসলমান কবিরা একে একে কাব্যরাজ্যে আসছেন আর আসন অধিকার করছেন। তাঁদের কবিতা কাব্যমূল্যে বেশ মূল্যবান, যদিও বড়াে কবি নন তারা। এরপরে আসেন সপ্তদশ শতাব্দীর কবিরা। আসেন অনেক কবি। তাঁদের মধ্যে আছেন সৈয়দ সুলতান, শেখ পরাণ, হাজি মুহম্মদ, মুহম্মদ খান, সৈয়দ মর্তুজা, আবদুল হাকিম, কাজি দৌলত, আলাওল, মাগন ঠাকুর, এবং আরাে অনেকে। সৈয়দ সুলতান, আবদুল হাকিম, কাজি দৌলত এবং আলাওল বিখ্যাত কবি। তাঁরা সবাই মিলে বাঙলা কবিতাকে এমন সৌন্দর্য দান করেছিলেন, যা তাঁদের সহগামী হিন্দু কবিদের পক্ষে সম্ভব ছিলাে না। এর ফলে বাঙলা সাহিত্য মধ্যযুগ থেকে হয়ে ওঠে হিন্দু ও মুসলমান উভয়ের সম্পত্তি। তারা উভয়ে মিলে বুনে যেতে থাকে কাব্যলক্ষ্মীর শাড়ির পাড়।

কবি সৈয়দ সুলতানের জীবন যােড়শ এবং সপ্তদশ দু-শতকে বিস্তৃত ছিলাে। তিনি বেঁচেছিলেন অনেকদিল, আর লিখেছিলেন অনেক কাব্য। তার কয়েকটি কাব্য আকারে বিশাল। তাঁর কাব্যশক্তিও ছিলাে গৌরবজনক। কবি সৈয়দ সুলতান তার শবেমিরাজ কাব্যে নিজের বিশদ পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর কাব্যগুলাে হচ্ছে নবীবংশ, শবেমিরাজ, রসুলবিজয়, ওফাতে রসুল, জয়কুম রাজার লড়াই, ইবলিশনামা, জ্ঞানচৌতিশা, জ্ঞানপ্রদীপ। এছাড়া তিনি লিখেছেন মারফতি গান এবং পদাবলি। কবির নবীবংশ বিশাল বই। এ-কাব্যে কবির ইসলামপ্রচারক মনটি স্পষ্ট দেখা যায়। কবি এ-কাব্য সম্বন্ধে বলেছেন : কহে ছৈয়দ সুলতানে শুন নরগণ। এহি হিন্দি নবীবংশ শুন দিয়া মন। আছিল আরবী ভাষে হিন্দি করি। বঙ্গদেশী বুঝে মত প্রচারিয়া দিলু । ন বুঝি আরবী শাস্ত্র জ্ঞান ন পাইলা। হিন্দিয়ানি ভাষা পাই আচার জানিলা। কবি হাজি মুহম্মদের একটি কাব্য পাওয়া গেছে, কাব্যটির নাম নূরজামাল। কবি মুহম্মদ খানের কাব্যও আছে বেশ কয়েকটি। তাঁর কাব্যের নাম সত্যকলি-বিবাদসংবাদ, হানিফার লড়াই, মুকতাল হােসেন।

মধ্যযুগের একজন ভালাে কবি কবি আবদুল হাকিম। তাঁর আটটি কাব্যের খবর পাওয়া গেছে। তার কয়েকটি কাব্যের নাম হচ্ছে ইউসুফ-জুলেখা, নূরনামা, কারবালা, শহরনামা। কবি আবদুল হাকিম নিজেকে বাঙালি বলতে গর্ববােধ করতেন। সেই মধ্যযুগেই একদল মুসলমান দেখা দিয়েছিলাে যারা নিজেদের বাঙালি বলতে চাইতাে না। তারা নিজেদের আরবইরানের মানুষ ভাবতে চাইতাে। বাঙলা ভাষাকে তারা অবজ্ঞা করতাে। আবদুল হাকিম এদের ওপর ভয়ানক ক্ষেপেছিলেন। এসব পরগাছাদের নিন্দা করে তিনি লিখেছিলেন অমর কতিপয় পংক্তি; সে-পংক্তিগুলাে আছে তাঁর নূরনামা কাব্যে। পংক্তিগুলাে তুলে দিচ্ছি : যে সব বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী। সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি। দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে ন জুয়ায়। নিজ দেশ ত্যাগি কেন বিদেশ ন যায় । মাতাপিতামহক্রমে বঙ্গেত বসতি। দেশী ভাষা উপদেশ মান হিত অতি। এ-অংশ পড়লে বােঝা যায় কবি কী গভীরভাবে বাঙালি ছিলেন। বর্তমানের বাঙালিদের তিনি যথার্থ পূর্বপুরুষ; তবে তিনি যাদের নিন্দা করছেন, তারা এখনাে আছে বাঙলায়।

মধ্যযুগে আরাকানেও রচিত হয়েছিলাে বাঙলা সাহিত্য। এই আরাকানের প্রাচীন নাম ছিলাে রােসাঙ্গ। আরাকানের রাজদরবারে স্থান পেয়েছিলেন বাঙলা ভাষার কয়েকজন ভালাে কবি। তাঁদের মধ্যে আছেন আলাওল, কাজি দৌলত, মাগন ঠাকুর। এ-কবি তিনজনের সবাই সপ্তদশ শতকের মানুষ। কাজি দৌলত লিখেছিলেন একটি কাব্য; নাম সতীময়না বা লােরচন্দ্রানী। কাব্যটি তিনি নিজে সমাপ্ত করে যেতে পারেন নি। কিছু অংশ লেখার পরে তিনি পরলােকগমন করেন। পরে কাব্যটি সমাপ্ত করেন আলাওল। কাজি দৌলত জন্মগ্রহণ করেছিলেন চট্টগ্রামের রাউজান থানার সুলতানপুর গ্রামে। বয়স হবার পরে তিনি আরাকানের রাজসভায় যান, এবং আরাকানের রাজা সুধর্মের সেনাপতি আশরাফ খানের প্রীতি লাভ করেন। আশরাফ খানের উৎসাহে তিনি রচনা করেন সতীময়না নামক কাব্যটি।

আলাওল ছিলেন আরাকানের রাজসভার আশীর্বাদপ্রাপ্ত কবিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। শুধু তাই নয়, তিনি মধ্যযুগের মুসলমান কবিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। তিনি সমগ্র বাঙলা সাহিত্যের বড়াে কবিদের একজন। তার কথা পরে পৃথকভাবে বলবাে। কবি আলাওলকে আশ্রয় দিয়েছিলেন মাগণ ঠাকুর। তাঁর নামটি অদ্ভুত; তবে তিনি ছিলেন মুসলমান। তিনি ছিলেন আরাকানের অধিবাসী। মাগন ঠাকুরও একটি ভালাে কাব্য লিখেছিলেন চন্দ্রাবতী নামে। তিনিও বেশ ভালাে কবি ছিলেন।

মুসলমান কবিদের সংবাদ আমরা সব জানি না। কেননা বাঙলা সাহিত্যের ইতিহাস রচনার জন্যে যখন তথ্য সংগ্রহ করা শুরু হয়, তখন মুসলমান কবিদের কাব্য বিশেষ সংগ্রহ করা হয় নি। কে করবে ? মুসলমানেরা চিরদিনই এসব বিষয়ে উদাসীন। তবু কিছু সংবাদ পাওয়া গেছে। পাওয়া গেছে একজন মহাপুরুষের চেষ্টায়। তার নাম আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ [১৮৭১-১৯৫৩)। তিনি ছিলেন চট্টগ্রামের অধিবাসী। তিনি গ্রামেগ্রামে ঘুরে সংগ্রহ করেছেন মুসলমান কবিদের পুথি। যদি আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ না জন্মাতেন, তাহলে হয়তাে মুসলমান কবিদের সাধনার কথা জানতে পেতাম না। তাই তিনি চিরস্মরণীয়।

আরো পড়ুন

লাল নীল দীপাবলি বা বাংলা সাহিত্যের জীবন | হুমায়ুন আজাদ [03]

Bcs Preparation

লাল নীল দীপাবলি বা বাংলা সাহিত্যের জীবন | হুমায়ুন আজাদ [01]

Bcs Preparation