সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২১
Home » লাল নীল দীপাবলি বা বাংলা সাহিত্যের জীবন | হুমায়ুন আজাদ [03]
লাল নীল দীপাবলি

লাল নীল দীপাবলি বা বাংলা সাহিত্যের জীবন | হুমায়ুন আজাদ [03]

লাল নীল দীপাবলি বা বাংলা সাহিত্যের জীবন | হুমায়ুন আজাদ [03]

লাল নীল দীপাবলি বা বাংলা সাহিত্যের জীবন | হুমায়ুন আজাদ [03]

আলাওল

আলাওল, কবি; বড়াে কবি। তিনি লিখেছেন অনেকগুলাে কাব্য, আর প্রত্যেক কাব্যে লিখেছেন অসংখ্য ভালাে কবিতার পংক্তি। তিনি সপ্তদশ শতকের কবি। তাঁর কবিতা পড়ার সময় আগে মনে দাগ কাটে তাঁর ভাষা। সে-সময় কবিরা ভাষার দিকে বিশেষ নজর দিতেন। কিন্তু আলাওল কবিতা লেখার সময় ভাষাকে ভাবতেন দেবতা, তাকে সুন্দর করে সাজিয়ে দিতেন। সেকালের অনেক বড়ােবড়াে কবি ছিলেন ভাষার ব্যবহারে গ্রাম্য। তাঁরা যে-কোনাে শব্দকে কবিতার চরণে ঠাই দিতেন। কবি আলাওল ছিলেন অন্যরকম। ভাষাকে সাজাতেন নানা অলঙ্কারে, অনেক অপ্রচলিত মনােহর শব্দকে তিনি ডেকে আনতেন এবং কবিতাকে করে তুলতেন সুনির্মিত প্রাসাদের মতাে চমৎকার। আলাওলের “পদ্মাবতী” কাব্যটি পড়ার সময় বারবার মনে হয় যেনাে ক্রমশ একটি সযত্নে নির্মিত প্রাসাদের ভেতর প্রবেশ করছি। তার কক্ষেকক্ষে ছড়িয়ে আছে সৌন্দর্য।

আলাওল সপ্তদশ শতকের কবি। তাঁর জন্ম, জন্মস্থান ইত্যাদি নিয়ে বিতর্ক আছে। কেউ বলেন, তিনি ফরিদপুরের লােক; কেউ বলেন, আলাওল চট্টগ্রামের মানুষ। তবে একথা ঠিক তার জীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে চট্টগ্রামে, বিশেষ করে আরাকানে। আলাওল বিভিন্ন কাব্যে নিজের কথা বলেছেন। তা থেকে জানা যায় কবি আলাওলের জীবন শাদামাটা ছিলাে না, তাতে আছে অনেক ওঠানামা, আছে রােমাঞ্চ, আছে জীবনের সুখ ও দুঃখের টানাপােড়েন। কবির পিতা ছিলেন ফতেহাবাদ অঞ্চলের অধিপতি মজলিশ কুতুবের প্রধান কর্মচারী। একসময়ে আলাওল তাঁর পিতার সাথে নৌকো করে কোথাও যাচ্ছিলেন। সে-সময় বাঙলার নদীতেনদীতে দস্যুতা করে ফিরতে পর্তুগিজরা। আলাওলের পিতার নৌকো আক্রমণ করে পর্তুগিজ জলদস্যুরা। অনেকক্ষণ লড়াই হয় তাদের মধ্যে। সে-লড়াইয়ে আলাওলের পিতা নিহত হন। কবির জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। অনেক কষ্টের মুখে আলাওল আসেন আরাকানে। আলাওলের বয়স তখন কম; যােললা থেকে কুড়ির মধ্যে। আলাওল ভর্তি হন আরাকানের রাজার অশ্বারােহী সেনাবাহিনীতে। সে-সময় আরাকানের রাজদরবারে অনেক নামকরা মুসলমান কর্মচারী ছিলেন। তাঁরা কবি আলাওলের প্রকৃত পরিচয় পেয়ে তাকে উৎসাহ দেন কবিতা রচনা করতে। তাদের উৎসাহ পেয়ে সৈনিক আলাওল কবি হয়ে ওঠেন। কবি আলাওল তাঁর জীবনের যে-সব কথা বলেছেন, তা শােনার মতাে। তিনি পদ্মাবতী কাব্যে নিজের সম্বন্ধে যা বলেছেন, তার খানিকটা :

মুলুক ফতেহাবাদ গৌড়েত প্রধান। তথাত জালালপুর পুণ্যবন্ত স্থান ॥ বহু গুণবন্ত বৈসে খলিফা ওলামা। কথেক কহিমু সেই দেশের মহিমা । মজলিশ কুতুব তাহাতে অধিপতি। মুই হীন দীন তান অমাত্য সন্ততি৷ কার্যগতি যাইতে পথে বিধির গঠন।

হার্মাদের নৌকা সঙ্গে হৈল দরশন ॥… কহিতে বহুল কথা দুঃখ আপনার।রােসাঙ্গ আসিয়া হৈলুং রাজ আদােয়র আলাওল কবি হয়ে উঠলেন। খ্যাতি লাভ করলেন। কিন্তু তখন ঘনিয়ে আসে আরেক বিপদ। শাহ সুজা তখন পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছে আরাকানে। কিছুদিন পরে সুজাকে হত্যা করা হয় রাজদ্রোহিতার অপরাধে। আলাওলকেও জড়ানাে হয় এ-দ্রোহিতার সাথে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযােগ করা হয় যে তিনি শাহ সুজার লােক। এ-অভিযােগে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়, এবং পঞ্চাশ দিন বিনা বিচারে আটক রাখা হয় কারাগারে। আলাওলের শেষ জীবনও সুখে কাটে নি, রাজা তাঁর ওপর সুনজর রাখে নি বলে। কবি তাঁর এ-দুঃসময় সম্বন্ধে বলেছেন, ‘আয়ুবশ আমারে রাখিল বিধাতায়। সবে ভিক্ষা প্রাণ রক্ষা ক্লেশে দিন যায়।’ কবি তাঁর বিভিন্ন কাব্যে এ-সময়ের বেদনার কথা উল্লেখ করেছেন সাশ্রু নয়নে। কবি আরাে বলেছেন, মন্দকৃতি ভিক্ষাবৃত্তি জীবন কর্কশ।

আরো পড়ুন : লাল নীল দীপাবলি বা বাংলা সাহিত্যের জীবন | হুমায়ুন আজাদ [01]

কবি আলাওল সম্ভবত জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৫৯৭ অব্দে এবং তার মৃত্যু হয় ১৬৭৩ অব্দে। আলাওল যখন আরাকানে আসেন তখন আরাকানের রাজা ছিলেন খদোমিতার। থদোমিন্যারের একজন প্রধান কর্মচারী ছিলেন মাগণ ঠাকুর। আলাওল মাগণ ঠাকুরের প্রীতি লাভ করেন, এবং তাঁরই উৎসাহে মনােযােগ দেন কাব্যরচনায়। আলাওলের শ্রেষ্ঠ কাব্যের নাম পদ্মবতী। এ-কাব্য আলাওল রচনা করেন মাগণ ঠাকুরের অনুরােধে। পদ্মাবতী রচিত হয় ১৬৪৮ সালে। এটি বিখ্যাত হিন্দি কবি মালিক মুহম্মদ জায়সির পদুমাবত-এর কাব্যানুবাদ। আলাওলের জীবনে মাগণ ঠাকুরের প্রভাব অসীম; তিনি কবিকে কয়েকটি কাব্যরচনায় উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। মাগণ ঠাকুরের অনুরােধে তিনি অনুবাদ করেন ফারসি কাব্য, সয়ফলমূলক-বদিউজ্জামাল। কাব্যটি তিনি শেষ করতে পারেন নি। বইটি যখন অনেকখানি লেখা হয়ে গেছে, তখন অকস্মাৎ লােকান্তরিত হন কবির উৎসাহদাতা মাগণ ঠাকুর। তাই কবি এটাকে অসমাপ্ত রেখে দেন। আলাওলের আর একটি কাব্যের নাম হপ্তপয়কর; এটিও একটি অনুবাদ কাব্য। এটির মূল রচয়িতা ফারসি কবি নিজামী। ১৬৫৯ সালে কবির যখন বেশ বয়স তখন তিনি আরাকানের আরাে একজন বড়াে কবির একটি অসমাপ্ত কাব্য সমাপ্ত করেন। সে-কবির নাম কাজী দৌলত; তাঁর কাব্যের নাম সতীময়না। এ-কাব্যটি তিনি রচনা করেন সুলায়মান নামক এক দ্রলােকের অনুপ্রেরণায়। আলাওলের আরাে কয়েকটি উল্লেখযােগ্য কাব্য আছে। সেগুলাে হলাে তােহফা, দারাসেকেন্দারনামা। সেকেন্দারনামা কাব্যটির মূল লেখক কবি নিজামী। এ-কাব্য তিনি যখন রচনা করেন তখন কবি আলাওল ছিলেন মজলিশ নবরাজ নামক এক ভদ্রলােকের আশ্রিত। আলাওল কেবল বড়াে বড়াে কাহিনীকাব্য রচনা করেন নি, তিনি লিখেছিলেন পদাবলিও। এগুলােও আলাওলের প্রতিভার স্বাক্ষর।

আলাওলের প্রধান কাব্য কোনটি? পদ্মাবতী। বাঙলা কবিতা আলাওলকে এ-কাব্যের জন্যে এতােদিন স্মরণে রেখেছে, এবং রাখবে আরাে বহুদিন। আলাওলের পদ্মাবতী যদিও অনুবাদ কাব্য, তবু এটি নতুন সৃষ্টি। প্রাচীন হিন্দি ভাষার মহাকবি ছিলেন মালিক মুহম্মদ জায়সি। তিনি পদ্মাবতী-রত্নসেন-নাগমতী-আলাউদ্দিন খিলজির মনােহর কাহিনী রচনা

করেছিলেন পদ্মাবত নামে। এ-গল্পের কাহিনীকে ঐতিহাসিক কাহিনী মনে হলেও এ কিন্তু সত্যিকারের ইতিহাস নয়। পদ্মবতী নামক এক অপরূপ রূপসী রাজকন্যার কাহিনী অনেক দিন ধরে এদেশে প্রচলিত। সেই কাহিনীকে কাব্যরূপ দিয়েছিলেন কবি জায়সি। জায়সির এ-কাব্য নিজের মতাে করে অনুবাদ করেন কবি আলাওল।

পদ্মাবতীর কাহিনীটি সুন্দর। পদ্মাবতী ছিলাে সিংহলরাজকন্যা। অপরূপ রূপসী। তার ‘ সৌন্দর্যের খ্যাতি এক পাখির মুখে শােনে চিতাের-রাজ রত্নসেন। সে সিংহলে যায়, এবং লাভ করে পদ্মাবতীকে। ফিরে আসে দেশে। তখন দিল্লির সম্রাট আলাউদ্দিন খিলজি। সে একদিন শশানে পদ্মাবতীর অপরূপ রূপের কথা। সে রত্নসেনের কাছে দাবি করে পদ্মাবতীকে। এতে রত্নসেন রেগে যায়, এবং তাদের মধ্যে যুদ্ধ বাধে। আলাউদ্দিন যুদ্ধে না পেরে কৌশলে বন্দী করে রত্নসেনকে। কিন্তু পরে মুক্ত হয় রত্নসেন। ওদিকে আরেক রাজা, যার নাম দেবপাল, সেও পদ্মবতীকে লাভ করতে চায়। দেবপাল ও রত্নসেনের মধ্যে এ নিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধে লাভ হয় না কারাে, সবাই প্রাণ হারায়। যুদ্ধে প্রাণ হারায় দেবপাল এবং আহত হন রত্নসেন। আহত রত্নসেন পরে মারা যায় । সতী নারী অপরূপ রূপসী পদ্মাবতী স্বামীর চিতায় উঠে সহমরণ বরণ করে। মালিক মুহম্মদ জায়সির কাহিনীটি রূপক, অর্থাৎ তিনি এ-পৃথিবীর কাহিনী অবলম্বন করে শােনাতে চেয়েছিলেন মানবজীবনের গৃঢ় কথা। তবে আমাদের সে-কথায় কোনাে লােভ নেই, আমরা চাই চমৎকার গল্প আর কবিতা। মালিক মুহম্মদ দুটিই দিয়ে গেছেন। আলাওল সে-কাব্য অনুবাদ করেন বাঙলা ভাষায়।

আলাওলের পদ্মাবতী কাব্য থেকে তাঁর রচনার কিছু উদাহরণ তুলে আনছি। এ-অংশে কবি পদ্মাবতীর রূপ বর্ণনা করেছেন। মধ্যযুগের কবিতার একটি রীতি ছিলাে নায়িকার রূপের পরিপূর্ণ বর্ণনা দেয়া। আজকাল আর তেমন হয় না। আজকাল লেখকেরা নায়কনায়িকার সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তুলতে চান ইঙ্গিতে। মধ্যযুগে ছিলাে অন্যরকম। তখন কবিরা নায়িকার রূপ আপাদমস্তক বর্ণনা করতেন। বলতেন তার চুল কেমন, চোখ কেমন, ঠোট কেমন ইত্যাদি। শরীরের কোনাে অংশ বাদ দেয়া হতাে না। রূপ বর্ণনায় কবিরা ব্যবহার করতেন একটির পর একটি উপমা। এর ফলে নায়িকার বিশেষ বিশেষ অঙ্গের রূপ সত্যিই ফুটে উঠতাে। কিন্তু মুশকিল হতাে সারা শরীর নিয়ে। দেখা যেতাে সুন্দর সুন্দর অঙ্গের অদ্ভুত সংস্থানে নায়িকারা অদ্ভুত হয়ে পড়েছে। আলাওলের বর্ণনা শােনা যাক :

পদ্মাবতী রূপ কি কহিমু মহারাজ। তুলনা দিবারে নাহি ত্রিভুবন মাঝ। আপাদলম্বিত কেশ কস্তুরী সৌরভ। মহাঅন্ধকারময় দৃষ্টি পরাভব৷ তার মধ্যে সীমন্ত খড়গের ধার জিনি। বলাহক মধ্যে যেন স্থির সৌদামিনী । স্বর্গ হন্তে আসিতে যাইতে মনােরথ। সৃজিল অরণ্যমাঝে মহাসূক্ষ্ম পথা পদ্মাবতীর রূপ অপূর্ব, তবে কবির ভাষা বুঝতে কিছুটা অসুবিধা হতে পারে। কবি কী বলছেন এখানে? আসলে কবি নন, এক হীরামণ পাখি রত্নসেনকে বলছে, মহারাজ পদ্মাবতীর রূপের কথা আমি আর কী বলববা! তার সাথে তুলনা দিতে পারি এমন জিনিশ তাে ত্রিভুবনে নেই। তার মাথার কেশরাশি পা পর্যন্ত লম্বা, আর তাতে ভরপুর সর্বদা মৃগনাভির সৌরভ। সে-কেশরাশি এতাে কালাে যে চোখের দৃষ্টি সেখানে পরাজিত হয়, তা রাত্রির মতাে। তােমরা যখন বড়াে হবে চুল সম্বন্ধে একজন আধুনিক কবির এরকম এক অসাধারণ পংক্তির সাক্ষাৎ পাবে। সে-কবির নাম জীবনানন্দ দাশ। তার একটি বিখ্যাত কবিতা হচ্ছে বনলতা সেন’। জীবনানন্দ দাশ বনলতা সেনের চুলের কথা বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা।’ চমৎকার না? যাক, আমরা আলাওলে ফিরে আসি। কবি এরপরে সিথির কথা বলছেন।

পদ্মাবতীর সিথি কেমন? তা খুব সরু, সুন্দর, তীক্ষ্ণ, এমনকি তরবারির তীক্ষ্ণতার চেয়েও অধিকতর তীক্ষ পদ্মাবতীর সিঁথি। তারপর কবি একটি উপমা দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন সে-সিঁথির সৌন্দর্য। বলছেন, ওই সিঁথির রেখাকে মনে হয় যেনাে কালাে মেঘের মধ্যে স্থির হয়ে আছে বিদ্যুৎরেখা। এতেও কবির মন ভরে নি। তাই তিনি দেন আরাে একটি উপমা। বলেন, স্বর্গ থেকে আসা-যাওয়ার জন্যে সৌন্দর্যের দেবতা অরণ্যের মধ্যে এক সূক্ষ্ম পথ নির্মাণ করেছিলেন, পদ্মাবতীর সিঁথি তেমনি সুন্দর, নয়নাভিরাম। আলাওল কিন্তু খুব সহজ কবি নন। তিনি কথা বলেন উপমায়, অলঙ্কারে এবং অনেক সময় বেশ শক্ত শব্দে। তিনি মনােযােগ দিয়ে পড়ার মতাে কবি।

লােকসাহিত্য :

বুকের বাঁশরি আমরা বাতাসের সাগরে ডুবে আছি। তবু অনেক সময় মনে থাকে না যে আমাদের ঘিরে আছে বাতাস। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ একবার বাতাসের সাথে তুলনা করেছিলেন লােকসাহিত্যকে। বাতাস যেমন আমাদের ঘিরে আছে, তেমনি আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছে লােকসাহিত্য। কিন্তু তার কথা আমাদের মনে থাকে না। তা যে বাতাসের মতােই উদার, বাতাসের মতােই সীমাহীন। যে-সাহিত্য লেখা হয় নি তালপাতার মূল্যবান গাত্রে, যে-সাহিত্য পায় নি সমাজের উঁচুতলার লােকদের আদর, যে-সাহিত্য পল্লীর সাধারণ মানুষের কথা বলেছে গানেগানে, যে-সাহিত্যের রচয়িতার নামও অনেক সময় হারিয়ে গেছে, তাকে বলা হয় লােকসাহিত্য। এ-সাহিত্য বেঁচে আছে শুধুমাত্র পল্লীর মানুষের ভালােবাসা ও স্মৃতি সম্বল করে। অনেক ছড়া আমরা পড়ি, জানি না সেগুলাের রচয়িতা কারা? এগুলাে অনেক দিন ধরে বেঁচে আছে পল্লীর মানুষের কণ্ঠে। অনেক গীতিকা আমরা শুনি, জানি না কখন কোন কবি লিখেছিলেন এ-বেদনাময় কাহিনী । এ-সবই লােকসাহিত্যের সম্পদ।

লিখিত সাহিত্যের থাকে নির্দিষ্ট লেখক। কিন্তু লােকসাহিত্যের কোনাে সুনির্দিষ্ট লেখকের পরিচয় পাওয়া যায় না। মনে হয় যেনাে সারা সমাজ একসাথে বসে নিজেদের মনের কথা গানের সুরে বলেছে। তা লেখা হয় নি কাগজে বা তালপাতায়। তবে তা লেখা হয়েছে মানুষের হৃদয়ে। গ্রামের মানুষ সে-গান মনে রেখেছে, আনন্দে বেদনায় তা গেয়েছে। এভাবে বেঁচে আছে লােকসাহিত্য। লােকসাহিত্যের সৃষ্টি ও বিকাশের রীতি বেশ চমত্তার। ধরা যাক ছড়ার কথা। কখন যে কার মনে কোন ঘটনা দাগ কেটেছে, এবং সে ঘটনা ছন্দ লাভ করেছে, তা আজ আর বলা সম্ভব নয়। কিন্তু সেই ছড়া একজনের কাছ থেকে ক্রমশ ছড়িয়ে পড়েছে সারা সমাজে। সমাজের যখন ভালাে লেগেছে ছড়াটিকে, তখন সেটিকে মুখেমুখে ছড়িয়ে দিয়েছে চারদিকে। এভাবে ছড়াটি হয়ে উঠেছে সমগ্র সমাজের সৃষ্টি। কোনাে নির্দিষ্ট লেখকের নাম আর পাওয়া যায় না। আবার ধরা যাক কোনাে গীতিকার কথা। গীতিকা হয় বেশ দীর্ঘ; তাতে বড়াে কাহিনী বলা হয়ে থাকে।

কিন্তু অধিকাংশ গীতিকার লেখকের নাম পাওয়া যায় না। কেননা পাওয়া যায় না? পাওয়া যায় , কেননা হয়তাে তার কোনাে একজন নির্দিষ্ট কবি নেই, অনেকের মনের কথা হয়তাে জমাট বেঁধে একটি গীতিকায় রূপ পেয়েছে। আবার হয়তাে কোনাে একজন কবি মূলে সত্যিই রচনা করেছিলেন গীতিকাটি। রচনা হয়ে যাওয়ার পরে তিনি সেটি গান করেন সকলের সামনে। ভালাে লাগে সকলের গীতিকাটি। তখন সমাজের লােকেরা মুখস্থ করে নেয় গীতিকাটিকে। তারপর কেটে যায় অনেক বছর। যে-কবি আগে রচনা করেছিলেন গীতিকাটি, কালের প্রবাহে তাঁর নাম যায় হারিয়ে, তখন গীতিকাটি হয়ে ওঠে সারা সমাজের সৃষ্টি। কেননা কবির রচনা এর মধ্যে অনেক বদলে গেছে মানুষের কণ্ঠেকণ্ঠে ফিরেফিরে। | বাঙলা সাহিত্য বেশ ধনী লােকসাহিত্যে। প্রচুর লােকসাহিত্য আছে আমাদের। গ্রামেগ্রামে ছড়িয়ে ছিলাে, এবং আজো আছে। দ্রলােকেরা এর সংবাদ অনেক দিন জানতাে না। কেননা লােকসাহিত্য লিখিত হয় নি, তা বেঁচে ছিলাে গ্রামের মানুষের মনে। তারাই ছিলাে লােকসাহিত্যের লালনপালনকারী। তারপর এক সময় আসে যখন দ্রলােকদের দৃষ্টি পড়ে সেদিকে। শুরু হয় লােকসাহিত্য সগ্রহ।

আরো পড়ুন : লাল নীল দীপাবলি বা বাংলা সাহিত্যের জীবন | হুমায়ুন আজাদ [02]

বাঙলাদেশের গ্রামাঞ্চল থেকে সংগৃহীত হয় অনেক ছড়া, অনেক গীতিকা। আমরা সেগুলাের স্বাভাবিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হই। বাঙলা লােকসাহিত্য সগ্রহের জন্যে যাদের নাম বিখ্যাত, তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত চন্দ্রকুমার দে (১৮৮৯-১৯৪৬)। তিনি ছিলেন ময়মনসিংহের অধিবাসী। লােকসাহিত্যের প্রতি তার ছিলাে প্রবল অনুরাগ; তাই তিনি সংগ্রহ করেছিলেন অনেকগুলাে গীতিকা। তাঁর সংগৃহীত গীতিকাগুলােকে সম্পাদনা করে ময়মনসিংহ গীতিকা (১৯২০) নামে প্রকাশ করেন ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেন। দীনেশচন্দ্র সেন নিজে সংগ্রাহক ছিলেন না, কিন্তু তার ছিলাে লােকসাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ। তিনি লােকসাহিত্যকে দেশেবিদেশে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও লােকসাহিত্যের অনুরাগী ছিলেন। তিনি সগ্রহ করেছিলেন অনেকগুলাে ছড়া। কেবল ছড়া সগ্রহ করে তিনি থেমে যান নি। লােকসাহিত্যের ওপর একটি অসাধারণ বইও তিনি লিখেছিলেন লােকসাহিত্য নামে। এবই লােকসাহিত্যকে জনপ্রিয় করতে অনেক সহায়তা করেছে। রূপকথা সংগ্রহ করেছিলেন দক্ষিণারঞ্জন মিত্ৰমজুমদার [১৮৭৭-১৯৫৭], উপেন্দ্রকিশাের রায়চৌধুরী (১৮৬৩-১৯১৫)। দক্ষিণারঞ্জন মিত্রমজুমদারের রূপকথা সংগ্রহের নাম ঠাকুরমার ঝুলি, ঠাকুরদাদার ঝুলি। উপেন্দ্রকিশাের রায়চৌধুরীর রূপকথা সংগ্রহের নাম টুনটুনির বই। এছাড়া আছেন আরাে অনেক সংগ্রাহক, যাদের সকলের চেষ্টায় আমরা পাচ্ছি এক অপূর্ব লােকসাহিত্যের ভাণ্ডার।

লােকসাহিত্যের পৃথিবী পল্লী। লােকসাহিত্য পল্লীর মানুষের আনন্দকে ফুটিয়েছে ফুলের মতােন, বেদনাকে বাজিয়েছে একতারার সুরের মতােন। এ-সাহিত্যে আছে সরল অনুভবের কথা, এ-সরলতাই সকলকে মােহিত করে। লােকসাহিত্য পল্লীর মানুষের বুকের বাঁশরি। লােকসাহিত্যে দেখা যায় অতি সহজ করে অনেক গভীর কথা বলা হয়েছে। লােকসাহিত্যের কবিদের যেনাে চিন্তা করার দরকারই ছিলাে না, তাঁরা অবলীলায় বলে যেতেন তাঁদের কথা। তাই লােকসাহিত্যে পাওয়া যায় চমৎকার সহজ উপমা, সরল বর্ণনা। লােকসাহিত্যের ভাণ্ডার কিন্তু অনেক বড়াে, অনেক বিশাল। অনেক রকমের সৃষ্টি সেখানে দেখা যায়। লােকসাহিত্যে কী কী আছে? আছে ছড়া, প্রবাদ, আছে গীতি, গীতিকা, ধাঁধা, রূপকথা, এবং আরাে অনেক কিছু। আমরা সব সময় না হলেও মাঝে মাঝে ছড়া কাটি, এ-ছড়া লোেকসাহিত্যের এক গৌরব। গীতি ও গীতিকা লােকসাহিত্যের অনেকখানি অধিকার করে আছে। প্রবাদের কথা তাে সবাই জানে, আর ছােটোরা ভালােবাসে রূপকথা কেমন অশ্চার্য সে-সব গল্প ।

ছড়া বড়াে মজার।

সারাটি বাল্যকালই তাে আমাদের কাটে ছড়ার যাদুমন্ত্র উচ্চারণ করে করে। কে এমন আছে যে বাল্যকালে মাথা দুলিয়ে ছড়া কাটে নি? ছড়ায় যাদু আছে। যে-সব কথা থাকে ছড়ার মধ্যে তার অনেক সময় কোনাে অর্থই হয় না, বা অর্থ খুঁজে পাই না; তার এক পংক্তির অর্থ বুঝি তাে পরের পংক্তির মানে বুঝি না। ছড়া আসলে অর্থের জন্যে নয়, তা ছন্দের জন্যে, সুরের জন্যে। অনেক আবােলতাবােল কথা থাকে তার মধ্যে, এ-আবােলতাবােল কথাই মধুর হয়ে ওঠে ছন্দের নাচের জন্যে। একটি ছড়া শােনা যাক : আগডুম বাগডুম ঘােড়াডুম সাজে ঝাঁঝর কাসর মৃদঙ্গ বাজে দুটি পংক্তি আমরা গুণগুণ করলাম। এর অর্থ বােঝার কোনাে দরকার নেই। তুমি কেবল এর ছন্দে মাতাল হও, এর ভেতর যে কোনাে অর্থ থাকতে পারে তার কথা একেবারে ভুলে যাও, কেবল এর ছন্দের যাদুতে নাচো, নাচো। ছড়ায় কোনােই অর্থ থাকে , সে-কথা অবশ্যি পুরাে সত্যি নয়। ছড়ায় অর্থ থাকে গভীর গােপনে, অনেক তলে লুকিয়ে; সে ধরা দিতে চায় না, কেননা তার অর্থটা বড়াে নয়। একটি ছড়া, যার ভেতর অনেক দুঃখ লুকিয়ে আছে, তুলে আনছি :

ছেলে ঘুমালাে পাড়া জুড়ালাে বর্গী এলাে দেশে বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেব কিসে ধান ফুরুলাে পান ফুরুলাে খাজনার উপায় কি

আর কিছু কাল সবুর করাে রসুন বুনেছি এটা একটি ঘূমপাড়ানাে ছড়া। এর ছন্দ নাচের চঞ্চল ছন্দ নয়, এর পংক্তিতে পংক্তিতে আছে স্বপ্নময় ঘুমের আবেশ। কিন্তু এটির ভেতর হেঁড়া সুতাের মতাে রয়ে গেছে বর্গীদের অত্যাচারের কথা। বর্গীরা অর্থাৎ মারাঠি দস্যুরা একসময় বাঙলায় ত্রাসের রাজত্ব পেতেছিলাে; ছড়াটির মধ্যে ধরা আছে তার স্মৃতি। ছড়ার মাঝে এভাবে লুকিয়ে থাকে ইতিহাস। কিন্তু ছড়ার স্বাদ তার ছন্দে, তার মন্ত্রের মতাে ধ্বনিতে।

গীতিকা লােকসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। গীতিকা ছড়ার মতাে ছােটো নয়, গীতিকা আকারে অনেক বড়াে। এতে বলা হয় নরনারীর জীবন ও হৃদয়ের কথা। বাঙলা ভাষায় গীতিকার বিরাট ভাণ্ডার রয়েছে। এসকল গীতিকার মধ্যে কয়েকটি হচ্ছে মহুয়া, দেওয়ানা মদিনা, মলুয়া। এগুলাে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিলাে ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেন সম্পাদিত ময়মনসিংহ গীতিকায় । গীতিকাসমূহে একজন পুরুষ এবং একজন নারীর হৃদয় দেয়ানেয়ার বিষাদময় কাহিনী বর্ণনা করা হয়। গীতিকার নায়কনায়িকারা পল্লীর গাছপালার মতাে সরল সবুজ, তারা পরস্পরকে ছাড়া আর কিছু জানে না। এর ফলে গীতিকায় পাওয়া যায় চিরকালের নরনারীর কামনাবাসনার কাহিনী।

একটি গীতিকার কাহিনী বলছি। গীতিকাটির নাম মহুয়া। এক বেদের দল ছিলাে, তার সর্দার হুমরা বেদে। বেদেরা সাধারণত কঠিন মানুষ হয়, হুমরা বেদেও তেমনি। তারা জীবিকা অর্জন করতে নানা জায়গায় খেলা দেখিয়ে। একবার হুমরা বেদে কাঞ্চনপুর গ্রামে খেলা দেখাতে যায়। সে-গ্রাম থেকে হুমরা একটি শিশুকন্যাকে নিয়ে পালিয়ে যায়। এমেয়ের নাম হয় মহুয়া। মহুয়া হুমরাকে জানতাে তার পিতা বলে। বেশ কয়েক বছর কেটে যায়। বড়াে হয় মহুয়া। সে দেখতে অপূর্ব সুন্দর। সে খেলাও দেখায় অপূর্ব। একবার হুমরা বেদের দল খেলা দেখাতে যায় বামনকান্দা গ্রামে। সে-গ্রামের এক যুবক, যার নাম নদের চাঁদ, মহুয়ার খেলা এবং মহুয়াকে দেখে মুগ্ধ হয়। মহুয়াও মুগ্ধ হয় নদের চাঁদকে দেখে। তারা ভালােবেসে ফেলে একে অপরকে। একথা জানতে পারে হুমরা বেদে। সে তার দলবল এবং মহুয়াকে নিয়ে আবার পালিয়ে যায়। কিন্তু নদের চাঁদ ও মহুয়া কেউ ভােলে না কারাে কথা। অনেক খুঁজে আবার নদের চাঁদ দেখা পায় মহুয়ার। হুমরা মহুয়াকে।

আদেশ দেয় নদের চাঁদকে হত্যা করার। তার বদলে মহুয়া ও নদের চাঁদ যায় পালিয়ে। তারা বাসা বাঁধে, সুখে সময় কাটাতে থাকে। কিন্তু সুখ তাদের জন্যে নেই। তাদের ভুলে যায় নি হুমরা বেদে। হুমরা বেদে খুঁজতে থাকে নদের চাঁদ ও মহুয়াকে। একসময় দেখা পায় এ-সুখী দম্পতির। তার মনে জ্বলে ওঠে আগুনের মতাে প্রতিহিংসা। হুমরা বেদে মহুয়ার হাতে তুলে দেয় বিষমাখা ছুরি, বলে নদের চাঁদকে হত্যা করতে। কিন্তু কীভাবে এ সম্ভব, কেননা নদের চাঁদ যে তার কাছে নিজের চেয়েও প্রিয়। তাই মহুয়া পারে নি বেদের আদেশ মানতে। কিন্তু বেদের আদেশ অবশ্য পালনীয়, একথা সে জানতাে। তাই মহুয়া নদের চাদের বদলে নিজের কোমল বক্ষে আমূল বিদ্ধ করে বিষাক্ত ছুরিকা। সাথেসাথে হুমরার সাথীরা হত্যা করে নদের চাঁদকে। তাদের দুজনকে কবর দেয়া হয় পাশাপাশি। তারপর চলে যায় বেদেরা। শুধু থাকে একজন তাদের কবরের পাশে মােমবাতির মতাে জেগে; সে মহুয়ার চিরদিনের বান্ধবী পালঙ। বড়াে বেদনার গল্প মহুয়া। | বাঙলা সাহিত্যে যে-কটি বিখ্যাত গীতিকা আছে, তাদের সবগুলােই প্রায় সংগ্রহ করা হয়েছিলাে ময়মনসিংহ জেলা থেকে। বাঙলার গীতিকাগুলাের সৌন্দর্য অশেষ। মধ্যযুগের কাহিনীকাব্যগুলাের মধ্যে এগুলােই শ্রেষ্ঠ : মঙ্গলকাব্য এগুলাের পাশে খুবই মান।

আরো পড়ুন :   লাল নীল দীপাবলি বা বাংলা সাহিত্যের জীবন | হুমায়ুন আজাদ [02]

দ্বিতীয় অন্ধকার

বাঙলা সাহিত্যের শুরুতে আছে একটি আঁধার যুগ। তখন দেড়শাে বছর কেটেছে অন্ধকারে। সে-সময়ের কোনাে লেখা আসে নি আমাদের হাতে। আবার মধ্যযুগ যখন শেষ হয়, তখন নামে সামান্য অন্ধকার। অবশ্য এমন নয় যে এ-সময় কিছু লেখা হয় নি। লেখা হয়েছে, অনেক লেখা হয়েছে। তার প্রায় সবটাই এসেছে আমাদের কাছে। কিন্তু তবু এসময়ে আমাদের সাহিত্যের আঙিনায় আলাের অভাব পড়েছিলাে; নেমেছিলাে অন্ধকার। মধ্যযুগে বাঙলা সাহিত্যে অনেক মূল্যবান সৃষ্টি হয়েছে। মধ্যযুগ একসময় শেষ হয়ে আসে। দেশে দেখা দেয় নানা বিপর্যয়। সুজলা সুফলা বাঙলায় দেখা দেয় হাহাকার। রাজনীতির ক্ষেত্রে দেখা দেয় পরিবর্তন। ১৭৫৭ অব্দে আমরা হারাই স্বাধীনতা। ইংরেজরা বাণিজ্য করতে এসে দখল করে নেয় আমাদের দেশ। বণিক হয় শাসক। রাজা বদল হয়। শুধু যে রাজাই বদলায় তা নয়, বদলে যায় অনেক কিছু। অর্থাৎ সমাজের যে-ভিত্তি এতােদিন অকম্পিত ছিলাে, তা ওঠে ভয়ংকরভাবে নড়ে। সমাজে সৃষ্টি হয় নতুন ধনিক শ্ৰেণী।

আগে যারা ছিলাে সমাজের মাথা, তারা পিছিয়ে পড়ে, এগিয়ে যায় যারা ছিলাে পেছনে। সাহিত্যেরও পরিবর্তন ঘটে। সাহিত্য সমাজের প্রতিচ্ছবি। আয়নায় যেমন আমরা দেখি নিজেদের, তেমনি সাহিত্যে দেখা যায় দেশকালের ছবি। আগে সাহিত্য রচিত হতাে সমাজের বড়াে বড়াে মানুষের উৎসাহে; তারা চাইতাে উৎকৃষ্ট সাহিত্য। কিন্তু ১৭৬০-এর পরে সাহিত্যের সে-মর্যাদা আর রইলাে না। কেননা আগে যারা সাহিত্যের উৎসাহদাতা ছিলাে, তারা হারিয়ে ফেলে তাদের আগের মর্যাদা। সমাজে দেখা দেয় নতুন ধনী শ্ৰেণী। এরা সাধারণত বিভিন্ন বাণিজ্যকেন্দ্রে ব্যবসা করতাে। ব্যবসা করে তারা জমিয়ে তােলে অনেক টাকা। তাদের অনেক টাকা ছিলাে, কিন্তু ছিলাে না রুচি। কিন্তু তারাও চায় আনন্দ, চায় উৎসব। সাহিত্য আনন্দ দানের একটি বড় উপায়। তাই এ-নতুন ধনীরা চায় সাহিত্য। কিন্তু উন্নত সাহিত্যের স্বাদ তারা গ্রহণ করতে পারে নি। তাদের জন্যে দরকার হয় হাক্কা, নিম্নরুচির সাহিত্য। এ-সাহিত্য সরবরাহ করেন একশ্রেণীর কবি। তাঁদের বলা হয় কবিওয়ালা’। তাদের মধ্যে যারা ছিলেন মুসলমান, তাঁদের শায়ের’ও বলা হয়। তারা কবি নন, কবিঅলা।

সতেরাে শশা ষাট থেকে আঠারাে শশা তিরিশ। সত্তর বছর সময়। এ-সময় আমাদের সাহিত্যের পতন ঘটেছিলাে। ১৭৬০-এ মারা যান মধ্যযুগের শেষ বড়াে কবি ভারতচন্দ্র রায়। ভারতচন্দ্র উৎকৃষ্ট সাহিত্য সৃষ্টি করেছিলেন, কিন্তু তাঁর রচনায়ও রয়েছে পতনের পরিচয়। রুচির অভাব রয়েছে ভারতচন্দ্রে। ভারতচন্দ্রের পরে কবিওয়ালা এবং শায়েররা সে-পতনকে পূর্ণ করেন। তাই এ-সময়ের বাংলা সাহিত্য নিয়ে গর্ব করা যায় না। এ সময়টাকে দেখা হয় একটু করুণার সাথে। এ-সময়ে যারা কবিতা রচনা করেন তাঁদের কবিও বলা হয় না, বলা হয় কবিওয়ালা বা কবিয়াল। কেননা, তাঁরা কবিদের সম্মান রক্ষা করেন নি। কবিরা হন আত্মসম্মানী, অর্থের কাছে তারা বিকিয়ে যান না। কিন্তু এ-সময়ের কবিরা অনেকটা বিকিয়ে গিয়েছিলেন, নিজেদের রুচিকে করেছিলেন খাটো। তাঁরা কবিতা লিখতেন না, রচনা করতেন মুখেমুখে, মঞ্চে দাঁড়িয়ে। কবিওয়ালারা করতেন কবিতাযুদ্ধ। একটি মঞ্চে উঠে দাঁড়াতেন দু-দল কবি। তাঁদের একদল প্রথমে অপর দলের উদ্দেশে পদ্যে কিছু বলতেন। তাদের বলা যখন শেষ হতাে তখন অন্য দলের কবিরা আগের দলের কথার জবাব দিতেন। প্রথম দলের কথাকে বলা হয় চাপান’ এবং দ্বিতীয় দলের কথাকে বলা হয় “উতাের’। কবিদের কথা কাটাকাটি বেশ জমে উঠতাে। মঞ্চে দাঁড়িয়ে অনবরত পদ্য রচনা করতেন তারা। তাঁদের কথায় রুচির বিশেষ ছোঁয়া থাকতাে না। রুচিতে বা কবিতায় তাঁদের বিশেষ লােভ ছিলাে না, তাদের লক্ষ্য ছিলাে যেমন করে তােক বিপক্ষকে হারাননা। আজো বাঙলার গ্রামে এ-কবিগান শুনতে পাওয়া যায়।

কবিগান ছিলাে অনেক রকমের। যেমন : তর্জা, পাঁচালি, খেউড়, আখড়াই, হাফআখড়াই, দাঁড়া-কবিগান, বসা-কবিগান, ঢপ, টপ্পা, কীর্তন ইত্যাদি। এ-কবিদের একটি গুণ কিন্তু স্বীকার করতেই হয়। তা হচ্ছে তাঁদের পটুত্ব; অবলীলায় তাঁরা রচনা করতেন এক-একটি পংক্তি। হয়তাে ছন্দে ভুল থাকতাে মাঝেমাঝে, শব্দও ব্যবহৃত হতাে বেঢপ রকমের, তবু তাতে কী? তারা তাে আনন্দ দিতেন। তাঁদের ব্যবহৃত শব্দগুলােও হতাে শ্রোতাদের পুলকিত করার মতাে। বাঙলা, ফারসি, ইংরেজি অনেকরকম শব্দ তারা ব্যবহার করতেন। অষ্টাদশ শতকের শেষভাগ ওই কবিগানের স্বর্ণযুগ। তবে আজো কবিগান মরে যায় নি, গ্রামাঞ্চলে তা বেঁচে আছে।

কবিগানরচয়িতাদের জীবনী সংগ্রহ করেছিলেন কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত (১৮১২-১৮৫৯]। তিনি উনিশশতকের প্রথম ভাগের একমাত্র কবি। তিনি নিজে একসময় ছিলেন কবিওয়ালাদের দলে। ঈশ্বর গুপ্তের কবিতায় কবিওয়ালাদের রচনার অনেক স্বাদ পাওয়া যায়। কবিওয়ালাদের মধ্যে যিনি সবচেয়ে প্রাচীন, তার নামটি বড়াে অদ্ভুত। তাঁর নাম গোঁজলা গুই (আনুমানিক ১৭০৪]। তিনি ছিলেন আঠারােশতকের প্রথম দিকের মানুষ। গান গাইতেন ধনীদের বাড়িতে। কবিওয়ালারা যার কাছে গান রচনা শিখতেন তাকে গুরু বলে মান্য করতেন, তাই প্রত্যেক কবির এক একজন করে গুরুর নাম পাওয়া যায়। কয়েকজন বিখ্যাত কবিওয়ালার নাম : রাম বসু, রাসু, নৃসিংহ, অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি, হরু ঠাকুর, নিধুবাবু, কেষ্টা মুচি, ভবানী, রামানন্দ নন্দী। রাসু ও নৃসিংহ ছিলেন দুভাই। ফরাসি চন্দননগরের গোদলপাড়ায় তারা জন্মগ্রহণ করেন। হরু ঠাকুর ছিলেন খুবই খ্যাতিমান। তিনি জন্মেছিলেন ১৭৪৯ সালে, আর তাঁর মৃত্যু হয় ১৮২৪ সালে। রাম বসু ছিলেন আরেকজন বিখ্যাত কবিওয়ালা। তাঁর জন্ম হয়েছিলাে ১৭৮৬ সালে, আর মৃত্যু হয় ১৮২৮ সালে। কবি অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি ছিলেন পর্তুগিজ। তিনিও হয়েছিলেন বাঙলার কবি, তবু তাঁর নামের সাথে জড়িয়ে আছে ফিরিঙ্গি শব্দটি। রাম বসু আর অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি সমসাময়িক ছিলেন, তারা একই মঞ্চে প্রতিযােগিতায় নামতেন। একটি নমুনা দিচ্ছি। রাম বসু বলছেন :

বল হে অ্যান্টনি আমি একটি কথা জানতে চাই
এসে এদেশে এবেশে তােমার গায়ে কেননা কুর্তি নাই। অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি বলছেন :
এই বাঙলায় বাঙালির বেশে আনন্দে আছি।
হয়ে ঠাকরে সিংহের বাপের জামাই কুর্তি টুপি ছেড়েছি । বেশ মজার নয়?

টপ্পার রাজা ছিলেন নিধুবাবু [১৭৪১-১৮৩০)। তাঁর পুরােনাম রামনিধি গুপ্ত। তাঁর পিতার নাম ছিলাে হরিনারায়ণ গুপ্ত। তাঁর টপ্পায় মুগ্ধ হতে শ্রোতারা। তাঁর একটি অমর গান আছে। গানটির কয়েকটি পংক্তি :

নানান দেশের নানান ভাষ্য, বিনে স্বদেশী ভাষা, পূরে কি আশা? কতাে নদী সরােবর কিবা ফল চাতকীর ধারা জল বিনে কভু মিটে কি তৃষা? এ-সময়ে মুসলমান সমাজে দেখা দিয়েছিলেন শায়েররা। তাঁরা মনােরঞ্জন করতেন গঞ্জের ব্যবসায়ীদের; শােনাতেন নানা রকমের ইসলামি কাহিনী। তারা যে-গান বেঁধেছিলেন, তাকে আজকাল বলা হয় পুথিসাহিত্য। অনেকে তাদের রচনাকে বলেন ‘মিশ্রভাষারীতির কাব্য’। তাদের কবিতা আধুনিক কালে কলকাতার শস্তা ছাপাখানা থেকে ছাপা হয়েছিলাে বলে এ-বইগুলােকে বটতলার পুথি’ও বলা হয়। এতে সব নাম, এবং নামগুলাে দেখে বােঝা যায়, এ-শ্রেণীর কাব্যকেও বিশেষ সম্মানের চোখে দেখা হয় না। এগুলাে সত্যিই উন্নতমানের সাহিত্য নয়; এখানে মানুষের শস্তা আনন্দ দেয়ার চেষ্টা আছে। এ-কবিরা অনেক বড়াে বড়াে কাহিনী শুনিয়েছেন শ্রোতাদের। সে-সব কাহিনী যেমন আজগুবি, তেমনি মােটা রসের। আসলে এগুলাে বুড়ােদের জন্যে পরীর গল্প। এ-কবিরা শুনিয়েছেন ইউসুফ-জুলেখার কাহিনী, লাইলি-মজনু, হাতেমতায়ীর কেচ্ছা, লিখেছেন জঙ্গনামা, আমিরহামজার কথা। এ-সব রচনায় সবচেয়ে লক্ষণীয় হচ্ছে কবিদের ভাষা। ভাষার ক্ষেত্রে এ-কবিরা হৈচৈ ব্যাপার ঘটিয়েছিলেন। তাঁরা কাব্য লিখেছিলেন বাঙলা ভাষায়, কিন্তু তাঁদের হাতে বাঙলা ভাষার প্রাণান্তকর অবস্থা হয়েছিলাে। তাঁরা পংক্তিকে জমজমাট করে তুলতেন আরবিফারসি শব্দে, মাঝেমাঝে ইংরেজি শব্দেও। বাঙলা শব্দ ব্যবহৃত হতাে ততােটুকু, যতােটুকু না হলেই নয়। এ-কবিতাগুলাে যখন ছাপা হয় প্রথমে, তখন সেগুলাে ছাপা হয়েছিলাে আরবিফারসির মতাে ডান দিক থেকে। সব দিকেই একবিরা এক কোলাহল পাতিয়ে তুলেছিলেন। তাঁদের ভাষার নমুনা :

কেচ্ছার পহেলা আধা শুনিয়া আলম।
আখেরি কেচ্ছার তরে করে বড় গম ॥ কিছু বােঝা গেলাে? এখানে এগারােটি শব্দ আছে, তার মাত্র চারটি বাঙলা । তবু একাব্য বাঙলা! এ-কবিরা অনেক সময় তালজ্ঞান, কাণ্ডজ্ঞান সবই হারিয়ে ফেলতেন। এক কবি লিখেছেন :
ঘােড়ায় চড়িয়া মর্দ হাঁটিয়া চলিল।
কিছু দূর যাইয়া মর্দ রওনা হইল ॥ মর্দ ঘােড়ার পিঠে চড়ে হেঁটে যায়, আর কিছুদূর যাওয়ার পর রওনা হয়। অদ্ভুত জগতের অধিবাসী কবি আর তাঁর কাব্যের মর্দ!

শায়েররা যে-সব কাহিনী লিখেছিলেন, সেগুলােকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করা যায়। একদিকে তাঁরা লিখেছেন মানুষমানুষীর মন দেয়ানেয়ার গল্প, অন্যদিকে তারা লিখেছেন ইতিহাস আর কল্পনা মিশিয়ে পরধর্মীকে পরাজিত করার কাহিনী। তাঁদের অনেক কাহিনীতে দেখা যায় হিন্দুদের দেবদেবীর সাথে মুসলমান পীরফকিরদের সংঘর্ষের চিত্র। সব মিলে এক রােমাঞ্চকর আজব বিশ্ব সৃষ্টি করেছিলেন এ-কবিবৃন্দ। তাদের কল্পনা ছিলাে শিশুসুলভ, তা ডানা মেলতাে সকল অসম্ভবের মধ্যে। সব গল্পে কথায় কথায় আসে দৈত্য-দানবপরীরা, নায়ক বা নায়িকা চল্লিশ মণ পানি খেয়ে ফেলে একবারে। | এ-শ্রেণীর সাহিত্য রচনা করে যারা খ্যাতি লাভ করেছেন, তাঁদের মধ্যে আছেন গরীবুল্লাহ, সৈয়দ হামজা, মােহাম্মদ দানেশ। তাদের মধ্যে প্রথম দুজনই এ-সাহিত্যের শ্রেষ্ঠপুরুষ। ফকির গরীবুল্লাহ ছিলেন হুগলি জেলার হাফিজপুর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি বেশ কয়েকটি কাব্য লিখেছিলেন। তাঁর কাব্যগুলাে হচ্ছে ইউসুফজুলেখা, আমির হামজা (প্রথম পর্ব), জঙ্গনামা, সােনাভান, সত্যপীরের পুথি। কবি সৈয়দ হামজা ১৭৩৩ সালে হুগলি জেলার উদনা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁরও কাব্য আছে বেশ কয়েকটি। যেমন মধুমালতী, আমির হামজা (দ্বিতীয় পর্ব ), জৈগুণের পুধি, হাতেমতাই। আরেক কবি, যার নাম জয়নাল আবেদিন, রচনা করেছিলেন আবু সামা নামে একটি কাব্য। মােহাম্মদ দানেশ রচনা করেছিলেন গুলবে-সানােয়ারা, নুরুল ইমান, চাহার দরবেশ, হাতেমতাই নামে কয়েকটি কাব্য।

কবিওয়ালা ও শায়েররা মধ্যযুগের শেষপ্রান্তে উদ্ভূত হয়েছিলেন। তারা কোনাে অসাধারণ সৃষ্টি রেখে যেতে পারেন নি পরবর্তীকালের জন্যে। এর জন্যে তাদের কোনাে দোষ নেই। দোষ যদি কিছু থাকে, তবে তা দেশের ও কালের। দেশ গিয়েছিলাে নষ্ট হয়ে, কাল গিয়েছিলাে পতিত হয়ে। নষ্ট কালে অন্ধকারাচ্ছন্ন দেশে তারা প্রদীপ জ্বালাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সে-প্রদীপ জ্বলতে চায় নি উজ্জ্বলভাবে। তাই এ-সময়ে আঁধার ছড়িয়ে পড়েছে সাহিত্যের আঙিনায়। তবু তাে কিছুটা আলাে ছিলাে; আলাে জ্বেলেছিলেন একবিরা, তাই তারা স্মরণীয়।।

অভিনব আলাের ঝলক

আসে উনিশশতক। বাঙলা ভাষা ও সাহিত্যের দিকেদিকে সাড়া পড়ে যায়। উনিশশতকে সূচনা হয় বাঙলা সাহিত্যের আধুনিক যুগের। এ-আধুনিকতা, যাকে বলেছি অভিনব আলাে, তার কিরণ পড়ে সাহিত্যের সমগ্র ভুবনে। মধ্যযুগে বাঙলা সাহিত্য ছিলাে সংকীর্ণ; সবগুলাে শাখা বিকশিত হয় নি তাতে। উনিশশতকে বিকশিত হয় তার সব শাখা, বাঙলা সাহিত্য হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ সাহিত্য। আধুনিকতা কাকে বলে? মানুষ যখন যুক্তিতে আস্থা আনে, যখন সে আবেগকে নিয়ন্ত্রিত করে, যখন সে মানুষকে মানুষ বলে মূল্য দেয়, তখন সে হয়ে ওঠে আধুনিক। আধুনিকতার আছে আরাে অনেক বৈশিষ্ট্য। মধ্যযুগেও আমরা দেখেছি মাঝেমাঝে এসব বৈশিষ্ট্য, কিন্তু তা জীবনের সকল প্রান্তকে ছোঁয় নি। উনিশশতকে এবৈশিষ্ট্যগুলাে দেখা দেয় প্রধান হয়ে। সাহিত্যের রূপও যায় বদলে। উনিশশতকের সর্বশ্রেষ্ঠ ঘটনা বাঙলা গদ্যের বিকাশ। প্রাচীন যুগে, মধ্যযুগে বাঙলা সাহিত্যে গদ্যের বিশেষ স্থান ছিলাে না। তখন যা কিছু রচিত হয়েছে সবই হয়েছে পদ্যে, ছন্দ মিলিয়ে। কিন্তু পদ্যে কি সব কথা বলা যায়?

ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ স্থাপিত হয় ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে। ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের লেখকেরা নতুন করে গড়ে তােলেন বাঙলা গদ্য। এ-গদ্য বাঙলা সাহিত্যের আধুনিকতার পথকে করেছে অনেকখানি পরিষ্কার। মধ্যযুগে হৃদয়ের আবেগ, কল্পিত কাহিনী, জীবনকাহিনী সবকিছু রচিত হয়েছে ছন্দে, পয়ারে। তাই তাতে জীবনের সবকিছু তুলে ধরা সম্ভব ছিলাে না। এর ফলে তখনকার বাঙলা সাহিত্য থেকেছে সীমাবদ্ধ। গদ্যের বিকাশের ফলে সাহিত্য লাভ করে বিস্তৃতি। সাহিত্যজগতে দেখা দেয় নানা বৈচিত্র্য। মুদ্রাযন্ত্রের অর্থাৎ ছাপাখানার প্রতিষ্ঠা সাহিত্যকে সাহায্য করে। আগে সাহিত্য সীমিত থাকতাে বিশেষ কিছু মানুষের বৃত্তে; কেননা কোনাে বইয়ের অনেকগুলাে কপি করা ছিলাে কষ্টকর। কিন্তু উনিশশতকে প্রতিষ্ঠিত হয় ছাপাখানা। লেখকেরা আর গুটিকয় শ্রোতার উদ্দেশে কবিতা বা গল্প বা প্রবন্ধ রচনা করেন নি।

আরো পড়ুন : Current Affairs June 2021 PDF | কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স জুন ২০২১ পিডিএফ

তারা সাহিত্য সৃষ্টি করতে থাকেন অসংখ্য অদৃশ্য পাঠককে লক্ষ্য করে। আগে এটি সম্ভব ছিলাে না। আগে কবিরা মনে রাখতেন না শুধু, একেবারে চোখের সামনে দেখতে পেতেন তাদের শ্রোতাদের। তারা জানতেন কোন রসে তাঁদের শ্রোতারা মােহিত হয়। কিন্তু মুদ্রাযন্ত্র লেখক ও পাঠকের মধ্যে আনে দূরত্ব, আনে বিস্তৃতি। লেখকের মনের সামনে তখন ভাসতে থাকে বিশাল পাঠকশ্রেণীর মুখ, তাই তারা হন আরাে যত্নশীল। মধ্যযুগের সাহিত্যে বৈচিত্র্যের বেশ অভাব। নবযুগে আসে বৈচিত্র্য। গদ্যসাহিত্য সৃষ্টি করেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১)। প্রথম উপন্যাস রচনা করেন প্যারীচাঁদ মিত্র (১৮১৪-১৮৮৩)। ব্যঙ্গবিদ্রুপে ভরা মজার কাহিনী লেখেন কালীপ্রসন্ন সিংহ [১৮৪০-১৮৭০]। কবিতায় নবযুগ আনেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩)। তিনি রচনা করেন মহাকাব্য।

বাঙলা সাহিত্যে মহাকাব্য ছিলাে না, কবি মধুসূদন মহাকাব্য রচনা করেন। শুধু তাই নয়, তিনি কবিতাকে করে তােলেন আধুনিক। তিনি কবিতাকে সুরের আওতা থেকে মুক্ত করে তাকে করে তােলেন পাঠ্য। কথাটিকে আরাে একটু বিশদ করে বলা যাক। মধ্যযুগে রচিত হয়েছে অনেক কবিতা। সেগুলাে কিন্তু পাঠের জন্যে লেখা হয় নি, লেখা হয়েছিলাে গান করার জন্যে। কবিরা তখন সুর করে গান করতেন তাঁদের কাব্য। মধুসূদন কবিতা লেখেন পাঠেরই জন্যে, গানের জন্যে নয়। এজন্যে তাঁর কবিতা সুরের অধীনতা থেকে মুক্ত হয়। তাছাড়া তিনি পয়ারকে দেন নতুন রূপ। সৃষ্টি করেন অমিত্রাক্ষর বা প্রবহমাণ অক্ষরবৃত্ত ছন্দ।

মধুসূদন একাই বাঙলা সাহিত্যকে পাঁচশাে বছর এগিয়ে দিয়েছিলেন। মধুসূদন লেখেন বাঙলা ভাষার প্রথম ট্রাজেডি, লেখেন প্রহসন, সনেট বা চতুর্দশপদী কবিতা। তিনি আমাদের চেতনায় সঞ্চার করে দেন আধুনিকতা। বাঙলা ভাষায় যথার্থ উপন্যাস সৃষ্টি হয় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৩৮-১৮৯৪) হাতে। তিনি তাঁর উপন্যাস, সমালােচনা, বিদ্রুপাত্মক প্রবন্ধ, এবং আরাে অনেক রকম রচনার দ্বারা বাঙলা সাহিত্যকে এগিয়ে দেন। এছাড়া উনিশশতকে রচিত হয় প্রবন্ধ, লেখা হয় বাঙলা ভাষার ব্যাকরণ, রচিত হয় আত্মজীবনী, নাটক, গল্প, সাহিত্য সমালােচনা, বিজ্ঞান, দর্শন। প্রতিষ্ঠিত হয় দৈনিক সংবাদপত্র, সাহিত্যসাময়িকী। এসব নির্ভর করে বাঙলা সাহিত্যের আধুনিক কাল প্রতিষ্ঠিত হয় উনিশশতকে। উনিশশতকে বাঙলা সাহিত্য হয়ে ওঠে অভিনব সাহিত্য। যেমন তার বিস্তার, তেমনি তার গভীরতা। মধ্যযুগে একশাে বছরে যা রচিত হয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি রচিত হয়েছে উনিশশতকের একেকটি দশকে। এক-একজন লেখক লিখেছেন আগের যুগের দশজন লেখকের সমান। কিছু সংবাদ জানিয়ে দিচ্ছি।

ফোর্ট উইলিয়ম কলেজে সৃষ্টি না হলেও বিকশিত হয় বাঙলা গদ্য। তখন ওই কলেজের প্রধান ছিলেন পাদ্রি উইলিয়ম কেরি [১৭৬১-১৮৩৪]। তাকে গদ্য রচনায় সাহায্য করেন এদেশের পণ্ডিতেরা। এক পণ্ডিত রামরাম বসুর (১৭৫৭-১৮১৩] লেখা প্রতাপাদিত্যচরিত্র এখান থেকে প্রকাশিত প্রথম বাঙলা গদ্যগ্রন্থ। বইটি ছাপা হয় ১৮০১ অব্দে। রামরাম বসু আরাে একটি বই লেখেন; তার নাম লিপিমালা। পাদ্রি কেরি লেখেন কথােপকথন নামে একটি বই। গােলকনাথ শর্মা লেখেন হিতােপদেশ, চণ্ডীচরণ মুনশি লেখেন তােতা ইতিহাস, মৃত্যঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার লেখেন রাজাবলি, হিতােপদেশ, প্রবােধচন্দ্রিকা, বত্রিশ সিংহাসন এবং আরাে কয়েকজন লেখক কয়েকটি গদ্যগ্রন্থ রচনা করেন। এগুলাে সবই প্রকাশ করে ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ কর্তৃপক্ষ। এ-বইগুলাে বাঙলা গদ্যকে অনেকটা আকার দান করে। এরপরে বাঙলা গদ্যের বিকাশে সহায়তা করেন কয়েকজন অতি বিখ্যাত বাঙালি। তাঁদের মধ্যে আছেন রামমােহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্ত, তারাশঙ্কর তর্করত্ন, ভূদেব মুখােপাধ্যায়, রাজনারায়ণ বসু। তাঁদের পরে আসেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রমেশচন্দ্র দত্ত।

রামমােহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩] লিখেছিলেন বেশ কয়েকটি বই। তাঁর বইগুলাের মধ্যে আছে বেদান্তগ্রন্থ (১৮১৫), ভট্টাচার্যের সহিত বিচার (১৮১৭), গােস্বামীর সহিত বিচার (১৮১৮), গৌড়ীয় ব্যাকরণ (১৮৩৩)। রামমােহন রায়ের লেখায় বিকাশ ঘটে বাঙালির চিন্তার । বিদ্যাসাগরের হাতে বাঙলা গদ্য লাভ করে সুষ্ঠু রূপ। বিদ্যাসাগরের বইগুলাের মধ্যে আছে বেতালপঞ্চবিংশতি (১৮৪৭), শকুন্তলা (১৮৫৪), সীতার বনবাস (১৮৬০), প্রভাবতী সম্ভাষণ (১৮৬৩), ভ্রান্তিবিলাস (১৮৬৯), অতি অল্প হইল (১৮৭৩), আবার অতি অল্প হইল (১৮৭৩), স্বরচিত জীবনচরিত (১৮৯১), এবং আরাে কয়েকটি বই। বিদ্যাসাগর বাঙলা গদ্যের স্থপতি। তারাশঙ্কর তর্করত্ন লিখেছেন কাদম্বরী (১৮৫৪), রাসেলাস (১৮৫৭)। এ-শতকে আছেন আরাে অনেকে। ধীরে ধীরে বলা হবে তাঁদের কথা।

গদ্য : নতুন সম্রাট

বাঙলা ভাষায় গদ্য উনিশশতকের শ্রেষ্ঠ উপহার। আজ চারদিকে গদ্যের জয়জয়কার, গদ্য ছাড়া আজ এক মুহূর্ত চলে না। গল্প, উপন্যাস, নাটক লেখা হচ্ছে গদ্যে; প্রবন্ধ গদ্য ছাড়া লেখাই যায় না; এমনকি কবিতাও আজকাল লেখা হচ্ছে গদ্যে, যেমন আগে প্রবন্ধ লেখা হতাে কবিতায়। আধুনিক জীবন গদ্যশাসিত; বর্তমানের প্রভু হচ্ছে গদ্য। গদ্য আগেও ছিলাে, বিকশিত হতে শুরু করে উনিশশতকের প্রথম দশকে। ব্যাপক হয়ে ওঠে পরবর্তী দশকগুলােতে। উনিশশতকের আগে গদ্য ছিলাে, তবে গদ্য লেখা হয়েছে খুবই কম। বাঙলা ভাষার উদ্যমশীল গবেষকেরা অনেক গবেষণা করে উনিশশতকের আগে যে গদ্য ছিলাে, তা প্রমাণ করেছেন। সে-গদ্য যেনাে গদ্যের জন্মের আগের অবস্থা, তাকে অচেনা

লাগে। সে-গদ্যের নমুনা রয়েছে মধ্যযুগের কিছু চম্পৃকাব্যে, আছে কিছু দলিল ও চিঠিপত্রে। চম্পুকাব্য হচ্ছে গদ্যেপদ্যে লেখা কাব্য।
মধ্যযুগের কিছু দলিলে বাঙলা গদ্যের আদিরূপ পাওয়া গেছে, এবং পাওয়া গেছে কিছুকিছু চিঠিতে। এরকম একটি চিঠি হচ্ছে কুচবিহারের মহারাজা নরনারায়ণের। তিনি এ-মূল্যবান চিঠিটি ১৫৫৫ অব্দে লিখেছিলেন অহােমরাজ স্বৰ্গদেবকে। এ-চিঠি পড়লে মনে হয় যেনাে যে-শিশু সদ্য কথা বলতে শিখছে, সে কারাে কাছে চিঠি লিখেছে। একটি দলিল পাওয়া গেছে ১৬৯৬ সালে লেখা। এছাড়া আরাে কিছু চিঠি এবং সাহিত্য নয়, এরকম গদ্য রচনা পাওয়া গেছে মধ্যযুগের। এসব রচনা দেখলে শুধু দুঃখ বাড়ে, কেননা পড়ে বুঝতে হলে ভীষণ কষ্ট করতে হয়।

বাঙলা গদ্যের বিকাশে বিদেশিদের অবদান অসামান্য। এটা স্বীকার করা ভালাে। ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের কথা বলার সময় তা বােঝা যাবে। তবে আঠারােশতকেই বিদেশিরা মন দিয়ে বাঙলা গদ্য লেখা শুরু করেছিলেন। এ-বিদেশিরা ছিলেন পর্তুগিজ। ১৭৪৩ সালে পর্তুগালের লিসবন থেকে তিনটি বাঙলা গদ্যে লেখা বই মুদ্রিত হয়। বই তিনটির দুটি রচনা করেছিলেন একজন পর্তুগিজ। বইগুলাে যদিও লেখা বাঙলা ভাষায়, কিন্তু এগুলাে ছাপা হয়েছিলাে রােমান অক্ষরে। আর ছাপাও হয়েছিলাে বাঙলাদেশ থেকে বহুদূরে অবস্থিত লিসবনে। বই তিনটির একটির লেখক দোম আনতােনিও। তিনি ছিলেন ঢাকা জেলার ভূষণা অঞ্চলের জমিদারের পুত্র। তাঁর বইয়ের নাম ব্রাহ্মণ-রােমান ক্যাথলিকসংবাদ। অপর বই দুটির লেখক পাদ্রি মনােএল দা আসসুম্পসাঁউ। পাদ্রি মনােএল-এর একটি বইয়ের নাম কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ, এবং অপর বইটির নাম বাঙলা-পর্তুগিজ অভিধান। কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ বইটি রচিত হয়েছিলাে ১৭৩৪ খ্রিস্টাব্দে, ভাওয়াল পরগণায়। তার অভিধানটিও রচিত হয়েছিলাে ভাওয়ালেই।

আরো পড়ুন :   লাল নীল দীপাবলি বা বাংলা সাহিত্যের জীবন | হুমায়ুন আজাদ [01]

এসব সত্ত্বেও বাঙলা গদ্য উনিশশতকেরই উপহার । এ-উপহার দানের গৌরব সবার আগে দাবি করতে পারে ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ। এ-কলেজে গড়ে ওঠে গদ্য। তাই বাঙলা গদ্যের ইতিহাসে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ একটি বড়াে অধ্যায়। ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮০০ খ্রিস্টাব্দের মে মাসের ৪ তারিখে। ইংরেজরা এক বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে স্থাপন করে এ-কলেজ। ইংরেজরা তখন দেশের রাজা। বিলেত থেকে এদেশে আসতাে তরুণ ইংরেজ রাজকর্মচারীরা। যােগ্যতার সাথে শাসনের জন্যে তাদের পরিচয় থাকার দরকার ছিলাে এ-দেশের ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির সাথে। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ওপর ভার পড়ে রাজকর্মচারীদের এ-দেশের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষিত করে তােলার। তাদের শিক্ষা কেন্দ্র করে এ-কলেজে বিকশিত হয় বাঙলা গদ্য। | ১৮০১ অব্দে উইলিয়ম কেরি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে যােগ দেন বাঙলা ও সংস্কৃত ভাষার অধ্যাপকরূপে। তিনি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে যােগ দিয়ে মনােযােগ দেন গদ্যের বিকাশে। তাঁর সহায়ক হন কয়েকজন পণ্ডিত। এ-পণ্ডিতদের মধ্যে আছেন রামরাম বসু, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার, এবং আরাে কয়েকজন। পণ্ডিতেরা কেরির পরিচালনায় বিকাশ ঘটাতে থাকেন গদ্যের। কেরি নিজেও বসে ছিলেন না, তিনিও গদ্যের সাধনায় নামেন। এর ফলে শুরু হয় বাঙলা সাহিত্যের নবযুগ। এখানে অবশ্য সাহিত্য সৃষ্টির প্রচেষ্টা হয় নি, সিভিলিয়ানরা যাতে সহজে এ-দেশের নানা কিছুর সাথে পরিচিত হতে পারে, বই রচনার সময় তা লক্ষ্য রাখা হয়। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে তাই রচিত হয় পাঠ্যপুস্তক। পাঠ্যপুস্তককে নির্ভর করেই বেড়ে ওঠে গদ্য। এখান থেকে যে-সব বই প্রকাশিত হতাে, সেগুলাের দাম ছিলাে কিন্তু বেশ। তাই সবাই সে-বই কিনতে পারতাে না। ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের পণ্ডিতেরা বাঙলা গদ্যকে পূর্ণ বিকশিত করতে পারেন নি, তারা শুধু ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। ১৮০১ থেকে ১৮২৬-এর মধ্যে এ-কলেজ থেকে বেরােয় অনেকগুলাে বাঙলা বই।

বাঙলা অক্ষরে মুদ্রিত বাঙালির লেখা যে-বইটি সর্বপ্রথম ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের ছাপাখানা থেকে বেরােয়, সেটির নাম প্রতাপাদিত্যচরিত্র। বইটি প্রকাশিত হয়েছিলাে ১৮০১ খ্রিস্টাব্দে। বইটি লিখেছিলেন রামরাম বসু। তিনি ভাগ্যবান ব্যক্তি। তাঁর বই সবার আগে ছাপা হয়েছিলাে, এজন্যেই তাে আমরা তাঁকে চিরকাল মনে রাখবাে। গদ্যলেখক হিশেবেও তিনি একেবারে ফেলনা নন। তিনি লিখেছিলেন আরাে একটি বই। বইটির নাম লিপিমালা। এটি বেরিয়েছিলাে ১৮০২ অব্দে। রামরাম বসুর জীবন খুব রােমাঞ্চকর। তিনি কেরিকে বাঙলা শিখিয়েছিলেন। ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের যিনি ছিলেন পরিচালক, সেই উইলিয়ম কেরিও লিখেছিলেন কয়েকটি বই। সেগুলাের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযােগ্য কথােপকথন। এটি ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের দ্বিতীয় বই প্রকাশিত হয়েছিলাে ১৮০১-এ। এ-বইটি কলকাতা ও শ্রীরামপুর এলাকার বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের বিভিন্ন বিষয়ে কথােপকথন। মানুষেরা নানা বিষয়ে কথা বলেছে এ-বইতে। তাই এ-বইটিতে সেকালের মানুষের মুখের ভাষার পরিচয় লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। কেরি এ-দেশের মানুষ ছিলেন না, কিন্তু তাঁর এ-বই পড়লে বােঝা যায় তিনি এদেশবাসীকে কেমন তীক্ষ চোখে দেখেছিলেন। এখানে নানা শ্রেণীর মানুষ কথা বলেছে; কথা বলেছে মেয়েরা, বুড়ােরা, উঁচুশ্রেণীরা, নিচুশ্রেণীরা। কেরি যেনাে তাঁর বইতে নিজে কিছু না লিখে সত্যিকার মানুষের কথাবার্তা অবিকল তুলে দিয়েছেন। কেরির কথােপকথন -এ সেকালের মেয়েরা কথা বলে এভাবে :

তােমার কয় যা। আমি সকলের বড় আমার আর তিন যা আছে। কেমন যায় যায় ভাব আছে কি কালের মতাে। আহা ঠাকুরাণী আমার যে জ্বালা আমি সকলের বড় আমাকে তাহারা অমুক বুদ্ধি করে ।
বেশ সহজ সরল নরম না কথাগুলাে? কেরির আরাে একটি বই হচ্ছে ইতিহাসমালা। বইটি বেরিয়েছিলাে ১৮১২ অব্দে। এতে আছে কয়েকটি গল্প। সহজ সরলভাবে বলা।

ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের পণ্ডিতদের মধ্যে যিনি সবচেয়ে বেশি বই লিখেছিলেন, তিনি মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার (১৭৬২-১৮১৯)। তিনি প্রতি মাসে বেতন পেতেন দুশাে টাকা। তিনি লিখেছিলেন পাঁচটি বই, তার মধ্যে চারটি প্রকাশ করেছিলাে ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ। তাঁর বইগুলাে হচ্ছে বত্রিশ সিংহাসন (১৮০২), হিতােপদেশ (১৮০৮), রাজাবলি (১৮০৮), প্রবােধচন্দ্রিকা (১৮১৩)। তার আরেকটি বই বেদান্তচন্দ্রিকা (১৮১৭)। বাঙলা গদ্যকে সামনের দিকে অনেকখানি এগিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন বিদ্যালঙ্কার। তাঁর রচনায় একজন ভালাে শিল্পীর হাতের ছোঁয়া লক্ষ্য করার মতাে। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের আরাে যারা লেখক ছিলেন, তাঁরা হচ্ছেন গােলকনাথ শৰ্মা, তারিণীচরণ মিত্র, চণ্ডীচরণ মুনশি, রাজীবলােচন মুখােপাধ্যায়, রামকিশাের তর্কালঙ্কার, হরপ্রসাদ রায়। তারিণীচরণ লিখেছিলেন এশপের কাহিনী (১৮০৩), চণ্ডীচরণ লিখেছিলেন তােতা ইতিহাস (১৮০৫), রাজীবলােচন লিখেছিলেন মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়স্য চরিত্রং (১৮০৫)। রামকিশাের লিখেছেন হিতােপদেশ (১৮০৮) এবং হরপ্রসাদ রায় লিখেছেন পুরুষপরীক্ষা (১৮১৫)। এসকল বই ব্যতীত উইলিয়ম কেরি দু-খণ্ডে সংকলন করেন বাঙলা ভাষার অভিধান। এর প্রথম খণ্ডটি বেরােয় ১৮১৫ অব্দে, এবং দ্বিতীয়টি বেরােয় ১৮২৫-এ। অসাধারণ এঅভিধান।

ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের পাঠ্যপুস্তক লেখকেরা বাঙলা গদ্যের বিকাশে পালন করেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তবে তাঁদের গদ্য পরিপূর্ণ বিকশিত নয়; পাঠ্যপুস্তকও পুরােপুরি পাঠ্যপুস্তক নয়। তাদের লেখা পড়ে বুঝতে কষ্ট হয়। এমন অনেক শব্দ আছে যা আজ আর কেউ ব্যবহার করে না। তাছাড়া এ-গদ্যে দাড়ি নেই, কমা নেই, সেমিকোলন নেই; নেই আরাে অনেক কিছু। পণ্ডিতেরা ছিলেন সংস্কৃত ভাষায় সুপণ্ডিত, তাই তাঁরা অনেক জায়গায় ব্যবহার করেছেন কঠিন কঠিন সংস্কৃত শব্দ। তবে এ-গদ্যের আলােতেই পথ দেখেছেন পরবর্তী গদ্যলেখকেরা। এরপরে এসেছেন অনেক বড়াে বড়াে গদ্যশিল্পী। যেমন, রামমােহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তারা বাঙলা গদ্যকে ভেঙেছেন, নতুন করে গড়েছেন।

ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের পর বাঙলা গদ্য লাভ করেছে বিভিন্ন পত্রপত্রিকার লালনপালন। পত্রপত্রিকা গদ্যের প্রবাহকে অনেকখানি নিয়ন্ত্রণ করে। উনিশশতকের দ্বিতীয় দশকে প্রকাশিত হয়েছিলাে সাময়িকপত্র, বাঙলা গদ্য এসকল পত্রপত্রিকা আশ্রয় করে বেড়ে ওঠে। পত্রপত্রিকাগুলােতে থাকতাে নানা জ্ঞানের কথা, নানা রসের কথা, থাকতাে নানা বাদপ্রতিবাদ। এর ফলে গদ্যের সীমাও যায় বেড়ে। ফোর্ট উইলিয়ম কলেজে গদ্যের পরিধি ছিলাে সীমিত, কেননা সেখানে রচিত হয়েছে শুধু পাঠ্যবই। জীবনের সকল দিকের প্রতি তাদের লক্ষ্য ছিলাে না। পত্রপত্রিকার লক্ষ্য জীবনের সবদিকে। তাই গদ্য বিস্তার লাভ করে।

বাঙলা ভাষায় প্রথম পত্রিকা প্রকাশ করেন শ্রীরামপুরের মিশনারিরা। ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে। পত্রিকাটির নাম দিকদর্শন। এ-পত্রিকায় বাংলা গদ্য বেশ সহজ সরলভাবে ব্যবহৃত হয়। শ্রীরামপুর মিশন থেকে ১৮১৮-তে বেরােয় আরাে একটি পত্রিকা। নাম সমাচার দর্পণ। এটি ছিলাে সাপ্তাহিক পত্র। এর সম্পাদক ছিলেন জে সি মার্শম্যান। এপত্রিকায় চাকুরি করতেন পণ্ডিত জয়গােপাল তর্কালঙ্কার, পণ্ডিত তারিণীচরণ শিরােমণি। | বাঙালিদের প্রচেষ্টায় যে-পত্রিকাটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয়েছিলাে তার নাম বাঙ্গালা গেজেটি। এটি ছিলাে সাপ্তাহিক পত্রিকা; প্রথম প্রকাশিত হয়েছিলাে ১৮১৮ সালের মে মাসের ১৪ তারিখে। পত্রিকাটি বেশিদিন বাঁচে নি। সব পত্রিকার মধ্যে সমাচার দর্পণ-এর অবদান উল্লেখযােগ্য। এ-পত্রিকাটিতে সাহিত্য-ভাষা-রাজনীতি-ইতিহাস নানাবিধ বিষয় ঠাঁই পেতাে। এ-পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয়েছিলাে উনিশশতকের প্রথম দিকের বিখ্যাত নকশা “বাবু উপাখ্যান”।
১৮২১ খ্রিস্টাব্দে রামমােহন রায় শিবপ্রসাদ রায় ছদ্মনামে প্রকাশ করেন ব্রাহ্মণ-সেবধি নামে একটি মাসিক পত্রিকা। রামমােহন ভালাে গদ্যলেখক ছিলেন; এ-পত্রিকাটিতে তাই মােটামুটি ভালাে গদ্য স্থান পেতাে। ১৮২১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আরাে একটি পত্রিকা। নাম সম্পাদকৌমুদী। পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। পত্রিকাটি বের হতাে প্রতি মঙ্গলবারে। ভবানীচরণ ছিলেন একজন ভালাে লেখক। তিনি লিখেছিলেন একটি নামকরা বই–কলিকাতা কমলালয়। পরে ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় বের করেছিলেন আরেকটি পত্রিকা, সমাচারচন্দ্রিকা নামে। এ-পত্রিকার প্রধান কাজ ছিলাে সতীদাহপ্রথা নিবারণের বিরুদ্ধে লেখা। ভবানীচরণ রক্ষণশীল ছিলেন; তিনি বিরােধিতা করেছিলেন সেকালের অনেক প্রগতিশীল আন্দোলনের। তবে তিনি রচনা করেছিলেন কয়েকটি বই। সেগুলাে হচ্ছে কলিকাতা কমলালয়, নববাবুবিলাস, নববিবিবিলাস।

কিন্তু সব পত্রপত্রিকাকে ছাপিয়ে উঠেছিলাে একটি পত্রিকা, সেটির নাম সম্বাদপ্রভাকর। এটির সম্পাদক ছিলেন কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত। পত্রিকাটি সাপ্তাহিকরূপে প্রথম আত্মপ্রকাশ করে ১৮৩১ সালের ২৮ জানুয়ারিতে। ১৮৩৯ সালে এটি পরিণত হয় দৈনিক পত্রিকায়। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত ছিলেন নামকরা কবি, তাঁর গদ্যও বেশ ভালাে। তিনি উনিশশতকের অন্তত দুজন মহৎ লেখককে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। একজন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, অপরজন নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্র। এ-পত্রিকায় ঈশ্বরচন্দ্র বাঙলার সাহিত্যসংস্কৃতিকে বিকশিত করতে চেয়েছিলেন। তাই এতে নিয়মিত প্রকাশিত হতাে গদ্য-পদ্য এবং বিভিন্ন শ্রেণীর রচনা। ঈশ্বরগুপ্ত প্রভাকর-এর পাতাতেই প্রকাশ করেন প্রাচীন কবিদের জীবনী, প্রকাশ করেন কবি ভারতচন্দ্রের জীবনী ও সাহিত্যের পরিচয়। এভাবে জীবনের সকল দিক উন্মােচিত হওয়ার সাথে বিকশিত হয়েছিলাে বাঙলা গদ্য। ১৮৮১ সালে বের হয় জ্ঞানান্বেষণ নামে একটি পত্রিকা। এ-সকল পত্রপত্রিকা আশ্রয় করে বাঙলা গদ্য অনেকখানি সবলতা লাভ করে। সবলতা আসে সবদিকে। ভাষা ব্যবহারােপযােগী হয়ে ওঠে জীবনের সর্বক্ষেত্রে। গদ্যের প্রয়ােজন তাে সর্বত্র। তাই তার রূপও হওয়া দরকার বিচিত্র। গদ্য যখন ব্যবহৃত হয় প্রবন্ধে তখন তার রূপ এক, যখন গদ্য ব্যবহৃত হয় উপন্যাসে তখন তার রূপ আরেক। যখন গদ্য হালকা রচনায় ব্যবহৃত হয় তখন তা থাকে এক রকম, যখন তা ব্যবহৃত হয় গুরু রচনায়, তখন তা হয় অন্যরকম। সাময়িকপত্রের পৃষ্ঠায় গদ্যে আসে এ-বৈচিত্র্য। তবে বাঙলা গদ্যকে সাবলীল করে তােলেন মহৎ গদ্যশিল্পীরা।

গদ্যের জনক ও প্রধান পুরুষেরা

বিভিন্ন লেখকের হাতের স্পর্শে বাঙলা গদ্য ধীরেধীরে ধারণ করেছিলাে নিজের প্রকৃত রূপ। কেউ রচনা করেছিলেন পাঠ্যবই লেখার উপযােগী গদ্য, কেউ গদ্যকে করে তুলেছিলেন যুক্তিতর্কের উপযােগী। কারাে হাতে গদ্য হয়ে উঠেছিলাে গল্পের উপযােগী, কারাে হাতে হয়ে উঠেছিলাে সমালােচনা সাহিত্যের উপযােগী। কিন্তু উনিশশতকের প্রথম দু-তিন দশক ধরে চলে গদ্যের বিকাশ ও সুস্থিতির কাজ। এমন কোনাে বড়াে গদ্যশিল্পী তখন দেখা দেন নি, যাঁর গদ্যকে বলা যেতে পারে নিটোল গদ্য। উনিশশতকের দ্বিতীয় দশকে আবির্ভূত হন রামমােহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩)। তিনি ছিলেন কৃতী পুরুষ, নতুন কালের মহাপুরুষ। বাঙলা গদ্যে তাঁর দানও উল্লেখযােগ্য। রামমােহন সবার আগে গদ্যকে পাঠ্যবইয়ের বৃত্ত থেকে বিস্তৃততর এলাকায় নিয়ে যান। রামমােহন ছিলেন সংস্কারক। তাই তাঁকে তর্কবিতর্কে নামতে হয়েছে তাঁর প্রতিপক্ষের সাথে। তিনি বিরােধীপক্ষকে আঘাত করেছেন নানা রচনায়, আর এ-আঘাতে দল মেলেছে গদ্য। রামমােহন রচনা করেছিলেন বেশ কয়েকটি বাঙলা বই। সেগুলাে হচ্ছে বেদান্ত গ্রন্থ (১৮১৫), বেদান্তসার (১৮১৫), ভট্টাচার্যের সহিত বিচার (১৮১৭), গােস্বামীর সহিত বিচার (১৮১৮), প্রবর্তক ও নিবর্তকের সম্বাদ (১৮১৮), পথ্যপ্রদান (১৮২৩), গৌড়ীয় ব্যাকরণ (১৮৩৩)। এছাড়া তিনি সম্পাদনা করেছিলেন দুটি পত্রিকা, ব্রাহ্মণসেবধি ও সম্বাদকৌমুদী। এসকল রচনা ভিত্তি করে গড়ে ওঠে ব্যক্তিত্বমণ্ডিত গদ্য। রামমােহনের গদ্য পাঠের সময় এক প্রবল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষের লেখা পাঠ করছি, একথা সব সময় মনে হয়। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত তাঁর গদ্য সম্বন্ধে লিখেছিলেন যে তিনি জলের মতাে সহজ গদ্য লেখেন। তবে তাঁর গদ্য বিশেষ সরস নয়। আসলে রামমােহনের গদ্য ঠিক জলের মতাে ছিলাে না, এ-গদ্য অনেকটা জটিল, বাক্যগুলাে বড়াে বড়াে, এলানােছড়ানােনা। অনেক সময় তাঁর ভাষা কর্কশ। দাড়ি-কমা-সেমিকোলনেরও অভাব আছে। তবু রামমােহন রায় বাঙলা গদ্যের এক প্রধান ব্যক্তি।

যার হাতের ছোঁয়ায় বাঙলা গদ্য রূপময় হয়ে ওঠে, তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১)। তাকে বলা হয় বাঙলা গদ্যের জনক। বিদ্যাসাগর সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালিদের একজন। তিনি বিদ্যাসাগর, দয়ার সাগর, একথা সবাই জানি। এসব কথা যদি স্মৃতিহীন বাঙালি কখনাে ভুলেও যায়, তবু তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন তার অনুপম গদ্য রচনার জন্যে। তাঁর গদ্য রচনাকে কেউ ভুলতে পারবে না। আজ আমরা যে-গদ্য রচনা করি, তার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন বিদ্যাসাগর। তাঁর সে-ভিত্তির ওপর কতত রঙবেরঙের প্রাসাদ উঠেছে এবং আরাে কতাে উঠবে, তবু তিনি থাকবেন সবার মূলে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৮২০ অব্দে, মেদেনিপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে। তাঁর পিতার নাম ঠাকুর দাস, মাতার নাম ভগবতী দেবী। বাল্যকালে তিনি দুই চঞ্চল ছিলেন, ছিলেন বড়াে একরােখা। পরবর্তী জীবনে তিনি হন নির্ভীক, এবং ভীষণভাবে একরােখা। তার সম্বন্ধে গল্প আছে, বাল্যকালে তাকে যা বলা হতাে তিনি করতেন তার উল্টোটি। যদি মা বলতেন পড়াে, তাহলে তিনি পড়া বন্ধ করতেন। তাই তার মা শীতকালে বালক ঈশ্বরচন্দ্রকে বলতেন কিছুতেই স্নান কোরাে না, আর অমনি বালক ঈশ্বর লাফিয়ে পড়তেন জলে। এ-বালক পরে হয়ে উঠেছিলেন বাঙলার মহত্তম ব্যক্তি।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাঙলা গদ্যের অস্থির রূপটিকে স্থির করে দিয়ে গেছেন। তিনি রচনা করেছেন নানা রকমের বই। লিখেছেন পাঠ্যবই, করেছেন অনুবাদ। রচনা করেছেন নিজের জীবনী, শুনিয়েছেন প্রাচীন কাহিনী, লিখেছেন শােকগাথা, বিদ্রুপভরা রচনা। তার সব রচনাই নানা দিক দিয়ে অমূল্য। বিদ্যাসাগরই সবার আগে আবিষ্কার করেন বাঙলা গদ্যের ছন্দ। কবিতার যেমন ছন্দ থাকে, তেমনি থাকে গদ্যেরও ছন্দ। এ-কথাটি আমাদের প্রথম দিকের গদ্যশিল্পীরা বুঝতে পারেন নি, তাই তাঁদের গদ্য প্রাণহীন। গদ্য রচনার ভেতরে গােপনে লুকিয়ে থাকে ছন্দ। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এটি বুঝেছিলেন। তিনি সবার আগে নিয়মিতভাবে ঠিক জায়গাটিতে ব্যবহার করেন দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলন ইত্যাদি চিহ্নগুলাে। তাঁর আগের বাঙলা গদ্যে যতিচিহ্ন ছিলাে না, থাকলেও তা যথাস্থানে নিয়মিতভাবে ছিল না। বিদ্যাসাগর এগুলােকে গদ্যের ছন্দ রক্ষার জন্যে নিয়মিতভাবে ব্যবহার করেন। তাই তাঁর গদ্যরচনা পাঠ করার সময় ঘনঘনভাবে কমার ব্যবহার দেখতে পাই। তিনি কমা ব্যবহার করেছেন খুব বেশি, কেননা তিনি অনভ্যস্ত পাঠকদের চোখের সামনে গদ্যের ছন্দ তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। বিদ্যাসাগরের গদ্য সম্বন্ধে খুব ভালাে কথা বলেছেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি বলেছেন, বিদ্যাসাগর সবার আগে বাঙলা গদ্যকে মুক্তি দেন সংস্কৃত দীর্ঘ সমাসের কবল থেকে, এবং আবিষ্কার করেন বাঙলা শব্দের সঙ্গীত । তিনি বাঙলা গদ্যকে গ্রাম্য পাণ্ডিত্য ও গ্রাম্য বর্বরতা থেকে মুক্ত করে স্ত্রসভার উপযােগী করে তােলেন।

বিদ্যাসাগর গদ্যের ছন্দ আবিষ্কার করেছিলেন বলে তাঁর লেখা পড়ার সময় মধুর সঙ্গীত ধ্বনিত হয়। তাঁর ব্যবহৃত শব্দগুলাে ধ্বনিময়, গুঞ্জনময়। এজন্যে পরবর্তী কালে অনেক লেখক অনুসরণ করেছেন বিদ্যাসাগরের গদ্যরীতি। সে-গদ্য সুর ছড়ায়, ছবি আঁকে, কল্পনার জগতে নিয়ে যায়। আবার তিনি যখন হাল্কা বিষয়ে কিছু রচনা করেছেন, তখন তা সরসতায় হয়ে উঠেছে মধুর। বিদ্যাসাগরের সঙ্গীতময় রচনার কিছু অংশ শােনাচ্ছি :
এই সেই জনস্থান মধ্যবর্তী প্রস্রবণগিরি। এই গিরির শিখরদেশ, আকাশপথে সততসঞ্চরমাণ জলধরমণ্ডলীর যােগে, নিরন্তর নিবিড় নীলিমায় অলঙ্কত, অধিত্যকা প্রদেশ ঘনসন্নিবিষ্ট বিবিধ বনপাদপ সমূহে আচ্ছন্ন থাকাতে, সতত স্নিগ্ধ, শীতল ও রমণীয়; পাদদেশে প্রসন্নলিলা গােদাবরী, তরঙ্গ বিস্তার করিয়া, প্রবল বেগে গমন করিতেছে।

এ-অংশটুকু নেয়া হয়েছে বিদ্যাসাগরের সীতার বনবাস থেকে। উচ্চারণ করে পড়লে সঙ্গীতের মতাে শােনাবে। বিদ্যাসাগরের অধিকাংশ বইই অনুবাদ। কিছু মৌলিক বইও তিনি লিখেছেন। তাঁর প্রথম বই বেতালপঞ্চবিংশতি বের হয়েছিলাে ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে। এটি হিন্দি থেকে অনুবাদ। তার দ্বিতীয় বইয়ের নাম বাঙ্গলার ইতিহাস (১৮৪৯)। এটি তিনি রচনা করেছিলেন মার্শম্যানের বই অবলম্বনে। বিদ্যাসাগরের তৃতীয় বইটিও একটি ইংরেজি বই অবলম্বনে লেখা, বইটি হচ্ছে জীবনচরিত (১৮৪৯)। এগুলাে ছিলাে পাঠ্যবই। তিনি আরাে কয়েকটি অনুপম পাঠ্যবই লিখেছেন। তার মধ্যে রয়েছে বর্ণ-পরিচয় (১৮৫৪), কথামালা (১৮৫৬)। বর্ণ-পরিচয় বইটিতে আছে একটি ছন্দময় চরণ; – ‘জল পড়ে। পাতা নড়ে।’ রবীন্দ্রনাথ তাঁর বাল্যকালে এ-চরণটি পাঠ করে অভিভূত হয়েছিলেন। বালক কবির মনে হয়েছিলাে তখন যেনাে তাঁর সকল চেতনায় জল পড়তে এবং পাতা নড়তে লাগলাে। এরকম আরাে দুটি বই বােধােদয় (১৮৫১), আখ্যানমঞ্জরী (১৮৬৩-৬৮)। আখ্যানমঞ্জরীতে গল্প বলা হয়েছে সরসভাবে, এর সরসতার তলে লুকিয়ে আছে নীতিকথা।

বিদ্যাসাগর অনুবাদ করেছিলেন বিশ্বসাহিত্যের কয়েকটি অনন্য বই। এসব বই মূল থেকে অনুবাদ করা সহজ কথা নয়। বিদ্যাসাগর অনুবাদ করেছিলেন কালিদাসের বিখ্যাত বই শকুন্তলা (১৮৫৪), বাল্মীকি ও ভবভূতির কাহিনী চয়ন করে লিখেছিলেন সীতার বনবাস (১৮৬০)। তিনি শেক্সপিয়রের কমেডি অফ অ্যাররস বাঙলায় রূপান্তরিত করেছিলেন ভ্রান্তিবিলাস (১৮৬৯) নামে। এই বইগুলােকে শুধু অনুবাদ বললে ঠিক বলা হয়। তিনি নিজের কালের মতাে করে রচনা করেছিলেন এসব কাহিনী। এগুলাে বই থেকে জন্ম নেয়া নতুন বই।

বিদ্যাসাগরের মৌলিক রচনা হচ্ছে বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব (১৮৫৫), বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক বিচার (১৮৫৫), অতি অল্প হইল (১৮৭৩), আবার অতি অল্প হইল (১৮৭৩), ব্রজবিলাস (১৮৮৫), প্রভাবতী সম্ভাষণ (১৮৯২), স্বরচিত জীবনচরিত (১৮৯১)। মৌলিক রচনায় বিদ্যাসাগরকে পাওয়া যায় জীবন্তভাবে; তার নিশ্বাসের প্রবাহ যেনাে বােধ করা যায় এগুলােতে। প্রথম পাঁচটি বই তিনি রচনা করেন তাঁর প্রতিপক্ষের লােকদের আক্রমণ করে। বিদ্যাসাগর জড়িত ছিলেন নানা সংস্কার আন্দোলনে। তিনি বিধবাদের বিবাহ আইনসঙ্গত করার চেষ্টা করেছিলেন, এবং রহিত করতে চেয়েছিলেন বহুবিবাহ। তাই তাঁর জুটেছিলাে অনেক বিরােধী। এদের সাথে তাকে নামতে হয়েছিলাে নানা তর্কে; বিদ্যাসাগরের এ-পাঁচটি বই তাই তর্কযুদ্ধ। তার যুক্তিগুলাে শাণিত, বিদ্রুপ। বিদ্যাসাগরের বিদ্রুপ ছিলাে রুচিশীল, তাতে বুদ্ধির ধার ছিলাে তীক্ষ। তিনি এগুলাে রচনা করেছিলেন ছদ্মনামে। তিনি অতি অল্প হইল এবং আবার অতি অল্প হইল রচনা করেছিলেন কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপােস্য’ নামে।

প্রভাবতীসম্ভাষণ এবং স্বরচিত জীবনচরিত তাঁর মৌলিক রচনা। এখানে জীবনের শান্ত গম্ভীর দিকটি প্রকাশিত হয়েছে। প্রভাবতীসম্ভাষণ একটি শােকগাথা। ছােটো রচনা। এরচনায় বিদ্যাসাগরের হৃদয়টি অনাবৃত হয়ে দেখা দিয়েছে। বিদ্যাসাগর সারাজীবন মানুষকে ভালােবেসেছেন, কিন্তু শেষ জীবনে তিনি মানুষের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলেন। তিনি জীবনের প্রথম থেকে ছিলেন নাস্তিক; কিন্তু বিশ্বাস করতেন মানুষকে। শেষ জীবনে সেই মানুষের ওপরও তার বিশ্বাস ছিলাে না। বাঙলায় মানুষের ওপর বিশ্বাস রাখা ভীষণ কঠিন! তিনি সঙ্গীহীন হয়ে পড়েছিলেন। তখন তার প্রিয় হয়ে উঠেছিলাে রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রভাবতী নামে আড়াই বছরের একটি শিশুকন্যা। বিদ্যাসাগর এ-শিশুকেই করে নিয়েছিলেন নিজের বন্ধু। কিন্তু প্রভাবতীর মৃত্যু হয় শিশুকালেই। বিদ্যাসাগর শােকে ভেঙে পড়েন। প্রভাবতীকে স্মরণ করে তিনি রচনা করেন বাঙলা ভাষার এক অসাধারণ অকাতর রচনা প্রভাবতী সম্ভাষণ। সে-করুণ রচনা থেকে বিদ্যাসাগরের বেদনার একটুখানি তুলে আনি :

বসে! তােমায় আর অধিক বিরক্ত করিব না, একমাত্র বাসনা ব্যক্ত করিয়া বিরত হই যদি তুমি পুনরায় নরলােকে আবির্ভূত হও, দোহাই ধর্মের এটি করিও, যাহারা তােমার স্নেহপাশে আবদ্ধ হইবেন, যেন তাহাদিগকে, আমাদের মত, অবিরত, দুঃসহ শােকদহনে দগ্ধ হইয়া, যাবজ্জীবন যাতনাভােগ করিতে না হয়। স্বরচিত জীবনচরিত তার আত্মজীবনী। এটি তিনি শেষ করে যান নি। এটিও অমূল্য গ্রন্থ।বিদ্যাসাগরের সমকালে এবং একটু পরে যাঁরা উৎকৃষ্ট গদ্য লিখেছিলেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন প্যারীচাঁদ মিত্র (১৮১৪-১৮৮৩), দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮১৭-১৯০৫), অক্ষয়কুমার দত্ত (১৮২০-১৮৮৬], রাজেন্দ্রলাল মিত্র (১৮২২-১৮৯১), বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮১৮৯৪), এবং আরাে অনেকে। এর আরাে পরে আসেন আধুনিক কালে রবীন্দ্রনাথ ও প্রমথ চৌধুরী।

আরো পড়ুন :   লাল নীল দীপাবলি বা বাংলা সাহিত্যের জীবন | হুমায়ুন আজাদ [02]

অক্ষয়কুমার দত্ত লিখেছিলেন বেশ কয়েকটি বই। বিজ্ঞানের প্রতি তার ছিলাে গভীর অনুরাগ, ত্যাগ করেছিলেন আস্তিকতা। তিনি ধর্মের নিষ্ফলতা দেখিয়ে লিখেছিলেন একটি বিখ্যাত সমীকরণ। অক্ষয়কুমারের সমীকরণটি হচ্ছে : শ্রম + প্রার্থনা = শস্য, শ্রম = শস্য, সুতরাং প্রার্থনা = ০। শ্রম ছাড়া ধর্মকর্মের ফল শূন্য। সারাদিন ধর্মকর্মেও একটি ধান জন্মাননা অসম্ভব। তাঁর গদ্যও ভালাে। তাঁর খুব নামকরা বই বাহ্যবস্তুর সহিত মানবপ্রকৃতির সম্বন্ধবিচার। বইটি একটি অনুবাদ বই, এর প্রথমাংশ বের হয় ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে; দ্বিতীয়াংশ বের হয় ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে। অক্ষয়কুমার ছিলেন সে-সময়ের বিখ্যাত তত্ত্ববােধিনী পত্রিকার সম্পাদক। তাঁর রচিত পাঠ্যপুস্তকের মাঝে সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়েছিলাে চারুপাঠ। বইটি তিন খণ্ডে বিভক্ত, বের হয়েছিলাে ১৮৫২, ১৮৫৪ এবং ১৮৫৯ সালে। এটি ছিলাে সেকালের একটি অবশ্যপাঠ্য পাঠ্যবই। অক্ষয়কুমারের অন্য দুটি বই ধর্মনীতি (১৮৫৬), ভারতবর্ষীয় উপাসকসম্প্রদায় (১৮৭০)। অক্ষয়কুমার বাঙলা গদ্যকে জ্ঞানচর্চার উপযােগী করে তুলেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন একজন উৎকৃষ্ট কাব্যময় গদ্যলেখক। তিনি ছিলেন ব্রাহ্মধর্মের প্রতিষ্ঠাতা, তত্ত্ববােধিনী সভা ও তত্ত্ববােধিনী পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর বইগুলাের মধ্যে রয়েছে আত্মতত্ত্ববিদ্যা (১৮৫২), ব্রাহ্মসমাজের বক্তৃতা (১৮৬২), স্বরচিত জীবনচরিত (১৮৯৪)। তাঁর জীবনচরিত মহৎ বই।
রাজেন্দ্রলাল মিত্র ছিলেন বিখ্যাত পত্রিকা বিবিধার্থ সহ-এর (১৮৫১) সম্পাদক। তিনি এ-পত্রিকায় জ্ঞানবিজ্ঞানচর্চা ও সাহিত্যসমালােচনার এক গৌরবজনক অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন। তাঁর বইগুলাের মধ্যে আছে প্রাকৃত ভূগােল (১৮৫৪), শিল্পিক দর্শন (১৮৬০), পত্রকৌমুদী (১৮৬৩)। এ-সময়ের দুজন বিখ্যাত গদ্যলেখক রাজনারায়ণ বসু (১৮২৬ -১৮৯৯), ও ভূদেব মুখােপাধ্যায় (১৮২৭-১৮৯৪]। রাজনারায়ণ বসুর বিখ্যাত গ্রন্থ সেকাল আর একাল (১৮৭৪), বাঙ্গালা ভাষা ও সাহিত্যবিষয়ক বক্তৃতা (১৮৭৮)। ভূদেব মুখােপাধ্যায়ের বিখ্যাত গ্রন্থ পারিবারিক প্রবন্ধ (১৮৮২), সামাজিক প্রবন্ধ (১৮৯২)।

বাঙলা গদ্যের ভূবনে এক তুমুল বিদ্রোহ ঘােষণা করেছিলেন প্যারীচাঁদ মিত্র। তার ছদ্মনাম ছিলাে টেকচাঁদ ঠাকুর। তিনি হৈচৈ বাধিয়েছিলেন বেশ। এতােদিন আমরা যে-গদ্য দেখেছি, তা হচ্ছে সাধু গদ্য। তাতে সংস্কৃত শব্দের প্রাধান্য লক্ষ্য করার মতাে। প্যারীচাঁদ ১৮৫৪ সালে তাঁর এক বন্ধুর সাথে প্রতিষ্ঠা করেন একটি পত্রিকা; নাম মাসিক পত্রিকা। তিনি ঘােষণা করেন সাধু গদ্য চলবে না, চলবে না সংস্কৃত শব্দ। বাঙলা ভাষাকে করতে হবে সত্যিকারে বাঙলা ভাষা। তিনি সাহিত্য রচনা করতে শুরু করেন কথ্যরীতিতে, সাধুরীতিতে নয়। যে-ভাষায় আমরা কথা বলি, প্যারীচাদ সে-ভাষা ব্যবহার করতে চান সাহিত্যে। এ-ভাষা হবে মুখের ভাষার অনুরূপ। দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন তিনি নিজেই। লেখেন একটি উপন্যাস, প্রকাশ করতে থাকেন সাহিত্য পত্রিকায়। তাঁর এ-বইটির নাম আলালের ঘরের দুলাল (১৮৫৮)। প্যারীচাঁদ মিত্র বাঙলা গদ্যের রূপ বদলাতে চেয়েছিলেন। সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন নতুন গদ্য। আজকাল আমরা যে-চলতি গদ্য লিখি, তাই চেয়েছিলেন প্যারীচাঁদ। তাই তাঁর লেখায়, আলালের ঘরের দুলাল-এ তিনি ব্যবহার করেন চলতি ক্রিয়াপদ, ব্যবহার করেন বেশি পরিমাণে খাঁটি বাঙলা শব্দ। তিনি ভাষাকে চলতি ভাষা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি পুরােপুরি সফল হন নি। তাঁর গদ্য না চলতি, না সাধু। সাধু-চলতি-আঞ্চলিক সব রকমের ভাষা মিশিয়ে এক নতুন গদ্য তৈরি করেন তিনি। এভাষারীতি তিনি কাজে লাগিয়েছেন মাত্র আলালের ঘরের দুলাল-এ। তিনি রচনা করেছিলেন আরাে অনেক বই, সেগুলাে সবই বিদ্যাসাগরের মতাে সাধু গদ্যে রচিত। তাঁর আলালের ঘরের দুলাল বই আকারে প্রথম বের হয় ১৮৫৮ অব্দে। তাঁর অন্যান্য বই হচ্ছে মদ খাওয়ার বড় দায় জাত থাকার কি উপায় (১৮৫৯), রামারঞ্জিকা (১৮৬০), যৎকিঞ্চিৎ (১৮৬৫), ডেবিড হেয়ারের জীবনচরিত (১৮৭৮), বামাতােষিণী (১৮৮১)। প্যারীচাঁদের বিদ্রোহের পথ ধরে বাঙলা গদ্যের জগতে আসেন আরেক বিপ্লবী কালীপ্রসন্ন সিংহ ১৮৪০-১৮৭০l। তিনি চলতি গদ্যে লেখেন একটি অনন্য বই, যার নাম হুতােম প্যাচার নকশা (১৮৬২)। তাঁর এ-বইটি আলােড়ন জাগিয়েছিলাে নানা কারণে, এর একটি বড়াে কারণ এর চলতি গদ্য। তারা দুজন বাঙলা ভাষায় চলতি গদ্যের অগ্রপথিক।

এরপর আসেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তিনি প্রথম যথার্থ ঔপন্যাসিক আমাদের সাহিত্যের এবং শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিকের একজন। তিনি বাঙলা গদ্যকে বিভিন্ন ভাবে বিকশিত করেছিলেন। ১৮০১ থেকে ১৮৬০ পর্যন্ত সকল গদ্য লেখকদের সাধনা যেনাে চরম সফলতা হয়ে দেখা দেয় তার মধ্যে। তাঁর সম্বন্ধে বেশি বলবাে না। একটি পুরাে বই তাে লেখা দরকার তাঁকে নিয়ে। বঙ্কিম বাঙালির সৃষ্টিশীলতা ও মনীষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রকাশ গদ্য বিকশিত হয়, অভাবিত সৃষ্টিশীল হয় বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস ও প্রবন্ধে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সে-গদ্যকে উচ্ছ্বসিত করে তােলেন গল্পে, উপন্যাসে, প্রবন্ধে, চিঠিপত্রে। রবীন্দ্রপ্রসঙ্গেও বেশি বলার দরকার নেই। তবে একটু বলা দরকার আরেকজন সম্বন্ধে; তাঁর নাম প্রমথ চৌধুরী [১৮৬৮-১৯৪৬] । আমরা আজ যে সব কাজে চলতি গদ্য ব্যবহার করি, তা প্রমথ চৌধুরীরই জন্যে। তিনি সাহিত্যে এসেছিলেন চলতি গদ্যরীতিকে প্রতিষ্ঠা করার জন্যেই। তাতে তিনি সার্থক হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথও অনেকদিন চলতি গদ্য লেখেন নি, শেষ জীবনে লেখা শুরু করেন। এর মূলে আছেন প্রমথ চৌধুরী।

কবিতা : অন্তর হতে আহরি বচন

উনিশশতকের প্রথমার্ধ ভরে চলে গদ্যের রাজত্ব; সবদিকে কেবল গদ্যের পতাকা উড়তে থাকে। সে-সময়ে গদ্যই সম্রাট। যেদিকে তাকাই গদ্য আর গদ্য; গদ্যের মহাসমুদ্রে অবিরাম ঢেউ উঠছে আর ভেঙে পড়ছে। এ-সময়ে চলছিলাে কবিতার আকাল। কোনাে ফসলই ফলছিলাে না কবিতার। বাঙলাদেশে এমনটি আর দেখা যায় নি। যদি কবিতাই না থাকে, তবে থাকলে কী বাঙলা সাহিত্যের! বাঙলা সাহিত্যের দেবী চিরকাল কাব্যজীবী, কবিতার স্বাদ ছাড়া সে বাঁচতেই পারে না। কিন্তু উনিশশতকের প্রথমার্ধে সে-দেবীই হয়ে ওঠে গদ্যমুখর, যা বলে সব বলে গদ্যে। তার কণ্ঠে সুর নেই, গান নেই, ছন্দ নেই। ওই সময়টা কর্মীদের কাল। দশকেদশকে জন্ম নিচ্ছিলেন কর্মীরা; আর গদ্য ছিলাে তাদের কর্মের হাতিয়ার। তখনাে বাঙলার স্বাপ্লিকেরা জন্ম নেন নি। ওটা স্বপ্নের সময় ছিলাে না। ওই স্বপ্নহীন সময়ের একমাত্র কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত (১৮২২-১৮৫৯]। তার চোখেও স্বপ্ন ছিলাে না; ছিলাে বাস্তব জগৎ, আর বাস্তবের সংবাদ। তিনি ছিলেন “সম্বাদ প্রভাকর”-এর বিখ্যাত সম্পাদক। তিনি ছিলেন পুরােনাে রীতির কবি । যাকে বলে আধুনিকতা, তা তাঁর কবিতায় ফোটে নি, কেবল আধুনিক বাতাস এসে লেগেছিলাে তাঁর কবিতার শরীরে ও মনে।

কবি ঈশ্বর গুপ্ত। তিনিই উনিশশতকের প্রথমার্ধের একমাত্র কবি আমাদের। তার কবিতা ছিলাে হাল্কা, ব্যঙ্গবিদ্রুপে ভরা। তাঁর কবিতায় কল্পনার স্থানও ছিলাে না। ঈশ্বর গুপ্ত ছিলেন আধুনিক কালের মানুষ। কিন্তু তিনি আধুনিকতাকে পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করতে পারেন নি। এ-কবির দৃষ্টিও ছিলাে একটু বাঁকা; তিনি সবকিছু দেখতেন বাঁকা চোখে, আর ব্যঙ্গবিদ্রুপে ভরে তুলতেন কবিতা। ঈশ্বর গুপ্তের কবিতার বিষয়ও ছিলাে চমৎকার; – তপসে মাছ থেকে শুরু করে ইংরেজদের ককটেল পাটি সবকিছু ছিলাে তাঁর কবিতার বিষয়। বঙ্কিমচন্দ্র তাকে বলেছেন ‘খাটি বাঙালি’। আধুনিক কালে অবশ্য খাটি বাঙালি হওয়া খুব প্রশংসার ব্যাপার নয়। তাঁর কবিতায় আগের কালের কবিওয়ালাদের প্রভাব বেশ গভীর।

ঈশ্বর গুপ্তের কবিতার একটি বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ার মতাে। তা হলাে কবির হাস্যরসিকতা। তিনি সবকিছু থেকে হাস্যরস আহরণ করেন, দুঃখের মধ্যেও তার হাসি থামে না। তার একটি বড়াে দুঃখের কবিতা থেকে কিছু অংশ তুলে দিচ্ছি। কবিতাটির নাম “পৌষপার্বণ”। কবি বড়াে দুঃখের কথা বলেছেন :
এবার বছরকার দিন, কপালে ভাই, জুটলাে নাকো, পুলি পিঠে। যে মাগগির বাজার, হাজার হাজার, মাের্তেছে লােক, কপাল পিটে। কবি কিন্তু খুব চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন তার একটি কবিতায় এক ইংরেজ রমণীর। তিনি লিখেছেন :

বিড়ালাক্ষী বিধুমুখী মুখে গন্ধ ছছাটে। আহা তায় রােজ রােজ কতাে রােজ ফোটে।

উনিশশতকের প্রথমার্ধের শেষদিকে দেখা দেন আরেকজন কবি। তিনি ঈশ্বর গুপ্তের চেয়ে কিছুটা আধুনিক; কিছুটা নয়, অনেকটা। তবে তিনি খাঁটি কবি ছিলেন না। তাঁর নাম রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর পদ্মিনী-উপাখ্যান নামক একটি আখ্যায়িকা কাব্য বের হয় ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে। কাব্যটিতে আছে অনেক ঘটনা, অনেক উপমা। তিনি কাব্যের কাহিনী আহরণ করেছিলেন টডের রাজস্থান-কাহিনী নামক একটি বই থেকে। এ-কাব্যটিতেই আছে সেই বিখ্যাত চরণগুলাে স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, কে বাঁচিতে চায়? দাসত্ব শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে, কে পরিবে পায়? তবে পদ্মিনী-উপাখ্যান আধুনিক কবিতাকে বেশিদূর এগিয়ে নিতে পারে নি। এ-কবির আরাে কয়েকটি কাব্য হচ্ছে কর্মদেবী (১৮৬২), শূরসুন্দরী (১৮৬৮), কাধীকাবেরী (১৯৭৯)। | বাঙলা কবিতায় আধুনিকতা আনেন কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩] । শুধু কবিতায় নয়, তিনি আধুনিকতা আনেন নাটকে, প্রহসনে। তাঁর মতাে প্রতিভাবান কবি বাঙলা সাহিত্যে আছেন মাত্র আর একজন, তিনি রবীন্দ্রনাথ। মধুসূদন মহাকাব্য রচনা করে বাঙলা কবিতার রূপ বদলে দিয়েছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত বা রঙ্গলালের পর তার আগমন অনেকটা আকস্মিক। তিনি সাহিত্য সাধনা করেছেন মাত্র কয়েক বছর, ধূমকেতুর মতাে তিনি চোখ ধাঁধিয়ে এসেছেন, কতােগুলাে সােনার ফসল ফলিয়েছেন, এবং হঠাৎ বিদায় নিয়েছেন। বাল্যকালে তিনি বাঙলা সাহিত্যের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ অনুভব করেন নি। কবি মধুসূদনের জীবন একটি বিয়ােগান্তক নাটকের চেয়েও বেশি শিহরণময়, বেশি করুণ। ছেলেবেলা থেকেই তাঁর সাধ ছিলাে বড়াে কবি হওয়ার; তবে বাঙলা ভাষার নয়, ইংরেজি ভাষার। ইংরেজি তিনি শিখেছিলেন ইংরেজের মতাে, কবিতাও লিখেছিলেন ইংরেজিতে। ধর্ম বদলে হয়েছিলেন খ্রিস্টান, নাম নিয়েছিলেন মাইকেল। বিয়ে করেছেন দুবার, দুবারই বিদেশিনী। আবাল্য তিনি ছিলেন উজ্জ্বল, হিশেব করা কাকে বলে তা তিনি জানতেন না। জীবনে তিনি অর্জন করেছেন অনেক টাকা, কিন্তু তাঁর জীবন সমাপ্ত হয়েছে দারিদ্রে। সব মিলে মধুসূদন তুলনাহীন। বিলেত যাওয়ার জন্যে তিনি ছিলেন পাগল।

একটি ইংরেজি কবিতায় তার আবেগ তীব্রভাবে তিনি প্রকাশ করেছেন; বলেছেন, ‘আই শাই ফর অ্যালবিঅনস ডিসট্যান্ট শাের’, অর্থাৎ ‘শ্বেতদ্বীপ তরে পড়ে মাের আকুল নিশ্বাস। তিনি ইংরেজি ভাষায় লিখেছিলেন দুটি দীর্ঘ কাব্য; একটির নাম ক্যাপটিভ লেডি, অপরটির নাম ভিশনস অফ দি পাস্ট। কিন্তু মধুসূদন বুঝেছিলেন তিনি যে-অমরতা কামনা করেন, তা লাভ করা যাবে না ইংরেজিতে লিখে। তাই তিনি হঠাৎ আসেন বাঙলা কবিতার ভুবনে। তিনি আসেন, দেখেন, জয় করেন। একটি চতুর্দশপদী বা সনেটে মধুসূদন বাঙলা কবিতার রাজ্যে আসার কথা বলেছেন। তার কিছু অংশ :
হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন – তা সবে (অবােধ আমি) অবহেলা করি, পর-ধন-লােভে মত্ত, করিনু ভ্রমণ। পরদেশে, ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচরি। কাটাইনু বহুদিন সুখ পরিহরি।

কবি মধুসূদন বাঙলা কবিতার ভুবনে আসেন ১৮৫৯ অব্দে তিলােত্তমাসম্ভবকাব্য নামে একটি চার-সর্গের আখ্যায়িকা কাব্য নিয়ে। কাব্যটি বাঙলা কবিতার রাজ্যে নতুন। ভাব ভাষা প্রকাশরীতি সবদিকেই। তবু এটি মধুসূদনের প্রতিভার পরিচায়ক নয়। তাঁর প্রধান এবং বাঙলা কবিতার অন্যতম প্রধান কাব্য মেঘনাদবধকাব্য। প্রকাশিত হয় ১৮৬১ অব্দে। এ-কাব্য প্রকাশের সাথেসাথে স্বীকার করে নিতে হয় যে তিনি বাঙলার মহাকবিদের একজন। এটি একটি মহাকাব্য। নয় সর্গে রচিত এ-কাব্যের নায়ক রাবণ। মধুসূদন নতুন কালের বিদ্রোহী; তিনি চিরকাল দণ্ডিত রাবণকে তাই করে তােলেন তাঁর নায়ক। রাম সেখানে সামান্য। রাবণের মধ্য দিয়ে মধুসূদন তােলেন তার সমকালের বেদনা দুঃখ আর ট্র্যাজেডি। মধুসূদন তার কাব্যের কাহিনী নিয়েছিলেন রামায়ণ থেকে; সীতা হরণ এবং রাবণের পতন এ-কাব্যের বিষয়। কিন্তু তাঁর হাতে এ-কাহিনী লাভ করে নতুন তাৎপর্য। হয়ে ওঠে অভিনব মহাকাব্য, বাঙলা ভাষায় যার কোনাে তুলনা নেই।

এ-কাব্যে তিনি আর যা মহৎ কাজ করেন, তা হচ্ছে ছন্দের বিস্তৃতি। তিনি চিরদিনের বাঙলা পয়ারকে নতুন রূপ দেন। আগে পয়ার ছিলাে বহুব্যবহারক্লান্ত ছন্দোরীতি। মধুসূদন পয়ারকে প্রচলিত আকৃতি থেকে মুক্তি দিয়ে করে তােলেন প্রবহমাণ। একে অনেকে বলেন ‘অমিত্রাক্ষর ছন্দ’। পয়ার এমন :

মহাভারতের কথা অমৃত সমান। কাশীরাম দাস কহে শশানে পুণ্যবান ॥
আগে কবিরা চোদ্দ মাত্রার প্রতিটি চরণের শেষে এসে থেমে পড়তেন।
প্রথম চরণের শেষে দিতেন এক দাঁড়ি, দ্বিতীয় চরণের শেষে দু-দাঁড়ি।

এ-ভাবে শ্লথগতিতে কাব্য এগিয়ে চলতাে। কবিরা তখন ছিলেন ছন্দের দাস, যা তাঁরা বলতে চাইতেন পারতেন না বলতে; কেননা প্রতি চরণের শেষে তাদের জিরােতে হতাে। কবি মধুসূদন ছন্দের এ-শৃঙ্খলটাকে ভেঙে ফেলেন। তিনি ছন্দকে করেন কবির বক্তব্যের অনুগামী। উদাহরণ দিলে বােঝা সহজ হবে :
সম্মুখ সমরে পড়ি, বীর-চূড়ামণি বীরবাহু, চলি যবে গেলা যমপুরে অকালে, কহ, হে দেবি অমৃতভাষিণি, কোন বীরবরে বরি সেনাপতি-পদে, পাঠাইলা রণে পুনঃ রক্ষঃকুলনিধি রাঘবারি?

পংক্তিগুলাে পাওয়া যাবে মেঘনাদবধকাব্য-এর শুরুতেই। এখানে প্রতি চরণে চোদ্দ মাত্রা ঠিকই আছে, কিন্তু প্রতি চরণে বক্তব্য না থেমে থেমেছে সেখানে, যেখানে শেষ হয়েছে বক্তব্য। এটি ছন্দের ক্ষেত্রে একটি বিশাল ঘটনা। মধুসূদন মুক্তি দেন বাঙলা ছন্দকে; পয়ারকে করে তােলেন প্রবহমাণ। একে নির্ভর করে অনেক বিবর্তন ঘটেছে বাঙলা ছন্দের।
তিলােত্তমাসম্ভবকাব্য এবং মেঘনাদবধকাব্য ছাড়া মধুসূদন আরাে লিখেছেন ব্রজাঙ্গনাকাব্য (১৮৬১), বীরাঙ্গনাকাব্য (১৮৬২), এবং চতুর্দশপদী কবিতাবলী (১৮৬৬)। “ব্রজাঙ্গনা” রাধার বিরহ নিয়ে রচিত কাব্য। এ-কাব্যে আছে কিছু চমৎকার লিরিক বা গীতিকবিতা । তার একটি অংশ :

কেন এতাে ফুল তুলিলি, সজনি
ভরিয়া ডালা? মেঘাবৃত হলে পরে কি রজনী
তারার মালা? আর কি যতনে কুসুম রতনে

ব্রজের বালা? মধুসূদনের বীরাঙ্গণা এক অসাধারণ অভিনব কাব্য। বাঙলা ভাষায় মধুসূদন সর্বপ্রথম রচনা করেন সনেট, তিনি যার নাম দিয়েছিলেন “চতুর্দশপদী কবিতা”। ১৮৬০ সালে তিনি প্রথম সনেট লেখার কথা ভাবেন, এবং একটি সনেট রচনাও করেন। এটিই পরে পুনর্লিখিত হয়ে নাম পায় বঙ্গভাষা’। মধুসূদন সনেট লিখেছিলেন ফ্রান্সের ভার্সাই শহরে বসে। তখন তিনি ছিলেন পরবাসী, দারিদ্র্যপীড়িত। তাই এ-সনেটগুলােতে তার মনের

আবেগ, অনুভূতি, বেদনা থরেথরে প্রকাশিত হয়েছে। মধুসূদনকে আমরা জানি অলঙ্কারশােভিত ঘনঘটাময় মহাকাব্যের নৈর্ব্যক্তিক কবি বলে। তাঁর ছিলাে একটি অতি সকাতর চিত্ত, যা সাধারণত থাকে রােমান্টিক কবিদের। মধুসূদন বাঙলা কবিতাকে মধ্যযুগ থেকে নিয়ে আসেন আধুনিক কালে। সৃষ্টি করেন অমর কবিতা।

মধুসূদনের পরে বাঙলা কবিতায় দেখা দেয় অনুকৃতি, বৈচিত্র্যহীনতা। মধুসূদন মহাকাব্য রচনা করেছেন, তাই তাঁর পরে অনেকে চেষ্টা করেন মহাকাব্য লিখে মহাকবি হ’তে। এর ফলে বাঙলা কবিতায় দেখা দেয় এক শ্রেণীর দীর্ঘ আখ্যায়িকা কাব্য, যেগুলাে দেখতে মহাকাব্যের মতাে, কিন্তু মহাকাব্য নয়। মহাকাব্য প্রতিবছর রচনা করা যায় না; মহাকাব্য রচিত হতে পারে কয়েকশাে বছরে একটি। এছাড়া আধুনিক কাল মহাকাব্যের কালও নয়। মধুসূদনপরবর্তী কবিরা এ-কথাটি বুঝতে পারেন নি। বা পারলেও তাদের ক্ষমতা ছিলাে না কবিতার দিক বদল করতে। তাই তাঁরা আপ্রাণ অনুসরণ করেন মধুসূদনকে। দেখতে মহাকাব্যের মতাে, কিন্তু আসলে তা নয়, এরকম কাব্য লেখেন হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৯০৩), নবীনচন্দ্র সেন (১৮৪৭-১৯০৯), কায়কোবাদ {১৮৫৭-১৯৫১), এবং আরাে অনেকে। হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় লেখেন বীরবাহুকাব্য (১৮৬৪), বৃত্রসংহার (১৮৭৫-১৮৭৭)। তার কিছু খণ্ডকবিতাও আছে। নবীনচন্দ্র সেন লেখেন পলাশির যুদ্ধ (১৮৬৬), ক্লিওপেট্রা (১৮৭৭), রঙ্গমতী (১৮৮০) এবং রৈবতক (১৮৮৬), কুরুক্ষেত্র (১৮৯৩), প্রভাস (১৮৯৬)। তিনি কিছু ক্ষুদ্র কবিতাও রচনা করেছিলেন, সেগুলাে সংগৃহীত হয়েছিলাে অবকাশরঞ্জিনী (১৮৭১) নামক কাব্যে। কায়কোবাদ মহাকবি হওয়ার জন্যে লিখেছিলেন মহাকাব্য, যদিও তাঁর মনটি ছিলাে গীতিকবির। তিনি ছিলেন আবেগী, গীতিকবিতার চর্চা করলে তিনি আরাে কবি হ’তে পারতেন। তিনি পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ অবলম্বনে রচনা করেন মহাশ্মশান কাব্য (১৯০৪)। তার অন্যান্য কাহিনীকাব্য হচ্ছে মহররমশরিফ কাব্য (১৯৩২), শিবমন্দির (১৯৩৮)। তাঁর খণ্ডকবিতার বই বিরহবিলাপ (১৮৭০), অশ্রুমালা (১৮৯৫)। এ-সময়ে আর যারা কবিতা লিখেছেন তাঁদের মধ্যে আছেন শিবনাথ শাস্ত্রী, অক্ষয় চৌধুরী, ঈশানচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়।

বাঙলা কবিতায় যখন মহাকাব্যের ঘনঘটা চলছিল, তখন এক লাজুক নির্জন কবি নিজের মনের কথা নিজের সুরে ধ্বনিত করেন। কবি নিজের আবেগে বিভাের, তার চারদিকে কী আছে সেদিকে খেয়াল নেই। তিনি বাস করছেন নিজের অন্তরঙ্গলােকে; তিনি কারাে উদ্দেশে কিছু বলেন না, শুধু গুণগুণ করেন নিজেকে নিজের কাছে। এ-কবির মধ্যে সর্বপ্রথম দেখা দেয় রােম্যান্টিকতা, যা একদিন বাঙলা কবিতাকে অধিকার করে নেয়। একবির নাম বিহারীলাল চক্রবর্তী (১৮৩৫-১৮৯৪)। যে-কবি নিজের মনের কথা বলেন, যেকবি অদ্ভুতকে, সুন্দরকে, রহস্যকে আহ্বান করেন, যে-কবি যা পান না বা পাবেন না, তা চেয়েচেয়ে জীবন কাটান, তিনি রােম্যান্টিক কবি। বিহারীলাল বাঙলা কবিতার প্রথম রােম্যান্টিক কবি, প্রথম খাটি আধুনিক কবি। তাঁর পথ ধ’রে এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বিহারীলালকে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন বাংলা কাব্যের ‘ভভারের পাখি’। ভােরের পাখি সূর্যোদয়ের আগে একাকী জাগে, মনের আনন্দে গান গায়, সূর্য ওঠার পর সে আর থাকে না। বিহারীলালও তেমনি, একাকী নিজের মনের গীতিকা সুরে বেঁধেছিলেন তিনি; তবে ভাের হওয়ার পরও তিনি আছেন। বিহারীলালের কবিতা পড়লে মনে হয় কবি বাস করছেন দিগদিগন্তব্যাপী। আবেগের কাতরতার মধ্যে, স্বপ্নের মধ্যে। ওই তাঁর বিশেষত্ব। তিনি স্বপ্নলােকের অধিবাসী, বাস্তবতা তার অচেনা। তিনি বাঙলা কবিতার প্রথম ধাপ-না-খাওয়া কবি। তিনি একটি নতুন রােম্যান্টিক ধারার প্রবর্তক হিশেবে চিরস্মরণীয়। বিহারীলালের মধ্যে রােমান্টিক আবেগের প্রাচুর্য রয়েছে, কিন্তু নেই সে আবেগকে রূপ দেয়ার শক্তি। এ-আবেগকে পরে রূপ দিয়েছিলেন কবি রবীন্দ্রনাথ, বিহারীলালের শিষ্য। বিহারীলাল এমন কিছু স্তবক ও পংক্তি লিখে গেছেন, যেগুলাে বাঙলা কবিতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।

বিহারীলালের কবিতার বই আছে অনেকগুলাে : সঙ্গীতশতক (১৮৬২), প্রেমপ্ৰবাহিণী (১৮৭০), বঙ্গসুন্দরী (১৮৭০), নিসর্গ সন্দর্শন (১৮৭০), সারদামঙ্গল (১২৮৬), সাধের আসন। এর মধ্যে যে-দুটি বই বিহারীলালের খ্যাতির কারণ, সেদুটি বঙ্গসুন্দরী এবং সারদামঙ্গল। বঙ্গসুন্দরী কাব্যে বিহারীলাল সর্বপ্রথম রােম্যান্টিক হাহাকার নিয়ে সবার সামনে উপস্থিত হন। এ-হাহাকার তীব্র, কবির আবেগে পাঠকও ভেসে যায়। অকারণ বেদনা হচ্ছে রােম্যান্টিক কবিতার একটি বড়াে লক্ষণ। কবি বেশ সুখে আছেন তবু সুখ পাচ্ছেন না, কেননা তিনি অসুখী তা তিনি নিজেও জানেন না। বিহারীলালের কবিতা থেকে তেমন চরণ তুলে আনি :

সর্বদাই হুহু করে মন, বিশ্ব যেন মরুর মতন,
চারিদিকে ঝালাপালা,
উঃ কি জ্বলন্ত জ্বালা! অগ্নিকুণ্ডে পতঙ্গ পতন।

কবির এ-জ্বালার কোন কারণ নেই, তাইতাে এ-জ্বালা অসহ্য। কবি বিহারীলালের শ্রেষ্ঠ কাব্যের নাম সারদামঙ্গল। এ-কাব্যে তাঁর রােম্যান্টিক আকুলতা চরণেচরণে প্রকাশ পেয়েছে, যদিও সর্বত্র তা রূপ পায় নি। কবি এ-কাব্যে এতাে রকমের স্বপ্ন দেখেছেন, এতাে রকমের আবেগ প্রকাশ করেছেন যে কাব্যটি পড়ে বুঝতে কষ্ট হয় কবি কী বললেন। মনের আবেগে তিনি চরণের পরে চরণ রচনা করেছেন, একবারও ভাবেন নি পাঠকদের কথা। তবে কাব্যটির আছে ভালােভালাে গীতিকবিতা, পাঠকের জন্যে ওইটুকু কম লাভ নয়। বিহারীলালের মধ্যে একজন বড়াে কবি বাস করতেন, কিন্তু সে-কবি আত্মপ্রকাশ করতে পারেন নি। আবেগের ঘনমেঘে সে চিরদিন অদৃশ্য রয়েছে। বিহারীলাল বাঙলা ভাষার বিশুদ্ধ কবিদের একজন।

বিহারীলালের অন্তরঙ্গ কবিতার পথ ধরে এসেছিলেন অনেক কবি। তাদের কয়েকজন : সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার (১৮৩৮-১৮৭৮), দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৪০-১৯২৬), দেবেন্দ্রনাথ সেন (১৮৫৮-১৯২০), গােবিন্দচন্দ্র দাস (১৮৫৫-১৯১৮), অক্ষয়কুমার বড়াল {১৮৬০-১৯১৯), দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (১৮৬৩-১৯১৩), এবং রবীন্দ্রনাথ (১৮৬১-১৯৪১)। সুরেন্দ্রনাথের কাব্যের নাম মহিলা, দ্বিজেন্দ্রনাথের কাব্যের নাম স্বল্পপ্রয়াণ, গােবিন্দচন্দ্র দাসের কাব্যের নাম প্রেম ও ফুল, শােকোচ্ছাস, মগের মুলুক। তিনি প্রতিবাদী কবি ছিলেন। দেবেন্দ্রনাথ সেনের কাব্যের নাম ফুলবালা, অশােকগুচ্ছ গােলাপগুচ্ছ, পারিজাতগুচ্ছ, শেফালিগুচ্ছ। অক্ষয়কুমার বড়ালের কাব্যের নাম এষা। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের কাব্যের নাম আর্যগাথা, আষাঢ়ে, হাসির গান, মন্দ্র, আলেখ্য।

আরো পড়ুন

লাল নীল দীপাবলি বা বাংলা সাহিত্যের জীবন | হুমায়ুন আজাদ [02]

Bcs Preparation

লাল নীল দীপাবলি বা বাংলা সাহিত্যের জীবন | হুমায়ুন আজাদ [01]

Bcs Preparation