বাংলাদেশ বিষয়াবলী

রেমিট্যান্সে ভর করে টিকে আছে দেশের অর্থনীতি

২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে প্রবাসী আয়ে প্রণােদনা দিচ্ছে সরকার। এখন বৈধ পথে আয়ে আড়াই শতাংশ প্রণােদনা মিলছে। ফলে কেউ ১০০ টাকা পাঠালে আত্মীয়রা পাচ্ছেন ১০২ টাকা ৫০ পয়সা। প্রবাসী আয় বেশি আসছে সৌদি আরব থেকে ২০২১-২২ অর্থবছরে আসে ৪৫৪ কোটি ডলার। ২০২১ সালে দেশে প্রবাসী আয় আসে ২ হাজার ২০৭ কোটি ডলার।

দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছেন কাজের জন্য বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশিরা। কারণ, তারা সেখানে পরিশ্রম করে দেশে অর্থ পাঠাচ্ছেন। এই অর্থে তাদের পরিবারগুলাে চলছে। আর তাদের পাঠানাে ডলারের ওপর ভর করে চলছে দেশের অর্থনীতি। দেশে যে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স আসে, তা আসে ডলারে। ব্যাংকগুলাে সেই ডলার কিনে নেয়, এর বিপরীতে টাকা দেয়। আর ব্যাংকগুলােতে ডলার বেশি জমা হলে তা কিনে নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে বাড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ আগস্টে ছিল ৩ হাজার ৯৫০ কোটি ডলার। এই রিজার্ভ ২০২১ সালের আগস্টে ৪ হাজার ৮০০ কোটি ডলার পর্যন্ত উঠেছিল।

ডলার কোথা থেকে আসে

বাংলাদেশের ডলার আয় হয় মূলত প্রবাসী আয় ও রপ্তানি আয়ের মাধ্যমে। পাশাপাশি বিদেশি ঋণ, অনুদানের মাধ্যমেও দেশে ডলার আসে। তবে ঋণ শােধ করতে হয়। ডলারেই। আর রপ্তানি আয়ের জন্য বড় অংশ কাঁচামাল আমদানি করতে হয় ডলার খরচ করে। ফলে আয়ের বড় অংশ খরচ হয়ে যায়। তবে প্রবাসীরা যে আয় পাঠান, তার বিপরীতে কোনাে খরচ হয় না। শুধু প্রবাসে যাওয়ার জন্য খরচ হয়। এর পর থেকে প্রবাসীরা ডলার পাঠাতে থাকেন । এ জন্য সরকারের পক্ষ থেকে দক্ষ শ্রমিক বিদেশে পাঠাতে রয়েছে আলাদা মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া রয়েছে দেশি ও বিদেশি উদ্যোগে নানা প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। আবার এখন ফ্রিল্যান্সাররা দেশে বসে ডলার আয় করছেন, যা অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে।

ডলার খরচ হয় কোথায়

বাংলাদেশের মতাে দেশের জন্য ডলার খুবই প্রয়ােজন। কারণ, আমাদের জ্বালানি তেল, ভােজ্যতেল, খাদ্যসহ বিভিন্ন অতি প্রয়ােজনীয় পণ্য আমদানি করতে হয়। আবার শিল্পকারখানা স্থাপনে মূলধনি যন্ত্র, কাঁচামালসহ বহু পণ্য আনতে হয় বিদেশ থেকে। আমাদের হাতে যে মুঠোফোন, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, তা-ও আসে বিদেশ থেকে। যদিও অনেক সময় বলা হয় দেশে তৈরি, তবে এর মূল যন্ত্র ঠিকই বিদেশ থেকে আসে। একইভাবে সব ধরনের ব্যবহার্য ও বাসাবাড়ির ইলেকট্রনিক যন্ত্র, গাড়িও আসে বিদেশ থেকে। এসব পণ্য কিনতে আমরা টাকা খরচ করি, তবে বিদেশ থেকে আনতে হয় ডলার খরচ করে। পাশাপাশি বিদেশি বিভিন্ন সংস্থাকে ফিও দিতে হয় । এ জন্য প্রবাসী আয় আমাদের দেশের জন্য খুবই প্রয়ােজনীয়।

সরকারের উদ্যোগ

ডলার আয় করতে সরকার শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। রপ্তানিকারকদের দিচ্ছে নগদ প্রণােদনা। আর ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে শুরু হয় প্রবাসী আয়ের ওপর নগদ প্রণােদনা। বৈধ পথে প্রবাসী আয় আনলে সরকার ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে ২ শতাংশ প্রণােদনা দিচ্ছে। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে প্রণােদনার পরিমাণ বাড়িয়ে আড়াই শতাংশ করা হয়। আর যেকোনাে পরিমাণ প্রবাসী আয় পাঠানাের সময় আর কোনাে প্রশ্ন করছে না এক্সচেঞ্জ হাউসগুলাে। এর বিপরীতে মিলবে আড়াই শতাংশ হারে নগদ প্রণােদনাও। আগে পাঁচ হাজার ডলার বা পাঁচ লাখ টাকার বেশি আয় পাঠাতে আয়ের নথিপত্র জমা দিতে হতাে। এতে বেশি পরিমাণ অর্থ পাঠাতে পারতেন না বিদেশে থাকা বাংলাদেশিরা।

প্রবাসী আয়ের চিত্র

দেশ স্বাধীনের আগেও বিদেশে লােকজন কাজের উদ্দেশ্যে যেতেন। তখনাে দেশে অর্থ আসত। তবে ওই সময় হাতে হাতে অর্থ আসত। আবার হুন্ডিও হতাে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ১৯৭৬ সাল থেকে প্রতিবছর প্রবাসী আয়ের তথ্য রয়েছে। ১৯৭৬ সালে আয় হয়েছিল ২ কোটি ৩৭ লাখ ডলার। ২০২১ সালে প্রবাসী আয় হয়েছে ২ হাজার ২০৭ কোটি ডলার। প্রবাসী আয়ের বড় উল্লম্ফন হয় প্রণােদনা চালুর পর। করােনায় অবৈধ পথ বা হুন্ডি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ওই সময়ে বৈধ পথে অনেক আয় আসে। তবে এখন আবার কমে আসছে। ফলে দেশের ডলারের সংকট তৈরি হয়ে দাম বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২১ আগস্ট ২০২২ ডলারের দাম ছিল ৯৫ টাকা।

আয় বেশি কোথা থেকে

বাংলাদেশের শ্রমিকেরা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলােতে কাজের জন্য বেশি যান। এ জন্য এখনাে প্রবাসী আয় বেশি আসছে সৌদি আরব থেকে। ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশটি থেকে আসে ৪৫৪ কোটি ডলার। এরপর বেশি আয় আসছে যথাক্রমে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩৪৩ কোটি ডলার, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ২০৭ কোটি ডলার, যুক্তরাজ্য থেকে ২০৩ কোটি ডলার। এরপর কুয়েত থেকে আসে ১৬৮ কোটি ডলার, কাতার থেকে ১৩৪ কোটি ডলার, ইতালি থেকে ১০৫ কোটি ডলার ও মালয়েশিয়া থেকে আসে ১০২ কোটি ডলার। সাধারণত যেসব দেশে বেশি শ্রমিক যান, সেসব দেশ থেকেই বেশি আয় আসে। তবে করােনার কারণে হিসাব উল্টে গেছে। এখন যুক্তরাষ্ট্র থেকেও ভালাে আয় আসছে। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, করােনার কারণে আত্মীয়স্বজনের কাছে অর্থ পাঠানাে বেড়ে গেছে। আবার অনেক শ্রমিকের চাকরি চলে গেছে, বেতন কমে গেছে। এ জন্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে অর্থ আসা বেড়ে গেছে।

প্রবাসী আয়ের চিত্র (হিসাব কোটি ডলারে)

সাল  ডলার সাল  ডলার 
১৯৭৬ ২০০০ ১৯৫
১৯৭৭ ২০০১ ২০৭
১৯৭৮ ১০ ২০০২ ২৮৪
১৯৭৯  ১৭  ২০০৩  ৩১৭ 
১৯৮০  ৩০  ২০০৪  ৩৫৬
১৯৮১ ৩০  ২০০৫  ৪২৪ 
১৯৮২  ৪৯  ২০০৬  ৫৪৮ 
১৯৮৩ ৬২ ২০০৭  ৬৫২
১৯৮৪  ৫০  ২০০৮  ৮৯৭ 
১৯৮৫
৫০ 
২০০৯
১০৭১ 
১৯৮৬ 
৫৭ 
২০১০ 
১১০০ 
১৯৮৭
৭৪ 
২০১১ 
১২১৬ 
১৯৮৮ 
৭৬ 
২০১২ 
১৪১৬ 
১৯৮৯
৭৫ 
২০১৩
১৩৮৩
১৯৯০ ৭৮ ২০১৪
১৪৯৪ 
১৯৯১
৭৬ 
২০১৫ 
১৫২৭ 
১৯৯২ 
৯০ ২০১৬ 
১৩৬০ 
১৯৯৩ 
৭৬ 
২০১৭
১৩৫২
১৯৯৪  ৯০ ২০১৮  ১৫৫৪ 
১৯৯৫  ১০০  ২০১৯  ১৮৩৫ 
১৯৯৬  ১১৫  ২০২০  ২১৭৫
১৯৯৭  ১২০  ২০২১  ২২০৭ 
১৯৯৮ ১৩৫ ২০২২  ১২৮৮
জুলাই পর্যন্ত
১৯৯৯  ১৫২

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button