আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী

রাশিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সংস্কারক মিখাইল গর্বাচেভ

একনজরে মিখাইল গর্বাচেভ
জন্ম ২ মার্চ ১৯৩১; স্তাভরােপােল ক্রায়ত, সােভিয়েত ইউনিয়ন।
ক্ষমতা লাভ ১৯৮৫ সালে ক্ষমতায় আসেন (৫৪ বছর বয়সে)।
পেরেস্রোইকা এবং গ্লাসনস্ত কর্মসূচি চালু মার্চ, ১৯৮৫।
কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত মার্চ, ১৯৮৫ (৫৪ বছর বয়সে)।
গর্বাচেভ ও রিগ্যান চুক্তি ডিসেম্বর, ১৯৮৭।
আফগানিস্তানে সােভিয়েত সেনা প্রবেশ ও প্রত্যাহার ২৫ ডিসেম্বর ১৯৭৯ সালে প্রবেশ ও ১৯৮৯ সালে প্রত্যাহার।
গর্বাচেভের শান্তিতে নােবেল লাভ ১৯৯০ সালে।
ওয়ারশ চুক্তি বিলুপ্ত এপ্রিল, ১৯৯১।
প্রেসিডেন্টের পদ থেকে পদত্যাগ ২৫ ডিসেম্বর ১৯৯১।
সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি ২৬ ডিসেম্বর ১৯৯১।
মৃত্যু ৩০ আগস্ট ২০২২।

বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বিশ্বে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতা ছিলেন মিখাইল গর্বাচেভ। রাশিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সংস্কারক তিনি। প্রায় সাত বছর তিনি ক্ষমতায় ছিলেন। তাঁর হাত দিয়েই সােভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি ঘটে। গর্বাচেভের দায়িত্ব পালনের সময়টি ছিল ঘটনাবহুল। তাঁর সময়কার ঘটনাপ্রবাহের সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলাে—

জন্ম, শিক্ষা ও রাজনৈতিক জীবনের হাতেখড়ি

মিখাইল গর্বাচেভের জন্ম ১৯৩১ সালের ২ মার্চ, সােভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের স্তাভরােপােল কায়তে। ১৫ বছর বয়সে গর্বাচেভ ইয়ং কমিউনিস্ট লিগ কমলােমলে যােগ দেন। ১৯৫২ সালে তিনি মস্কোর স্টেট ইউনিভার্সিটির ল স্কুলে ভর্তি হন এবং ১৯৫৫ সালে আইনে ডিগ্রি লাভ করেন। সত্তরের দশকে তিনি পার্টির অঞ্চল কমিটির ফার্স্ট সেক্রেটারি হন এবং ১৯৮৫ সালে সিপিএসইউর পলিটব্যুরাে গর্বাচেভকে জেনারেল সেক্রেটারি বানায়।

গর্বাচেভের ক্ষমতা লাভ

পূর্ববর্তী কনস্তান্তিন চেরনেনকোর মৃত্যুর পর ১৯৮৫ সালে ৫৪ বছর বয়সে ক্ষমতায় আসেন মিখাইল গর্বাচেভ। ১৯৮৮ সাল থেকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে, ১৯৮৮ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত সুপ্রিম সােভিয়েতের প্রেসিডিয়ামের চেয়ারম্যান এবং ১৯৯০ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত সােভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯০ সালে সােভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতন্ত্রের পতন হলে গর্বাচেভ রাশিয়ার প্রথম ও একমাত্র প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত হন।

পেরেস্ত্রোইকা এবং গ্লাসনস্ত কর্মসূচি চালু

১৯৮৫ সালের মার্চ মাসে মিখাইল সের্গেয়েভিচ গর্বাচেভ দেশকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থবিরতা থেকে বের করে আনতে পেরেস্রোইকা (অর্থনৈতিক সংস্কার) এবং গ্লাসনস্ত (বাক্‌স্বাধীনতা) কর্মসূচি চালু করেন। ১৯৯০ সালের শেষ দিকে এ নীতি দুটি অকার্যকর হয়ে পড়ে।

গর্বাচেভ পলিটব্যুরাের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য

১৯৮৫ সালের মার্চ মাসে মিখাইল সের্গেয়েভিচ গর্বাচেভ কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক হন ৫৪ বছর বয়সে। তখন তিনি ছিলেন পলিটব্যুরাের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য।

আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী থেকে আরো পড়ুন :

পশ্চিমাদের বন্ধু

১৯৮৭ সালের ডিসেম্বরে পারমাণবিক অস্ত্রের মজুত কমিয়ে আনতে ওয়াশিংটনে প্রথম চুক্তি স্বাক্ষর করেন গর্বাচেভ ও রিগ্যান। আফগানিস্তান থেকে সােভিয়েত সেনা প্রত্যাহার ২৪ ডিসেম্বর ১৯৭৯ আফগানিস্তানে সামরিক আগ্রাসন শুরু করে সােভিয়েত ইউনিয়ন। গর্বাচেভের নির্দেশে ১৯৮৮-৮৯ সালে আফগানিস্তান থেকে সােভিয়েত বাহিনী প্রত্যাহার করা হয়। জর্জিয়া, ইউক্রেনসহ বাল্টিক অঞ্চলের দেশগুলাের স্বাধীনতা আন্দোলন জোরদার ১৯৮৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে আফগানিস্তানে সােভিয়েত সামরিক বাহিনীর ৯ বছরের অভিযানের সমাপ্তি হয়। জর্জিয়া, ইউক্রেনসহ বাল্টিক অঞ্চলের দেশগুলাের স্বাধীনতা আন্দোলন জোরদার হতে থাকে।

সােভিয়েত ইউনিয়নে প্রথমবারের মতাে একাধিক প্রার্থীর অংশগ্রহণে নির্বাচন

১৯৮৯ সালের মার্চ মাসে কংগ্রেস অব পিপলস ডেপুটির সদস্য নির্বাচনে সােভিয়েত ইউনিয়নে প্রথমবারের মতাে একাধিক প্রার্থীর অংশগ্রহণে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

বিপ্লবে প্রতিরােধ না গড়া

১৯৮৯ সালের নভেম্বরে জনপ্রিয় বিপ্লবে পূর্ব জার্মানি এবং পূর্ব ইউরােপের বাকি অংশে কমিউনিস্ট সরকারগুলাের পতন ঘটে। তবে নিজের প্রভাবাধীন এসব সরকারের পতন ঠেকাতে কোনাে ধরনের হস্তক্ষেপের চেষ্টা চালায়নি সােভিয়েত ইউনিয়ন।

নির্বাহী প্রেসিডেন্ট হিসেবে গর্বাচেভের একচেটিয়া ক্ষমতা

১৯৯০ সালের ফেব্রুয়ারিতে কমিউনিস্ট পার্টি দলটির একচেটিয়া ক্ষমতা সমর্পণ করে গর্বাচেভের ওপর। ব্যাপক ক্ষমতা বাড়িয়ে গর্বাচেভকে নির্বাহী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব দিতে সম্মত হয় পার্লামেন্ট।

গর্বাচেভের শান্তিতে নােবেল লাভ

১৯৯০ সালের অক্টোবরে বাজার অর্থনীতি গ্রহণে কমিউনিস্ট পার্টির মূল অর্থনৈতিক পরিকল্পনা পরিত্যাগের প্রস্তাব অনুমােদন করে সােভিয়েত পার্লামেন্ট। ওই বছর শান্তিতে নােবেল পুরস্কার পান। গর্বাচেভ।

ওয়ারশ চুক্তি বিলুপ্ত

১৯৯১ সালের এপ্রিলে পূর্ব ইউরােপের দেশগুলাের সামরিক জোট ওয়ারশ প্যাক্ট তথা ওয়ারশ চুক্তি ভেঙে দেওয়া হয়।

গর্বাচেভের ডেপুটি গেনাদি ইয়ানায়েভ প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ

১৯ আগস্ট ১৯৯১ গর্বাচেভের কথিত অসুস্থতার কথা বলে তাঁর ডেপুটি গেনাদি ইয়ানায়েভ কট্টর কমিউনিস্ট জান্তার প্রধান হয়ে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

গর্বাচেভের কমিউনিস্ট পার্টি থেকে পদত্যাগ

২৪ আগস্ট ১৯৯১ গর্বাচেভ কমিউনিস্ট পার্টির নেতার পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

রাশিয়ার কমনওয়েলথ অব ইনডিপেনডেন্ট হিসেবে আত্মপ্রকাশ

৮ ডিসেম্বর ১৯৯১ রাশিয়া, ইউক্রেন ও বেলারুশ কমনওয়েলথ অব ইনডিপেনডেন্ট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এখানে কেন্দ্রীয় কোনাে কর্তৃপক্ষ কিংবা গর্বাচেভের ভূমিকা থাকবে না। গর্বাচেভ প্রথমে এ ব্যবস্থার বিরােধিতা করে পদত্যাগে অস্বীকৃতি জানান। তবে শেষ পর্যন্ত এ অনিবার্য বাস্তবতা মেনে। নেন।

গর্বাচেভের প্রেসিডেন্টের পদ থেকে পদত্যাগ ও সােভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি

২৫ ডিসেম্বর ১৯৯১ গর্বাচেভ সােভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্টের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। পরদিন ২৬ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে সােভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি ঘটে।

মৃত্যু

সমাজতান্ত্রিক সােভিয়েত ইউনিয়নের শেষ নেতা মিখাইল গর্বাচেভ মস্কোর একটি হাসপাতালে ৯১ বছর বয়সে ৩০ আগস্ট ২০২২ শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button