আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী

ভারত-পাকিস্তান দেশভাগের ৭৫ বছর

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়ে বিশ্ব মানচিত্রে স্থান পায় ভারত-পাকিস্তান নামে দুটি দেশ। এ বছর ভারত-ভাগের ৭৫ বছর পূর্ণ হলাে।

দেশভাগ

ব্রিটিশ ভারতকে দুটি স্বাধীন অধিরাজ্য অর্থাৎ ভারত ও পাকিস্তানে বিভক্ত করার ঘটনাই দেশভাগ নামে পরিচিত। ব্রিটিশ শাসনাবসানের প্রাক্কালে তৎকালীন মুসলিম লীগের সভাপতি মােহাম্মদ আলী জিন্নাহ হিন্দু ও মুসলিম জাতির ভিত্তিতে দ্বিজাতি তরে উন্মেষ ঘটান।

১৯৪৬ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের সম্মেলনে সার্বভৌমত্ব ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের ধারণা সংশােধন করা হয় এবং দ্বিজাতি তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে একটি ‘সার্বভৌম পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ২২-২৩ মার্চ ১৯৪০ লাহােরে বাংলাসহ ভারতের একাধিক প্রদেশে তার দ্বিজাতি তত্ত্বের চূড়ান্ত ব্যাখ্যা তুলে ধরেন।

আরো পড়ুন : কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স সেপ্টেম্বর ২০২২ থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর

মুসলিম-প্রধান বেলুচিস্তান, সিন্ধু, উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ নিয়ে হবে পাকিস্তান। পাঞ্জাব ও বাংলায় যেহেতু মুসলিমদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না, সিদ্ধান্ত হলাে এই দুটি প্রদেশ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হবে।

১৯৪৭ সালের ভারত স্বাধীনতা আইন

ভারতের রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক সংকট দূর করার লক্ষ্যে ৩ জুন ১৯৪৭ ব্রিটিশ সরকার ভারত বিভাগ পরিকল্পনা গ্রহণ করে। উক্ত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৮ জুলাই ১৯৪৭ ব্রিটিশ পার্লামেন্ট কর্তৃক ভারত স্বাধীনতা আইন পাস করা হয়। আইনের বৈশিষ্ট্যগুলাে নিম্নরূপ-

  • ভারতকে বিভক্ত করে ভারতীয় ইউনিয়ন ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্র সৃষ্টি করা হয়।
  • ভারত ও পাকিস্তানের গণপরিষদ নিজ নিজ দেশের জন্য সংবিধান রচনা করার ক্ষমতা লাভ করে।
  • রাষ্ট্র দুটি ব্রিটিশ কমনওয়েলথভুক্ত থাকবে কিনা নিজ নিজ দেশের গণপরিষদ তা নির্ধারণ করবে।

নতুন সংবিধান রচিত ও প্রবর্তিত না হওয়া পর্যন্ত উভয় রাষ্ট্রকে নিম্নোক্ত বিধানগুলাে মেনে চলতে হবে।

  1. নিজ নিজ রাষ্ট্রের মন্ত্রিপরিষদের পরামর্শক্রমে ব্রিটিশরাজ গভর্নর জেনারেল নিয়ােগ করবেন
  2. মন্ত্রিসভার পরামর্শক্রমে গভর্নর জেনারেল প্রাদেশিক গভর্নর নিয়ােগ করবেন , ব্রিটিশ পার্লামেন্টের আইনের সঙ্গে সংগতি নেই এই অজুহাতে রাষ্ট্র দুটির কোনাে আইন নাকচ করা যাবে না।

র‌্যাডক্লিফ লাইন

সিরিল র‌্যাডক্লিফ নামে একজন ব্রিটিশ আইনজীবীকে ভারত উপমহাদেশের সীমানা নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। র‌্যাডক্লিফ আগে কখনােই ভারতে আসেননি। প্রথমবারের মতাে ভারতে এসে অর্পিত দায়িত্বের জন্য মাত্র পাঁচ সপ্তাহ ছিলেন।

এই অল্প সময়ে তিনি যে রেখাগুলাে টানেন তা আধুনিক ইতিহাসের বৃহত্তম জোরপূর্বক গণঅভিবাসনের সূচনা। পাশাপাশি বাস্তুচ্যুত হয় প্রায় দেড় কোটি মানুষ। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় নিহত হয় ২০ লাখেরও বেশি মানুষ। দুই দেশের সীমারেখা টানার ক্ষেত্রে বিভিন্ন কারণের পাশাপাশি র্যাডক্লিফকে মুসলিম এবং হিন্দু জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর ভিত্তি করতে বলা হয়।

আরো পড়ুন : বাংলাদেশ ব্যাংকে ক্যারিয়ার যা জানা জরুরি

ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলাে ছাড়াও উপমহাদেশে ফরাসি, পর্তুগিজ বা ওলন্দাজ শাসন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত অন্য অনেক অঞ্চলের পাশাপাশি স্থানীয় রাজাদের দ্বারা শাসিত সার্বভৌম দেশীয় রাজ্য ছিল। স্বাধীনতার পর ব্রিটিশরা স্বশাসিত রাজ্যগুলােকে দলিল স্বাক্ষরের মাধ্যমে ভারত বা পাকিস্তানে যােগ দেওয়ার প্রস্তাব দেয়।

এই অঞ্চলগুলাের কয়েকটি এখন পর্যন্ত ভারত বা পাকিস্তানের অংশ হয়ে ওঠেনি। এর মধ্যে অন্যতম কাশ্মীর, যেটি প্রতিবেশী দুই দেশের সঙ্গে এখনাে – একীভূত হয়নি, আবার রাজনৈতিক স্বাধীনতা লাভ করেনি। সিরিল র‌্যাডক্লিফের নামানুসারে ৪,৫০,০০০ বর্গকিলােমিটার দৈর্ঘ্যের এ সীমান্তরেখার নাম হয় র‌্যাডক্লিফ লাইন।

বিভাজনের কারিগর

সিরিল জন র‌্যাডক্লিফ ভারতের সীমানা নির্ধারণে গঠিত র‌্যাডক্লিফ কমিশনের প্রধান। কমিশনে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ থেকে দুজন করে সদস্য ছিলেন। সদস্যরা সবাই ছিলেন আইনজীবী। র‌্যাডক্লিফ নতুন দুটি রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানের মানচিত্র এবং আন্তর্জাতিক সীমা নির্দেশ করে তার রিপাের্ট পেশ করেন। তার প্রস্তাবনায় ব্রিটিশ ভারত বিভক্ত হয়ে ১৪ ও ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ পাকিস্তান এবং ভারত নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে।

দেশীয় রাজ্য

বাংলায় প্রিন্সলি স্টেটকে বলা যায় স্থানীয় রাজ্য’ বা ‘দেশীয় রাজ্য’। যুক্তরাজ্যের অধীন ভারতে দু’ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছিল। একটা হলাে প্রভিন্স এবং অন্যটি হলাে প্রিন্সলি বা দেশীয় রাজ্য। এইরূপ রাজ্য ব্রিটিশদের অধীন হয়েও সীমিত স্বায়ত্তশাসন ভােগ করত। তারা সরাসরি এবং পূর্ণ ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত হতাে না।

এইরূপ রাজ্যের স্থানীয় শাসকরা ‘মহারাজা’, ‘রাজা’, ‘নিজাম ইত্যাদি-পদবি ব্যবহার করতেন। ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার সময় ভারতবর্ষে ৫টি দেশীয় রাজ্য এবং ১১টি প্রভিন্স ছিল।

দেশীয় রাজ্যগুলাের মধ্যে আবার কিছু রাজ্য ছিল বাড়তি মর্যাদা সম্পন্ন। তাদের বলা হতাে স্যালুট স্টেট (Salute state)। রাজ্যগুলাের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল জম্মু ও কাশ্মীর, হায়দ্রাবাদ ইত্যাদি। আকারেও সেগুলাে বড় ছিল। যেমন, জম্মু ও কাশ্মীরের আয়তন ছিল তখন প্রায় দুই লাখ ৭,০০০ বর্গ কিলােমিটার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button