বাংলা ভাষার ব্যাকরণ ও নির্মিতিভাবসম্প্রসারণ

ভাব-সম্প্রসারণ সমগ্র | ভাবসম্প্রসারণের তালিকা | ভাবসম্প্রসারণ লেখার নিয়ম

ভাব-সম্প্রসারণ

ভাব-সম্প্রসারণ কথাটির অর্থ কবিতা বা গদ্যের অন্তর্নিহিত তৎপর্যকে ব্যাখ্যা করা, বিস্তারিত করে লেখা, বিশ্লেষণ করা। ঐশ্বর্যমণ্ডিত কোনাে কবিতার চরণে কিংবা গদ্যাংশের সীমিত পরিসরে বীজধর্মী কোনাে বক্তব্য ব্যাপক ভাবব্যঞ্জনা লাভ করে। সেই ভাববীজটিকে উনােচিত করার কাজটিকে বলা হয় ভাব-সম্প্রসারণ। ভাববীজটি সাধারণত রূপকধর্মী, সংকেতময় বা তৎপর্যপূর্ণ শব্দগুচ্ছের আবরণে প্রচ্ছন্ন থাকে। নানা দিক থেকে সেই ভাবটির ওপর আলােকসম্পাত করে তার স্বরূপ তুলে ধরা হয় ভাব-সম্প্রসারণে। ভাববীজটি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আমরা বুঝতে পারি, এ ধরনের কবিতার চরণে বা গদ্যাংশে সাধারণত মানবজীবনের কোনাে মহৎ আদর্শ, মানবচরিত্রের কোনাে বিশেষ বৈশিষ্ট্য, নৈতিকতা, প্রণােদনমূলক কোনাে শক্তি, কল্যাণকর কোনাে উক্তির তাৎপর্যময় ব্যঞ্জনাকে ধারণ করে আছে। ভাব-সম্প্রসারণ করার সময় সেই গভীর ভাবটুকু উদ্ধার করে সংহত বক্তব্যটিকে পূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে। সেই ভাব রূপক-প্রতীকের আড়ালে সংগুপ্ত থাকলে, প্রয়ােজনে যুক্তি, উপমা, উদাহরণ ইত্যাদির সাহায্যে বিশ্লেষণ করতে হবে।

ভাব-সম্প্রসারণের কিছু নিয়ম

ভাব-সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে কয়েকটি দিকের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া প্রয়ােজন। যেমন :

  • প্রদত্ত চরণ বা গদ্যাংশটি একাধিকবার অভিনিবেশসহকারে পড়তে হবে। লক্ষ্য হবে প্রচ্ছন্ন বা অন্তর্নিহিত ভাবটি কী, তা সহজে অনুধাবন করা।
  • অন্তর্নিহিত মূলভাবটি কোনাে উপমা, রূপক-প্রতীকের আড়ালে সংগুপ্ত আছে কিনা, তা বিশেষভাবে লক্ষ করতে হবে। মূলভাবটি যদি রূপক-প্রতীকের আড়ালে প্রচ্ছন্ন থাকে, তবে ভাব-সম্প্রসারণের সময় প্রয়ােজনে অতিরিক্ত অনুচ্ছেদ-যােগে ব্যাখ্যা করলে ভালাে হয়।
  • সহজ ভাষায়, সংক্ষেপে ভাবসত্যটি উপস্থাপন করা উচিত। প্রয়ােজনে যুক্তি উপস্থাপন করে তাৎপর্যটি উদ্ধার করতে হবে।
  • মূল ভাববীজকে বিশদ করার সময় সহায়ক দৃষ্টান্ত, প্রাসঙ্গিক তথ্য বা উদ্ধৃতি ব্যবহার করা চলে। এমনকি প্রয়ােজনে ঐতিহাসিক, পৌরাণিক বা বৈজ্ঞানিক তথ্যও উল্লেখ করা যায়। তবে ভুল বা অপ্রাসঙ্গিক তথ্য, ওয়ার চেয়ে না দেওয়াই ভালাে।
  • ভাব-সম্প্রসারণ করার সময় মনে রাখতে হবে যে, যেন বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি না ঘটে। বারবার একই কথা লেখা ভাব-সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে দূষণীয়। নিচে নমুনা হিসেবে কয়েকটি ভাব-সম্প্রসারণের উদাহরণ দেওয়া হলাে :

সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।

অপরের উপকার করেই মানবজীবন ধন্য ও সার্থক হয়। অন্যের উপকার সাধনই তাই সবার লক্ষ্য হওয়া উচিত। কেবল নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকলে চলবে না। চারপাশের মানুষের কথাও ভাবতে হবে, ভাবা উচিত। সমাজে বাস করতে হলে একে অপরের সুবিধা-অসুবিধার কথা চিন্তা করে চলতে হবে। কারণ পারস্পরিক সহযােগিতাই মানবজীবনের উন্নতির মূল। এই সহযােগিতা ছাড়া সুস্থ, সুন্দররূপে বাঁচা সম্ভব নয়। অন্যকে বঞ্চিত রেখে কেউ কখনাে বেশিদূর অগ্রসর হতে পারে না। তাই সংকীর্ণ ব্যক্তিস্বার্থ পরিহার করে বৃহত্তর মানুষের কথা ভাবতে হবে। সেখানেই রয়েছে মানবজীবনের সার্থকতা। অন্যের সুখে-দুঃখে, বিপদে-আপদে এগিয়ে যাওয়াই প্রত্যেকের কর্তব্য। প্রয়ােজনে নিজের স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে অন্যের জন্য জীবন উৎসর্গ করার মহৎ মানসিকতাই দিতে পারে বৃহত্তর মুক্তি। পুষ্পের ন্যায় পরার্থে জীবন উৎসর্গ করার মধ্যেই নিহিত রয়েছে জীবনের সার্থকতা। স্বার্থপর হয়ে কেউ পৃথিবীতে বাঁচতে পারে না। তাই পরের কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত করার মাধ্যমেই জীবনকে সার্থক ও ধন্য করা সম্ভব।

নানান দেশের নানান ভাষা
বিনা দেশী ভাষা মিটে কি আশা?

পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের কাছে তার মাতৃভাষা শ্রেষ্ঠ। অন্য ভাষা যতই সহজ হােক না কেন, মাতৃভাষা ছাড়া মনের ভাব উত্তমরূপে আর কোনাে ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। মাতৃভাষা যে-কোনাে মানুষের অস্তিত্ব ও আত্মপ্রকাশের অবিকল্প একটি বাহন। বিদেশি ভাষায় যতই দক্ষতা অর্জন করুক, মাতৃভাষার ন্যায় এমন সাবলীলভাবে মনের ভাব প্রকাশ করা বিদেশি ভাষায় সদ্য নয়। মাতৃভাষায় মনের ভাব প্রকাশ করতে মানুষ যতটা স্বাচ্ছন্দ্য বােধ করে এবং আনন্দ পায়, অন্য ভাষায় তা অসম্ভব। কারণ মাতৃভাষার সঙ্গে রয়েছে তার আত্মিক সম্পর্ক। এ সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। তার আনন্দ-বেদনা, আবেগ-আকাক্ষা, স্বপ্ন-কল্পনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মাতৃভাষা। মাতৃভাষা মানুষের অস্তিত্বের মহৎ অবলম্বন। তা দেশ ও জাতির সঙ্গে গড়ে তােলে অবিচ্ছেদ্য সাংস্কৃতিক বন্ধন। মাতৃভাষায় কথা বলে যে আনন্দ, আত্মতৃপ্তি আর প্রশান্তি অনুভব করা যায়, বিদেশি ভাষায় কথা বলে হৃদয়ের সেই তৃষ্ণা কিছুতেই মেটে না। মাতৃভাষাই মানুষের মত প্রকাশের সর্বোত্তম বাহন। মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, বিমূর্ত চেতনা মাতৃভাষার মাধ্যমেই সঠিক প্রতিমূর্তি লাভ করে। বিদেশি ভাষায় জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা করে মানুষ খ্যাতি অর্জন করতে পারে কিন্তু মাতৃভাষাই তার অস্তিত্বের আসল পরিচয়।

শৈবাল দিঘিরে বলে উচ্চ করি শির
লিখে রেখ এক ফোঁটা দিলেম শিশির।

পৃথিবীতে এমন কিছু লােক আছে, যারা উপকারীর উপকার স্বীকার করে না। বরং তারা সামান্য উপকার করতে পারলেই, দম্ভভরে তা প্রচার করে বেড়ায়। দিঘির বিশাল জলরাশির মধ্যে শৈবালের অবস্থান ও অস্তিত্ব। এই শৈবালের ওপর জমেছে ভােরের শিশির। শিশিরের ক্ষুদ্র ফোঁটা গড়িয়ে পড়েছে দিঘির অগাধ জলে। এই সামান্য শিশির-ফোটাকে শৈবাল দিঘির প্রতি তার মহৎ দান বলে গণ্য করছে। অথচ দিঘির বিশাল জলরাশির কাছে এক ফোঁটা শিশির অতি তুচ্ছ। দিঘির জলেই যার অস্তিত্ব, সেই দিঘির প্রতি শৈবালের এমন দম্ভোক্তি সত্যি হীনম্মন্যতার পরিচায়ক। শৈবালের মতাে মানবসমাজেও এমন অনেক অকৃতজ্ঞ লােক আছে, যারা পরের দয়া-দাক্ষিণ্য দু হাতে গ্রহণ করে কিন্তু সামান্য উপকার করতে পারলেই মনে করে আমি মহৎ কিছু করে ফেলেছি। প্রকৃতপক্ষে যিনি মহৎ এবং যথার্থ পরােপকারী তিনি অপরের উপকার করে কখনাে দম্ভ প্রকাশ করেন না। নিছক আত্মপ্রচারের জন্য নয়, বরং নিঃস্বার্থভাবেই তিনি পরের উপকার করেন। প্রতিদানের প্রত্যাশা নয়, মানবকল্যাণের জন্য নিঃস্বার্থভাবে পরের উপকার করাই মহৎপ্রাণ ব্যক্তির কাজ।

আলাে বলে, অন্ধকার, তুই বড় কালাে
অন্ধকার বলে, ভাই, তাই তুমি আলাে।

বৈপরীত্য আছে বলেই আমরা বস্তুর স্বরূপ উপলব্ধি করতে পারি। পৃথিবীতে মন্দ আছে বলেই ভালাের এত কদর। আলাে ও অন্ধকার—আপাতদৃষ্টিতে দুটোকে বিপরীত মনে হলেও আলাের স্বরূপ বুঝতে হলে অন্ধকারের প্রয়ােজন হয়। রাত্রি ও দিনের মধ্যে যদি কোনাে পার্থক্য না থাকত, একটানা আলাে বা একটানা অন্ধকার হলে আমরা রাত্রি ও দিনের কোনাে তফাত বুঝতে পারতাম না। ভালাে-মন্দ, সাদা-কালাে, ইতর-ভদ্র, সুজন-কুজন, পাহাড়-সমতল, মরুভূমি-সমুদ্র এসব প্রাকৃতিক বৈপরীত্যের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এ জগৎসংসার। এই বৈপরীত্যের স্বরূপ উপলদ্ধি করেই মানুষ বেছে নেয় সঠিক পথ ও পন্থা। তৈরি হয় বিবেচনাবােধ। তুলনার মধ্য দিয়ে কোনাে বস্তুর স্বরূপ অনুধাবন করা যায় সহজ। আলাে ও অন্ধকারের এ ঝগড়া অমূলক। আসলে ভালাে-মন্দ, আলাে-অন্ধকার একে অপরের পরিপূরক। অন্ধকার কালাে বলে তাকে নিন্দা করার কিছু নেই। কারণ, অন্ধকার আছে বলেই আলাের এত কদর।

যেখানে দেখিবে ছাই
উড়াইয়া দেখ তাই
পাইলেও পাইতে পারাে অমূল্য রতন

পৃথিবীতে কোনাে বস্তুকেই তুচ্ছজ্ঞান করা উচিত নয়। অতি তুচ্ছ বস্তুর মধ্যেও হয়তাে লুকিয়ে থাকতে পারে বিশাল কোনাে সম্ভাবনা। বস্তুর প্রয়ােজন বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে পরিবর্তিত হয়। কাজেই বস্তুর স্বাভাবিক অন্তর্নিহিত গুণের কথা চিন্তা করে সব জিনিসকেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা আবশ্যক। অতি ক্ষুদ্র বা তুচ্ছ কোন বস্তুর মধ্যেও লুকিয়ে থাকতে পারে এমন কিছু শক্তি বা সম্ভাবনা, যা মানুষকে পৌঁছে দিতে পারে উন্নতির চরম শিখরে। মানুষ সাধারণত বড় বা মূল্যবান জিনিসের প্রতি মােহাবিষ্ট হয়ে পড়ে এবং ছােট ও নগণ্য জিনিসকে তুচ্ছ জ্ঞান করে অবহেলা করে। আসলে তা উচিত নয়, কারণ অনেক ক্ষুদ্র বা তুচ্ছ বস্তুর মধ্যেও অনেক মূল্যবান জিনিস লুকিয়ে থাকতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, স্বর্ণকার যে ছাই ফেলে দেয়, তা ধুয়েও স্বর্ণকণা পাওয়া যায়। প্রকৃতপক্ষে ছাই বলতে বােঝানাে হয়েছে পৃথিবীর তাবৎ তুচ্ছ অথচ মূল্যবান বস্তুকে। ক্ষুদ্র বলে কোনাে বস্তুকে তুচ্ছজ্ঞান করা উচিত নয়। প্রয়ােজনে ক্ষুদ্র বস্তুকে যাচাই-বাছাই, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা উচিত।

পরের অনিষ্ট চিন্তা করে যেইজন।
নিজের অনিষ্ট বীজ করে সে বপন।

অন্যের ক্ষতিসাধন করতে গিয়ে অনেক সময় মানুষ নিজের সর্বনাশ ডেকে আনে। তাই জেনেশুনে অন্যের ক্ষতি করার চেষ্টা করা উচিত নয়। একে অপরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে যে সমাজ গড়ে উঠেছে, সেখানে কল্যাণচিন্তাই প্রধান। যে মানুষ সর্বদা অন্যের উপকারের কথা ভাবে, সে সমাজে সম্মানিত হয়। অপরদিকে, যে ব্যক্তি সর্বদা অন্যের ক্ষতির চিন্তা করে, সে অবশ্যই হীনমন্য। অন্যের অনিষ্ট করার চিন্তা করতে করতে তার মন ছােট হয়ে যায়। মানুষ হিসেবে সে হয়ে পড়ে ক্ষুদ্র, নিকৃষ্ট। খারাপ চিন্তার কারণে তার চিত্তে শান্তি থাকে না, শুদ্ধি আসে না। ফলে সে কর্মক্ষেত্রেও উন্নতি করতে পারে না। পার্থিব কর্মের ফল মানুষ কোনাে না কোনােভাবেই পৃথিবীতে পেয়ে যায়। তাই এ ধরনের ব্যক্তিকে নিজ জীবনেই ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। বিশ্বের মহৎ ব্যক্তিরা সবসময় অপরের কল্যাণ চিন্তা করেছেন। পরার্থে জীবন’ এই মহান বাক্যে তারা সর্বদা ছিলেন নিবেদিত। কথায় বলে, ফুল আপনার জন্য ফোটে না। অন্যের জীবন সুন্দর এবং সুবাসিত করার জন্যই ফুল ফোটে। অপরের উপকার সাধন করার মধ্যেই রয়েছে জীবনের সার্থকতা। তাই অপরের অনিষ্ট চিন্তা করা উচিত নয়। অপরের ক্ষতি করার চিন্তার মধ্যেই রয়েছে নিজের অপরিণামদর্শী ক্ষতির আশঙ্কা।

যাহা চাই তাহা ভুল করে চাই।
যাহা পাই তাহা চাই না।

মানুষের চাওয়া-পাওয়ার কোনাে শেষ নেই। প্রাপ্তিতে তার কোনাে তৃপ্তি হয় না। কাক্ষিত বস্তু তার ভাগ্যে জোটে না, অথচ যা পায়, তা সে চায় না। পৃথিবীতে চাওয়া-পাওয়া নিয়ে মানুষের রয়েছে নিরন্তর দ্বন্দ্ব। কাক্ষিত বস্তু বা একান্ত মনােবাঞ্ছা তার কোনােদিন পূরণ হয় না। কঠিন-কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে যা সে পায়, তা হয়তাে তার মােটেই কাক্ষিত ছিল না। না পাওয়ার বেদনা তার আকাঙ্ক্ষাকে আরাে তীব্র করে তােলে। অর্থ-সম্পদ, বিলাসের মধ্যে কিছুদিন কাটাবার পর বৈরাগ্যের জন্য কারাে মন আকুলি-বিকুলি করে ওঠে। আবার বৈরাগ্যের বিশুষ্ক জীবন কিছুদিন কাটানাের পর তার মন ছুটে যায় ভােগের আনন্দময় জীবনের দিকে। মানুষের মনের এ অস্থিরতা, এ চিত্তচাঞ্চল্য তাকে কখনাে স্থির হতে দেয় না। সে যে সত্যিকার অর্থে কী চায়, তা সে নিজেও জানে না। তাই মানুষ তার কাম্যবস্তু পেয়ে কখনাে পরিতৃপ্তি অর্জন করে না। এটা মানবমনের চিরন্তন বৈশিষ্ট্য। চাওয়া-পাওয়ার এ দ্বন্দ্ব তাকে সারাজীবন যন্ত্রণা দেয়, ব্যথিত করে, তাকে সুখ দেয় না। মানব হৃদয়ে চাওয়া-পাওয়ার দ্বন্দ্ব চিরন্তন। সাধ এবং সাধ্য, চাওয়া এবং পাওয়ার যােগফল কখনাে মেলে। প্রাপ্তিতেও তার পরিতৃপ্তি নেই। ভুল চাওয়ার পেছনে সারাজীবন হেঁটে মনে হয়, যা পাওয়ার কথা ছিল তা সে পায়নি, যা পেয়েছে, তা সে চায়নি।

গ্রন্থগত বিদ্যা পর হস্তে ধন
নহে বিদ্যা, নহে ধন, হলে প্রয়ােজন।

বিদ্যা ও ধন, এ দুটো মানুষের জীবনে খুবই প্রয়ােজন। এ দুটোকে কঠোর পরিশ্রম ও সাধনা করে অর্জন করতে হয়। প্রয়ােজনের মুহূর্তে এ দুটো কাজে না লাগলে বিদ্যা ও ধন দুটোই অর্থহীন বােঝার মতাে মনে হয়। বিদ্যা ও জ্ঞান মানুষ পরিশ্রম করে আত্মস্থ করে। বাস্তব ও ব্যবহারিক জীবনে সেই বিদ্যাকে কাজে লাগিয়ে উপকৃত হয়। এটাই প্রত্যাশিত। অনুরূপভাবে ধনসম্পত্তি মানুষ কঠিন পরিশ্রম করে অর্জন করে এ জন্য যে, তা প্রয়ােজনের সময় কাজে লাগিয়ে বিপদ থেকে উদ্ধার পাবে, নিজেকে বিপদমুক্ত করতে পারবে। কিন্তু প্রয়ােজনের সময় সেই ধন যদি অন্যের হাতে থাকে, নিজের কাজে লাগাতে না পারে, তখন সেই ধনের কোনাে মূল্য থাকে না। মুখস্থ বা গ্রন্থগত বিদ্যাও ঠিক সেরকম, বাস্তব জীবনে মুখস্থ বা গ্রন্থগত বিদ্যাও কোনাে কাজে আসে না। বিদ্যা ও ধনের সার্থকতা নির্ভর করে মানুষের প্রয়ােজন মেটানাের ওপর। প্রয়ােজনের মুহূর্তে কাজে না লাগলে এ দুটোরই কোনাে মূল্য নেই। তাই বিদ্যা ও ধনকে আয়ত্তাধীন রেখে সেগুলির সদ্ব্যবহার করতে হবে।

দেশের উপকারে নেই যার মন।
কে বলে মানুষ তারে? পশু সেইজন।

স্বদেশ ও স্বজাতির উপকার সাধন মানুষের অন্যতম কর্তব্য। কিন্তু যে ব্যক্তি স্বদেশের উপকার সাধনে দ্বিধাগ্রস্ত, স্বদেশ ও স্বজাতির বিপদে যার প্রাণ কাঁদে না, সে মানুষ হয়েও পশুর সমান। দেশপ্রেম ইমানের অঙ্গ। দেশ সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করার মধ্যেই মানবজীবনের সার্থকতা নিহিত। যে দেশে মানুষ জন্মগ্রহণ করে, সে দেশের কল্যাণ ছাড়া যে অকল্যাণ চিন্তা করে, সে সত্যিকার মানুষ হতে পারে না। পশু আর তার মধ্যে কোনাে পার্থক্য নেই। মানুষ হয়েও কেউ যদি জন্মভূমির কল্যাণে কাজ না করে, উল্টো স্বদেশের ক্ষতি করে, মা-মাটির বিরুদ্ধে কাজ করে, তবে স্বদেশও একসময় তার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। সত্যিকার দেশপ্রেমিক মানুষ দেশের মাটি ও মানুষকে নিয়ে সবসময় ভাবে এবং তাদের উপকার সাধনে সে দৃঢ়সংকল্প। কিন্তু যারা আত্মকেন্দ্রিক, কেবল নিজের স্বার্থচিন্তায় বিভাের থাকে, তারা মানুষ নামের কলঙ্ক। দেশপ্রেমহীন বিবেকবর্জিত এ মানুষগুলাে পশুর তুল্য। পশুর যেমন থাকা-খাওয়া ছাড়া অন্য কোনাে চিন্তা থাকে। উপলদ্ধিহীন, বিবেকবর্জিত এ মানুষগুলােও তেমনি। দেশপ্রেমহীন মানুষ তাই পশুর নামান্তর। সত্যিকারের মানুষ হতে হলে অবশ্যই দেশকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালােবাসতে হবে। দেশপ্রেমহীন মানুষ প্রকৃতপক্ষে পশুর সমান।

কতবড় আমি, কহেনকল হীরাটি
তাই তাে সন্দেহ করি নহ ঠিক খাঁটি।

মিথ্যা পরিচয় নিয়ে যারা বড়াই করে, তাদের গর্ব ঠুনকো। আর যারা প্রকৃত অর্থে বড়, তারা নিরহংকার ও বিনয়ী হয়। মিথ্যা, ভিত্তিহীন পরিচয়ের অহংকার নিয়ে বেশিদিন চলা যায় না। একদিন না একদিন তার আসল পরিচয় ধরা পড়বেই। তখন তার অহংকার চূর্ণ হয়ে কচুপাতার পানির মতাে গড়িয়ে পড়ে। হীরা খুবই মূল্যবান জিনিস। কিন্তু নকল হীরার সেই মূল্য নেই। আসল বা খাটি হীরার মতাে সে যদি নিজেকে মহামূল্যবান ভেবে অহংকার করে, তবে তার দর্প চূর্ণ হতে বাধ্য। আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষ আছে, যারা সত্যিকার অর্থে খুবই তুচ্ছ, নিকৃষ্ট, হীনচিত্ত; কিন্তু অহমিকায় অন্ধ হয়ে তারা বাইরে প্রচার করে যে তারা অনেক বড়। শুধু তাই নয়, অনেক সময় হীনচিত্তের এ মানুষগুলাে নকল হীরের মতাে আমাদের সমাজের মধ্যমণি হয়ে ওঠে। কিন্তু অন্যকে তুচ্ছজ্ঞান করে মিথ্যা পরিচয় দিয়ে বেশিদূর অগ্রসর হওয়া যায় না। একদিন তাদের সত্যিকার মুখোেশ বেরিয়ে পড়ে। তখন তাদের মুখ লুকোবার জায়গা থাকে। যার গুণ আছে তার সুনাম এমনিতেই প্রকাশ পায়। তার পরিচয় জাহির করার প্রয়ােজন হয় না। পক্ষান্তরে, মিথ্যা পরিচয়ে যে অহংকার করে, একদিন তার সত্য পরিচয় উন্মােচিত হলে সে লজ্জিত হয়।

পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি

কোনােকিছু অর্জন করতে হলে নিরলস পরিশ্রম ও একনিষ্ঠ সাধনার কোনাে বিকল্প নেই। পরিশ্রম করেই বিরূপ ভাগ্যকে করায়ত্ত করতে হয়। ভাগ্যে বিশ্বাসী লােক অলস এবং শ্রমবিমুখ হয়। ভাগ্যে থাকলে পাব’— এই আশায় কেউ বসে থাকলে জীবনে তার কোনাে উন্নতি হবে না। আসলে সৌভাগ্য নিয়ে কেউ পৃথিবীতে আসে না। কঠিন, কঠোর পরিশ্রম করেই বিরূপ ভাগ্যকে জয় করতে হয়। লক্ষ্য স্থির করে, সঠিক পদ্ধতিতে পরিশ্রম করলে সৌভাগ্য আপনা-আপনি ধরা দেয়। পৃথিবীতে এ পর্যন্ত যারা সফল হয়েছেন, তাদের সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে পরিশ্রমের জাদু। কৃষক ভাগ্যের ওপর বসে থেকে ফসল ফলায় না, তাকে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফসল উৎপন্ন করতে হয়। তেমনি পরিশ্রম ছাড়া দুনিয়াতে ভালাে কিছু অর্জিত হয় না। আধুনিক বিশ্বের উন্নত দেশগুলাের দিকে তাকালে কিংবা তাদের ইতিহাস পর্যালােচনা করলে দেখা যায়, তারা নিরলস পরিশ্রম করেই উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছেছে। একমাত্র শ্রমশক্তিই তাদেরকে কাক্ষিত সাফল্যের স্বর্ণদ্বারে পৌছে দিয়েছে। অন্যদিকে শ্রমবিমুখ, অলস কত যুবক বেকার হয়ে অভিশপ্ত জীবন কাটাচ্ছে। জীবনে সফলতা অর্জনের জন্য পরিশ্রম অপরিহার্য। যে জাতি যত পরিশ্রমী, সে জাতি তত উন্নত। তাই অযথা ভাগ্যের পেছনে না দৌড়ে, লক্ষ্য স্থির করে সঠিক পদ্ধতিতে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করা উচিত।

চরিত্র মানুষের অমূল্য সম্পদ

চরিত্রের গুণেই মানুষ মর্যাদাবান হয়ে ওঠে। চরিত্রহীন ব্যক্তিকে সবাই ঘৃণা করে। চরিত্র মানবজীবনের মুকুটস্বরূপ। মানুষের সামগ্রিক আচরণের সমষ্টিই তার চরিত্র। একজন মানুষ কতটা ভালাে বা কতটা মন্দ তা শনাক্ত করা হয় তার সামগ্রিক চরিত্র দিয়েই। স্বকীয় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের গুণে মানুষ মর্যাদা লাভ করে, সমাদৃত হয়। চরিত্র ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য। নারীদের ক্ষেত্রে অলংকার যেমন তার রূপের মাধুর্যকে বাড়িয়ে দেয়, তেমনি ব্যক্তির আচার-আচরণ, কথাবার্তা, রুচি, জ্ঞান ও বুদ্ধি, সততা, ন্যায়নিষ্ঠা ইত্যাদি তার চরিত্রের অমূল্য সম্পদ। সুন্দর ও শােভন চরিত্রের মানুষকে সবাই শ্রদ্ধা করে, ভালােবাসে, মর্যাদা দেয়। অপরদিকে চরিত্রহীন ব্যক্তিকে কেউ বিশ্বাস করে না, মর্যাদাও দেয় না। লক্ষ টাকার সম্পদ নষ্ট হলেও তা আবার ফিরে পাওয়া সম্ভব, কিন্তু চরিত্র একবার হারালে তা কোটি টাকার বিনিময়েও ফেরত পাওয়া সম্ভব নয়। এ জন্য চরিত্রকে অমূল্য সম্পদের সঙ্গে তুলনা করা হয়। পার্থিব ধনসম্পদের চেয়ে চরিত্রের মূল্য অনেক বেশি। মানবজীবনে চরিত্রের মতাে বড় অলংকার আর কিছু নেই। চরিত্রকে তাই মাথার মুকুটের সঙ্গে তুলনা করা হয়।

শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড

মেরুদণ্ড ছাড়া যেমন কোনাে প্রাণী উঠে দাঁড়াতে পারে না, তেমনি শিক্ষা ছাড়া কোনাে জাতি উন্নতির শিখরে আরােহণ করতে পারে না। শিক্ষা জাতির প্রধান চালিকাশক্তি। শিক্ষাহীন মানুষ পশুর সমান। নিরক্ষর মানুষ সমাজের জন্য শুধু বােঝা নয়, দেশের অগ্রগতির পথেও বাধাস্বরূপ। কারণ, শিক্ষা মানুষকে কর্মদক্ষ ও সচেতন নাগরিক হতে সাহায্য করে। দেশ ও জাতির উন্নয়নের জন্য দরকার সচেতন ও কর্মদক্ষ মানুষ। মেরুদণ্ডহীন প্রাণী যেমন সােজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, তেমনি শিক্ষা ছাড়া কোনাে জাতিই পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাড়াতে পারে না। এ জন্য শিক্ষাকে মেরুদণ্ডের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। পৃথিবীতে যে জাতি যত বেশি শিক্ষিত সে জাতি তত বেশি উন্নত। শিক্ষা মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রধান সােপান। আত্মশক্তি অর্জনের প্রধান উপায় শিক্ষা। তাই জাতির উন্নয়নের জন্য শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। শিক্ষাকে সহজলভ্য ও সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে। মনে রাখতে হবে শিক্ষা সুযােগ নয়, অধিকার।

নাম মানুষকে বড় করে না, মানুষই নামকে বড় করে তােলে।

প্রতিটি মানুষের ভেতরেই রয়েছে অমিত সম্ভাবনা। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও প্রতিভাবান মানুষ সেই অমিত সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে হতে পারেন স্মরণীয়, বরণীয়। ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম স্বাক্ষরিত করতে পারেন স্বর্ণাক্ষরে।। সুন্দর নাম মানুষকে সুন্দর করে না, দেয় না কোনাে খ্যাতি বা সুনাম। বরং সৎকর্মের জন্যই মানুষের নাম ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকে। কারণ, মানুষের চূড়ান্ত পরিচয় ও ভূমিকা মূল্যায়িত হয় তার কৃতকর্মের দ্বারা। রবীন্দ্রনাথ বিখ্যাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলেই তিনি স্মরণীয় নন, পারিবারিক পরিচয় ছাপিয়ে রবীন্দ্রনাথ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন তার অনন্য সাহিত্যকর্মের জন্যে। অনুরূপভাবে নজরুল জন্মগ্রহণ করেছিলেন একটি সাধারণ দরিদ্র পরিবারে, কিন্তু অসামান্য অবদানের জন্য নজরুলের নাম আজ ইতিহাসের পাতায় অবিস্মরণীয় হয়ে আছে। এ উদাহরণ থেকে বােঝা যায়, মানুষই তার নামকে মহিমান্বিত করতে পারে মহৎ সাধনা কিংবা কীর্তিময় কাজের জন্য। একটা গানে আছে—

নামের বড়াই কোরাে নাকো
নাম দিয়ে কী হয়
নামের মাঝে পাবে নাকো
সবার পরিচয়

অর্থাৎ কোনাে কীর্তি না থাকলে কারাে নাম মানুষ স্মরণ করে না। ক্ষণস্থায়ী জীবনকে মানুষ মহিমান্বিত করতে পারে তার সকর্ম বা মহৎ অবদানের মধ্য দিয়ে। মহৎ কীর্তির বলেই মানুষের নাম দেশকালের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।

দুর্নীতি জাতীয় জীবনের সকল উন্নতির অন্তরায়

নীতিহীনতাই দুর্নীতি। নীতিহীন ব্যক্তি স্বার্থ-অন্ধ। এ ধরনের ব্যক্তি দেশ ও জাতির জন্য ক্ষতিকর। তারা দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। নৈতিকভাবে উন্নত, সৎ, বিবেকবান মানুষ যে পদেই থাকুন না কেন, তিনি সমাজ ও দেশের বড় সম্পদ। তাঁকে দিয়ে উপকার না হলেও অন্তত ক্ষতি হবার সম্ভাবনা থাকে না। অপরদিকে নৈতিক যতই উচ্চ আসনে অবস্থান করক না কেন, তিনি মােটেও শ্রদ্ধার পাত্র নন। পদ মর্যাদার হয়তাে মানুষ সামনে কিছু বলে না কিন্তু পেছনে অন্তর থেকে ঘৃণা করে। তার দ্বারা ক্ষতির আশঙ্কাও বেশি। কারণ, তিনি স্বার্থ-অন্ধ, বিবেকবর্জিত। তিনি সবসময় নিজের স্বার্থ সিদ্ধির মতলবে থাকেন। স্বার্থ-অন্ধ ব্যক্তি নিজের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার কাজেই ব্যস্ত থাকেন। সমাজের কল্যাণ, দেশের মঙ্গলের কথা তিনি ভাবেন না। জাতীয় জীবনের উন্নতি, সমৃদ্ধির কথা ভাবতে তার বিবেক সায় দেয় না। এজন্য বিবেকবর্জিত, দুর্নীতিগ্রস্ত লােক দেশের সকল উন্নতির পথে বাধাস্বরূপ। দুর্নীতি বাংলাদেশের প্রধান অভিশাপ। বেশ কয়েকবার বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ছিল লজ্জাজনক অবস্থান। আমাদেরকে এ কলঙ্কজনক অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। যে দেশের জনগণ রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করতে পেরেছে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেও তাদের বিজয়ী হতে হবে। তাহলেই দেশের উন্নতি ও অগ্রগতি সম্ভব হবে।

প্রাণ থাকলে প্রাণী হয়, কিন্তু মন না থাকলে মানুষ হয় না

যার বিবেক ও বুদ্ধি আছে সে-ই মানুষ, পশুদের তা নেই। মানুষ হতে হলে চাই প্রশস্ত মন। চাই মানবীয় গুণাবলির অধিকারী হওয়া। মানুষ আর অন্য প্রাণীর মধ্যে পার্থক্য কেবল প্রাণের দিক থেকে নয়, মনের দিক থেকে। অন্য প্রাণীরা জন্মসূত্রেই প্রাণী কিন্তু মানুষ জন্মসূত্রে মানুষ হয়ে উঠতে পারে না। তাকে মানুষ হওয়ার জন্য, মানবীয় বৈশিষ্ট্য অর্জন করার জন্য চেষ্টা করতে হয়। যে মানুষ ভালাে-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় বিবেচনা করতে পারে এবং মহৎ মানবীয় গুণাবলি অর্জন করে, সে যথার্থ মনুষ্যত্বের অধিকারী হতে পারে। মনের বিকাশের মাধ্যমে মানুষ মহৎ গুণাবলি অর্জন করতে পারে এবং যথার্থ মানুষের মর্যাদা পায়। তাই শুধু প্রাণ নয়, মনই মানুষকে মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। বিকশিত চৈতন্য আর মনের সৌন্দর্যপৃহাই মানুষকে অন্য প্রাণী থেকে শ্রেষ্ঠ ও আলাদা করেছে। মানুষ এবং অন্য প্রাণীর মধ্যে তফাত হচ্ছে : মানুষের বিবেক, বুদ্ধি, ন্যায়-অন্যায় বােধ, সুন্দর-অসুন্দর বােধ, মহানুভবতা, ভালােবাসার ক্ষমতা ইত্যাদি গুণাবলি রয়েছে, কিন্তু পশুদের তা নেই। মানবমনের এ শক্তিই তাকে অন্য প্রাণী থেকে পৃথক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী করেছে।

কীর্তিমানের মৃত্যু নেই।
অথবা
মানুষ বাঁচে তার কর্মের মধ্যে, বয়সের মধ্যে নহে।

দীর্ঘদিন বেঁচে থেকে অনেকে পৃথিবীতে স্মরণীয় হতে পারে না। বরং সংক্ষিপ্ত জীবন যাপন করেও অনেকে ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছেন তাদের স্মরণীয় কীর্তির জন্যে। এ নশ্বর পৃথিবীতে কেউ চিরদিন বেঁচে থাকে না। একদিন না একদিন তাকে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হয়। মৃত্যু অমােঘ জেনেও এ সংক্ষিপ্ত জীবনে কেউ কেউ মানবকল্যাণে এমন কিছু কীর্তি রেখে যান, মৃত্যুর পরও যারা মানুষের হৃদয়ে চিরকাল অমর হয়ে থাকেন। সাধারণ মানুষের মৃত্যু হলে পৃথিবীতে কেউ তাকে আর স্মরণ করে না। অথচ কীর্তিমানের মৃত্যু হলে তার শরীরের অবসান হয় বটে কিন্তু তার মহৎ কাজ, অম্লান কীর্তি তাকে বাঁচিয়ে রাখে। কীর্তিমান মানুষের মৃত্যুর শত শত বছর পরেও মানুষ তাকে স্মরণ করে। বায়ান্নর মহান ভাষা-আন্দোলনে শহীদ সালাম, বরকত, রফিক, শফিক, কিংবা মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ শহীদ বাংলার মানুষের হৃদয়ে চিরকাল অমর হয়ে থাকবে। তাঁদের অম্লান কীর্তি বাঙালি চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। মানুষের দেহ নশ্বর কিন্তু মহৎ কীর্তি অবিনশ্বর। মৃত্যুর শত শত বছর পরেও কীর্তিমান মানুষের অমর অবদানের কথা মানুষ স্মরণ করে। তাই বলা হয়, কীর্তিমানের মৃত্যু নেই।

স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষাকরা কঠিন।

পরাধীন জাতি বােঝে স্বাধীনতার মর্ম কী। রক্ত ও প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করা হয়তাে সহজ, কিন্তু সেই স্বাধীনতা রক্ষা করা তার চেয়ে বেশি দুরূহ। পরাধীন হয়ে কোনাে মানুষ বেঁচে থাকতে চায় না। তাই মানুষ স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করে, সংগ্রাম করে, যুদ্ধ করে। অনেক অমূল্য জীবন বিসর্জন দিয়ে এবং রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমেই কেবল স্বাধীনতা অর্জিত হতে পারে। স্বাধীনতা অর্জিত হলেই সংগ্রাম শেষ হয়ে যায় না। তখন বিজয়ী জাতির সামনে আসে স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রাম। সে সংগ্রাম আরাে বেশি কঠিন। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় শত্ৰু চিহ্নিত থাকে, তাই তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করাও সহজ, কিন্তু স্বাধীনতার পর প্রকৃত শত্রুদের চেনা যায় না। তাই তাদের দমন করা খুব দুরূহ হয়ে পড়ে। স্বাধীন দেশের ভেতরের শত্রু আর বাইরের শত্রু একত্রিত হয়ে যে-কোনাে সময় স্বাধীনতা নস্যাৎ করে দিতে পারে। সুতরাং প্রতিক্রিয়াশীল, হিংসাত্মক তৎপরতা থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য প্রয়ােজন হয় সতর্ক নজরদারি। পরাধীন জাতি অনেক সংগ্রাম, ত্যাগ-তিতিক্ষা আর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতার গৌরবময় সূর্যকে অর্জন করে। জাতির যে-কোনাে দুর্বলতার সুযোেগ নিয়ে যেন পরাজিত শত্রু স্বাধীনতার সেই সূর্যকে ছিনিয়ে নিতে না পারে, সে ব্যাপারে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।

দুর্জন বিদ্বান হইলেও পরিত্যাজ্য

দুর্জন মানে দুষ্ট-প্রকৃতির লােক। এ ধরনের মানুষ বিদ্বান হলেও অবশ্যই পরিত্যাজ্য। দুষ্ট লােক দেশ ও সমাজের শত্রু। তারা বিদ্বান হলেও লােকে তাদের ঘৃণা করে। বিদ্যা মানুষের অমূল্য সম্পদ। বিদ্বান ব্যক্তি সর্বত্র সম্মানিত। কিন্তু বিদ্বান ব্যক্তি যদি চরিত্রবান না হন, বরং দুষ্ট-প্রকৃতির হন, তবে তার কাছ থেকে দূরে থাকাই মঙ্গলজনক। কারণ, শিক্ষিত অথচ দুশ্চরিত্র লােক সবচেয়ে ভয়াবহ। যে-কোনাে মুহূর্তে এ ধরনের লােক নৃশংসতম কাজটি করতে পারে। বিদ্যা যার চরিত্রকে সংশােধন করতে পারেনি, তাকে দিয়ে মানুষের কোনাে কল্যাণ হতে পারে না। দুর্জন ব্যক্তি সাপের সাথে তুলনীয় এবং তার অর্জিত বিদ্যা সাপের মাথার মণির সঙ্গে তুলনীয়। সাপকে মানুষ ভয় করে। কারণ যেকোনাে সময় সাপ তার ছােবল দিয়ে প্রাণনাশ করতে পারে। তেমনি বিদ্বান হয়েও যিনি দুর্জন, তার কাছ থেকে যে-কোনাে সময় ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। এ ধরনের ব্যক্তির সান্নিধ্য কেউ কামনা করে না। সকলেই তাকে ঘৃণা করে। চরিত্র মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। বিদ্বান ব্যক্তি দুশ্চরিত্র হলে সে অমানুষে পরিণত হয়। তাই শিক্ষিত হলেও চরিত্রহীন দুর্জন ব্যক্তির সাহচর্য থেকে দূরে থাকা উচিত।

বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে।

সৌন্দর্য মােটেই নিরপেক্ষ নয়। স্থান-কাল-পাত্রের ওপর সৌন্দর্যের পূর্ণতা নির্ভর করে। যে জিনিস যে স্থানে থাকা উচিত, সেখানে থাকলে শুধু যে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হয় তা নয়, দেখতে সুন্দরও লাগে। যথার্থ স্থানেই বস্তুর স্বাভাবিক বিকাশ হয়। অস্থানে, কৃত্রিমভাবে যতই তাকে পরিচর্যা করা হােক তার স্বাভাবিক বিকাশ ও বৃদ্ধি ঘটবে না। পাখিকে যতই সােনার খাচায় রেখে বুলি শেখানাে হােক, সেটা পাখির জন্য কারাগার, মানুষের জন্যও অসুন্দর। তেমনি, মায়ের কোলে একটি শিশু যেমন ফুলের মতাে স্বাভাবিক, অন্যের কোলে তেমন নয়। ফুল যতক্ষণ গাছের ডালে প্রস্ফুটিত, ততক্ষণ তার মধ্যে স্বর্গীয় সৌন্দর্য থাকে, কিন্তু বোঁটা থেকে ছিড়লে ফুলের সেই স্বাভাবিক সৌন্দর্য আর থাকে না। এ জন্য বলা হয়, যার যে স্থান, তাকে সে স্থানে থাকতে দাও। যার যে কাজ, তাকে সে কাজ করতে দাও। তাকে স্থানান্তর করলে সৌন্দর্যের অবলুপ্তি ঘটে। স্বাভাবিক স্থানে বস্তুর স্বাভাবিক বিকাশ ঘটে। তাকে স্থানান্তর করলে পরিবেশের ভারসাম্য যেমন নষ্ট হয়, তেমনি সৌন্দর্যেরও হানি ঘটে।

পুষ্প আপনার জন্য ফোটে না

ভােগে নয়, ত্যাগেই মানুষের প্রকৃত সুখ ও মুক্তি। অন্যের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করার মধ্যেই রয়েছে মানবজীবনের সার্থকতা। মানুষকে তার অর্জিত গুণাবলি আত্মস্বার্থে ব্যয় করলে চলে না, পরের জন্য ভাবতে হয়। ফুল যখন গাছের ডালে ফোটে, তখন তার সৌন্দর্য রূপপিয়াসী মানুষকে মুগ্ধ করে, মধুলােভী মৌমাছিকে করে আকর্ষণ । মানুষ প্রশংসা করে তার সৌন্দর্যের, ঘ্রাণ নিয়ে মুগ্ধ হয়। মেয়েরা খোঁপায় গোঁজে, সাজায় ফুলদানিতে। মধুকর পান করে ফুলের মধু, গড়ে তােলে মৌচাক। এভাবে একসময় ফুল শুকিয়ে যায়, ঝরে পড়ে। অপরের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করে ফুল তার জীবন সার্থক করে তােলে। পৃথিবীর বুকে এমন অনেক মহপ্রাণ ব্যক্তি আছেন, যাঁরা ফুলের মতােই অন্যের কল্যাণে নিজের মেধা, জ্ঞান, শ্রম, এমনকি মূল্যবান জীবনকে উৎসর্গ করে গেছেন। ইতিহাসের পাতায় তারাই স্মরণীয়-বরণীয় হয়ে আছেন। বস্তুত নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকা মানুষের গুণ নয়, স্বার্থসর্বস্ব পশুর বৈশিষ্ট্য। আমরা প্রত্যেকেই পৃথিবীতে এসেছি একে অপরের জন্য জীবনধারণ করে সার্থক হতে, মনুষ্যত্বের মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখতে। ফুলের জীবনের কাছে মানুষের অনেক কিছু শেখার আছে। ফুল অন্যের জীবন সাজাতে, সুন্দর করতে, সৌরভময় করতে নিজের জীবন উৎসর্গ করে। পরার্থে জীবন উৎসর্গ করতে পারলে, মানুষের জীবনও ফুলের মতাে সুন্দর ও সৌরভময় হয়ে উঠতে পারে।

আত্মশক্তি অর্জনই শিক্ষার উদ্দেশ্য

শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য মানুষের কর্মশক্তি অর্জন ও মনুষ্যত্বের বিকাশ। মানুষের মনােদৈহিক ক্ষমতাগুলােকে বিকশিত করা। অর্থ উপার্জনই শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। যদিও বর্তমান যুগে ভালাে ফলাফল করার উদ্দেশ্য হলাে ভালাে একটি চাকরি পাওয়া এবং অধিক অর্থ উপার্জন করা, কিন্তু এতে শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য নষ্ট হয়ে যায়। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য থেকে মানুষ অনেক দূরে সরে যায়। মানবসম্পদ উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে শিক্ষার প্রচলন হয়েছে। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য হলাে মানুষের বােধবুদ্ধি, বিবেক জাগ্রত করা, ভেতরের শক্তি ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে সমাজ এবং সভ্যতার বৃহত্তর কল্যাণ সাধন করা। কেননা, মানুষ জন্মসূত্রে মানুষ নয়, তাকে মনুষ্যত্ব অর্জন বা মানুষ হওয়ার জন্য চেষ্টা করতে হয়। শিক্ষার মাধ্যমেই কেবল মনুষ্যত্ব অর্জন করা সম্ভব। এ জন্য বলা হয়ে থাকে, সুশিক্ষিত ব্যক্তিমাত্রই স্বশিক্ষিত। একজন শিক্ষিত মানুষ অন্যের থেকে আলাদা হয়ে ওঠে তার মার্জিত আচরণ, উন্নত চিন্তা, কর্তব্যনিষ্ঠা, ন্যায়পরায়ণতা, সততা ইত্যাদি চারিত্রিক গুণাবলির কারণে। এগুলাে মানুষের মানবিক গুণ, আত্মগত শক্তি। শিক্ষা মানুষকে এ সমস্ত সামর্থ্যের অধিকারী করে তােলে। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য মানুষের ভেতরের সক্ষমতাগুলাে সক্রিয় করা। সুপ্ত মনােদৈহিক শক্তিগুলােকে জাগ্রত করা। অপ্রকাশিত মানবিক গুণগুলােকে বিকশিত করা। কিন্তু বর্তমান যুগে মানুষ শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য থেকে অনেক দূরে সরে গেছে।

ভােগে নয়, ত্যাগেই প্রকৃত সুখ

বাস্তব জীবনে মানুষ ভােগকে অধিক গুরুত্ব দেয়। মনে করে ভােগের মধ্যেই জীবনের সর্বসুখ। কিন্তু ত্যাগই প্রকৃত সুখের আকর। মানুষ লােভের কাছে পরাজিত। কামনায় পরাভূত। প্রবৃত্তির দাস হয়ে জীবনের সার্থকতা খোঁজে মানুষ। ভােগের আসক্তিতে নিমজ্জিত মানুষের মধ্যে কেবল ভােগের আকাক্ষা বাড়তে থাকে। অধিক ভােগ করেও তার তৃপ্তি মেটে না। আত্মমুক্তি ঘটে না হৃদয়ের। এভাবে ভােগের শৃঙ্খলে বন্দি মানুষ নিজের সর্বনাশ ডেকে আনে। ভােগের বশবর্তী মানুষ পশুর স্তরে নেমে যায়। তার মধ্যে মনুষ্যত্ব থাকে না। অন্যদিকে ত্যাগের মাধ্যমে মানুষ খুব সহজেই স্বীয় মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ত্যাগের বিনিময়ে মানুষ পায় শ্রদ্ধা, ভালােবাসা, সম্মান। স্বার্থত্যাগকারী মানুষের কাছে উপকৃত মানুষের কৃতজ্ঞতার থাকে না। তাই ত্যাগই মানুষের সর্বোচ্চ আদর্শ হওয়া উচিত। ত্যাগের মাধ্যমে মানুষ অন্তরে যে প্রশান্তি আর সুখ অনুভব করতে পারে, জগতে কোটি টাকার বিনিময়েও সেই সুখ কেনা সম্ভব নয়। মানুষ যদি অপরের কল্যাণে আত্মাৎসর্গ করতে পারে, তবে মরেও অমর হয়। ভাষা-আন্দোলনে শহিদ রফিক, সালাম, বরকত জাতির কল্যাণে নিজেদের প্রাণ উৎসর্গ করেছেন বলেই আজ তারা জাতীয় বীর। বাঙালি হৃদয়ে চিরকাল তারা অমর হয়ে থাকবে। তাই বলা যায়, ভােগে নয়, ত্যাগেই জীবনের গৌরব। অর্থাৎ প্রকৃত সুখ ত্যাগেই নিহিত।

দুঃখের মতাে এত বড় পরশপাথর আর নেই

পরশপাথরের ছোঁয়ায় লােহা সােনা হয়। তেমনি মানবজীবনে কোনাে কোনাে দুঃখময় ঘটনা ক্ষুদ্র মানুষকে মহৎ মানুষে রূপান্তরিত করে। আগুনে পােড়ালে যেমন খাঁটি সােনার পরিচয় স্পষ্ট হয়, তেমনি দুঃখের দহন মানুষকে খাটি মানুষে পরিণত করে। আঘাতে আঘাতে, বেদনায় বেদনায় মানুষের মনুষ্যত্ববােধ, সত্যনিষ্ঠা ও বিবেকবােধ জাগ্রত হয়। দুঃখে না পড়লে কোনাে মানুষই জীবনের যথার্থ স্বরূপ উপলব্ধি করতে পারে না। মনীষীগণ তাই দুঃখকে পরশপাথরের সাথে তুলনা করেছেন। পরশপাথরের ছোঁয়ায় যেমন লােহা সােনায় পরিণত হয়, তেমনি দুঃখের আঘাত অমানুষকে মহৎ মানুষে পরিণত করতে পারে। বেদনার অশুতে যখন ভেসে যায় সমস্ত গ্লানি, তখন অপার্থিব এক পবিত্ৰবােধ জন্ম নেয় হৃদয়ে। সেই পবিত্ৰবােধই তাকে সুন্দর করে, নতুন এক মানুষে পরিণত করে। সুখ-দুঃখ মানবজীবনের এক অনিবার্য ফসল। তবে বাস্তব জীবনে এমন অনেক বিষাদময় ঘটনা ঘটতে দেখা যায়, যা সাধারণ মানুষকে মহৎ হৃদয়ের মানুষে পরিণত করে। স্রষ্টার পক্ষ থেকে দুঃখ একধরনের পরীক্ষা। দুঃখের অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলে সাধারণ মানুষ উত্তম মানুষে পরিণত হয়।

মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন

সাধনা দ্বারাই সিদ্ধি লাভ করা সম্ভব। পরিশ্রম ছাড়া জগতে ভালাে কিছু অর্জন করা যায় না। পরিশ্রমই সৌভাগ্যের প্রসূতি। পরিশ্রম ছাড়া ভাগ্যের দুয়ার কখনাে খােলে না। যথার্থ পরিশ্রমই ভাগ্যের লক্ষ্মীকে ডেকে আনে। পরিশ্রমবিমুখ, অলস ব্যক্তির কাছে সবকিছুই নাগালের বাইরে থাকে। পক্ষান্তরে কষ্ট করলেই কেষ্ট মিলে। দুনিয়াতে যারা খ্যাতি, প্রতিপত্তি, সুনাম, সাফল্য লাভ করেছেন, তাঁদের জীবনইতিহাস পর্যালােচনা করলে দেখা যায়, তারা বিনা আয়াসে এসব অর্জন করেননি। বরং তাদের সৎ সাফল্যের পেছনে রয়েছে কঠোর পরিশ্রম, কঠিন সাধনা। একজন কৃষক যেমন মন্ত্র পড়ে ফসল ফলান না; মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, কঠোর পরিশ্রম করে ফসল ফলান, তেমনি অলৌকিক কোনাে জাদুমন্ত্রের বলে নয়, সনিষ্ঠ শ্রমের মাধ্যমে বিমুখ ভাগ্যকে জয় করতে হয়। মন্ত্রবলে নয়, শ্রমের মাধ্যমেই আসে কাজের সাফল্য। বিনা আয়াসে কোনােকিছু লাভ করা যায় না। রবার্ট ব্রুস বারবার যুদ্ধে পরাজিত হয়েও হতাশ হননি। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর তিনি অবশেষে জয়লাভে সমর্থ হন। তাই একবার না পারিলে দেখ শত বার’ –এ উক্তিই যথার্থ। 

Related Articles

Back to top button