বােমা আবিষ্কার ও বিবর্তন

Recent General Knowledge Bangladesh and International Affairs

মানব সভ্যতা ধ্বংসের অন্যতম শক্তিশালী অস্ত্র বােমা। এটি পুরাে একটি শহরকে ধ্বংস করতে পারে এবং হত্যা করতে পারে লক্ষ লক্ষ মানুষ। প্রাকৃতিক পরিবেশকে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করার পাশাপাশি এর দীর্ঘমেয়াদি আগ্রাসন পরবর্তী প্রজন্মগুলােতে ভয়ানক প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার ব্যবহৃত গুচ্ছ ও ভ্যাকুয়াম বােমার আঘাতে মৃত্যুপুরী ইউক্রেন। এ প্রেক্ষাপটে জেনে নিন বােমার আবিষ্কার, বিবর্তন ও ক্রমবিকাশ।

বােমা কী?

বােমার ইংরেজি Bomb। গ্রিক শব্দ বােম্বাস (6mpc) থেকে বােমা শব্দের উৎপত্তি। ধাতব পদার্থ দিয়ে তৈরি এক ধরনের বিস্ফোরক ও অস্ত্রবিশেষ। খুব দ্রুতবেগে অভ্যন্তরীণ শক্তির রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে বড় ধরনের কম্পন তরঙ্গের সৃষ্টি করে বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে। জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হয়। সচরাচর বিস্ফোরক জাতীয় পদার্থ রাখার উপযােগী পাত্রে পরিপূর্ণ থাকে বােমা। এটি ধ্বংসাত্মক জিনিস দিয়ে। নকশা অনুসারে বসানাে হয় কিংবা নিক্ষেপ করা হয়। অধিকাংশ বােমাই সাধারণ জালানির তুলনায় কম শক্তি সঞ্চিত করে। ব্যতিক্রম হিসেবে রয়েছে পারমাণবিক বােমা।

ইতিহাস

১২২১ সালে চীনে প্রথম বােমার ব্যবহার দেখা যায়। গান রাজবংশের বিরুদ্ধে জিন রাজবংশের সেনাবাহিনী প্রথম এ অস্ত্র ব্যবহার করে। ১১ শতকে চীনে বাশ টিউব বােমার ব্যবহার দেখা গেছে। ১৩ শতকে বিস্ফোরক বারুদে ভরা ঢালাই লােহার শাঁস দিয়ে তৈরি বােমা ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে ১২৩১ সালে জিন বংশধরদের আমলে মঙ্গলদের বিরুদ্ধে নৌযুদ্ধে এ বােমার প্রচলন হয়।

ব্যবহার

কয়েক শতাব্দী ধরেই সারা বিশ্বে বােমার ব্যবহার হয়ে আসছে। প্রায়শই প্রতিপক্ষ শত্রুবাহিনীর লক্ষ্যস্থলে বােমাবর্ষণ করে সামরিক বাহিনী। এছাড়াও সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্যরা তাদের উদ্দেশ্য সাধনে আত্মঘাতী বােমা হামলা পরিচালনা করে। অবশ্য, শান্তিপূর্ণ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে খনির উত্সস্থল নিরূপণে বােমার ব্যবহার অনেক।

ক্ষয়ক্ষতি

যারা আত্মরক্ষার উপকরণ ছাড়াই বােমা বিস্ফোরণের কাছাকাছি অবস্থান। করেন তারা চার ধরনের বিস্ফোরণ প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে শারীরিক সমস্যায় ভুগতে পারেন। যেমন- কম্পনজনিত উচ্চচাপ, খণ্ড-বিখণ্ড, সংঘর্ষ এবং উচ্চতাপ। তবে বােমা নিরােধক ব্যক্তি, আত্মরক্ষার উপকরণ নিয়ে ঘটনাস্থলে গেলে তেমন প্রভাব পড়ে না। বলা প্রাসঙ্গিক, বােমা বিস্ফোরণের উচ্চচাপে আকস্মিক ও অতি তীব্র পরিবেষ্টিত চাপে। ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ ক্ষয়ক্ষতিসহ স্থায়ী ক্ষতি কিংবা মৃত্যুর কারণ হতে পারে। পাশাপাশি বিস্ফোরণ স্থলের ভূমিতে বিরাট গর্ত, ধ্বংসস্তুপ কিংবা গাছপালা উৎপাটনও হয়ে যায়।

কম্পন

বােমার বিস্ফোরকের কম্পন তরঙ্গের প্রতিক্রিয়ায় শরীরের । অঙ্গচ্যুতির মতাে ঘটনা ঘটতে পারে। কম্পন তরঙ্গ ভুক্তভােগী। ব্যক্তিকে শূন্যেও নিক্ষিপ্ত করতে পারে। এছাড়াও অঙ্গচ্ছেদ, অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ, কানের পর্দা। ছিদ্র হয়ে শ্রবণশক্তি হাসি পেতে পারে। ধনাত্মক ও ঋণাত্মক তরঙ্গ দিয়ে গড়া বিস্ফোরক। উপাদানের সাহায্যে কম্পন তরঙ্গ তৈরি হয়। তরঙ্গের উৎসস্থলে। অর্থাৎ, বিস্ফোরণস্থলে হতাহতের ঘটনা বেশি ঘটে।

হরেক রকম বােমা

গুচ্ছ বােমা

গুচ্ছ বােমা (Cluster Bomb) হলাে একটি বিস্ফোরক, ; যা ছােট সাবমেরিনকে ধ্বংস করতে পারে। গুচ্ছ ; বােমার বিস্ফোরণে বৈদ্যুতিক পাওয়ার ট্রান্সমিশন, যুদ্ধ বিমানের রানওয়ে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়। এই বােমার সাহায্যে রাসায়নিক বা জৈবিক অস্ত্র ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। ল্যান্ডমাইন ধ্বংস করতে এই বােমা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। যানবাহন বা পরিকাঠামাে ধ্বংসের পাশাপাশি মানুষ হত্যা করা যায় এই বােমার মাধ্যমে।

ভ্যাকুয়াম বা থার্মোব্যারিক বােমা

ভ্যাকুয়াম বােমা বা থার্মোব্যারিক বােমা হলাে উচ্চ তাপমাত্রার একটি বিস্ফোরক। এটি বিস্ফোরণ ঘটালে আশপাশের বায়ু থেকে অক্সিজেন শুষে নেয়। সাধারণ বিস্ফোরণের তুলনায় অনেক বেশি বিস্ফোরণের তরঙ্গ তৈরি করে। এই বিস্ফোরণের আওতায় থাকে এমন যেকোনাে মানুষকে সম্পূর্ণরূপে বাষ্পীভূত করে দিতে পারে এই বােমা। অর্থাৎ যতদূর এর তরঙ্গ থাকে ততদূর এলাকায় মানুষের চিহ্ন থাকবে না। ভ্যাকুয়াম বােমাকে অ্যারােসল বােমা বা জ্বালানি বায়ু বিস্ফোরকও বলা হয়।

সাধারণত একটি জ্বালানির পাত্রে দুই ধরনের বিস্ফোরক চার্জ রেখে এই বােমা তৈরি করা হয়। রকেট লঞ্চারের মাধ্যমে এ বােমা ছােড়া যায়। আবার বিমান থেকেও ফেলা যায়, লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানলে বােমার কনটেইনারের মুখ খুলে বিস্ফোরক জ্বালানি মিশ্রণটি মেঘের মতাে চারদিকে বড় এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। বিস্ফোরণের ফলে তীব্র শকওয়েভ ছড়িয়ে পড়ে, আশপাশের বাতাসের অক্সিজেন। শুষে নেওয়ায় বিস্ফোরণস্থলে তৈরি হয় এক ধরনের বায়ুশূন্য পরিস্থিতি। কোনাে আন্তর্জাতিক আইনে থার্মোব্যারিক অস্ত্র ব্যবহারে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়নি। তবে মানুষের বসবাসের এলাকা, স্কুল বা হাসপাতালে এবং বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে এ অস্ত্রের ব্যবহার করা হলে ১৮৯৯ ও ১৯০৭ সালের হেগ কনভেনশনের আওতায় তা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

পারমাণবিক বােমা

এক প্রকার বােমা জাতীয় মারণাস্ত্র। এতে ইউরেনিয়াম২২ এবং প্লুটোনিয়াম-২৩৯ ব্যবহার করা হয়। দ্রুত নিউট্রনের সুশৃঙ্খল বিক্রিয়ার দ্বারা বিস্ফোরণ ঘটে থাকে। এটম বােমা বা পারমাণবিক বােমা নামে পরিচিত ইউরেনিয়াম বা প্রটোনিয়াম নিউক্লিয়ার বােমায় মিশন
প্রক্রিয়ায় বিস্ফোরণ ঘটানাে হয়। এখন পর্যন্ত ২টি পারমাণবিক বােমা নিক্ষিপ্ত হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের হিরােশিমা ও নাগাসাকিতে।

হাইড্রোজেন বােমা

বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় পদার্থের সংমিশ্রণে তৈরি হাইড্রোজেন বােমা সাধারণ পরমাণু বােমার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও ধ্বংসাত্মক। একটি হাইড্রোজেন বােমা ৬-৮ মাত্রার ভূমিকম্পের সমান শক্তিশালী। এর অপর নাম ‘থার্মোনিউক্লিয়ার বােমা’। এ বােমায় ভারী হাইড্রোজেনের আইসােটোপ ব্যবহার করা হয় এবং এতে ফিউশন প্রক্রিয়ায় বিস্ফোরণ ঘটানাে হয়। এ ফিউশন প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য ট্রিগার হিসেবে একটি ফিশন বােমা বা এটম বােমা ব্যবহার করা হয়। সূর্যে যে প্রক্রিয়ায় শক্তি উৎপন্ন হয়, ঠিক সেই একই প্রক্রিয়া হাইড্রোজেন বােমা বিস্ফোরণেও অনুসরণ করা হয়। সােভিয়েত ইউনিয়ন (বর্তমান রাশিয়া) ও যুক্তরাষ্ট্রের শীতল যুদ্ধের সময় হাইড্রোজেন বােমার জন্ম হয়।

পরমাণু ও হাইড্রোজেন বােমার পার্থক্য

পরমাণু বােমা আর হাইড্রোজেন বােমা বানানাে হয়। একেবারেই আলাদা দুটি উপায়ে । পরমাণু বােমার কৌশল হলাে, একটা ক্ষুদ্র পরমাণুকে দুই বা ততােধিক ক্ষুদ্রতর পরমাণুতে ভেঙে ফেলা, যেখান থেকে বেরিয়ে আসে। প্রচুর পরিমাণে শক্তি ও বিধ্বংসী বিস্ফোরণের সৃষ্টি হয়। হাইড্রোজেন বােমার কৌশল হলাে, দুই বা ততােধিক হাইড্রোজেন পরমাণুকে জুড়ে অনেক বড় ও ভারী। পরমাণুতে পরিণত করা। তাই এর নাম হাইড্রোজেন। বােমা। এ বােমা থেকে নিউক্লিয়ার ফিউশনের তুলনায় কয়েক হাজার গুণ বেশি শক্তি নির্গত হয়।

নাপাম বােমা

নাপাম বােমা তৈরি করা হয় ন্যাপথ্যানিক অ্যাসিড ও পামিটিক অ্যাসিডের মিশ্রণে। এই দুই অ্যাসিড মিশে এক ধরনের জেলিজাতীয় রাসায়নিক দ্রব্য তৈরি হয়। এই জেলির সঙ্গে পেট্রোল বা গ্যাসােলিন মিশিয়ে এক ধরনের থলথলে দাহ্য পদার্থ তৈরি করা হয়। সেটিকে বিস্ফোরকের সঙ্গে মিশিয়ে তৈরি করা হয় নাপাম বােমা। বােমা ফুটে চারদিকে আগুন তাে ছড়াবেই, তার সঙ্গে সঙ্গে এই জেলির মতাে থলথলে পদার্থ কাদা বা আলকাতরার মতাে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যাবে। জলন্ত এই নাপাম মানুষের গায়ে লাগলে চামড়া পুড়ে খসে যায়। পানি দিলেও কিছু হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিস্ফোরক পুড়ে শেষ না হবে। ১৯৪২ সালে এ বােমা তৈরি করা হয়। ১৯৪৫ সালে আমেরিকা ৬,৯০,০০০ পাউন্ড নাপাম টোকিওতে ছাড়ে। আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে ই নিষিদ্ধ এ বােমা যুদ্ধে ব্যবহৃত হলেও, ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন বাহিনীর নিষ্ঠুরতার সঙ্গে এটির ব্যবহার সবচেয়ে বেশি করে।

নিউট্রন বােমা

স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট রােনাল্ড রিগ্যানের কাছ থেকে সবুজ সংকেত পাওয়ার পর স্যামুয়েল টি কোহেন নিউট্রন বােমা তৈরি করেন। এ বােমার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলাে, ভবন বা কঠিন বস্তু ধ্বংস না করে মানুষ হত্যা করা যায়। এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত বােমার মধ্যে এটাকেই সবচেয়ে যৌক্তিক ও নৈতিক অস্ত্র বলা হয়। প্রথাগত পরমাণু অস্ত্রের ব্যবহারে শহর ধূলিসাৎ হয়ে যায়। তবে নিউট্রন বােমা ছােট ছােট পার্টিকেল নিক্ষেপ করে যা দেয়াল, সামরিক যান ও অন্যান্য শক্ত বস্তু ভেদ করে কেবল জীবিত কোষই ধ্বংস করে। যুদ্ধের ময়দানে কেবল যােদ্ধারাই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।

বােমার জনক

পারমাণবিক বােমা রবার্ট ওপেন হেইমার (যুক্তরাষ্ট্র)
হাইড্রোজেন বােমা এডওয়ার্ড টেলার (যুক্তরাষ্ট্র)
নিউট্রন বােমা স্যামুয়েল টি কোহেন (যুক্তরাষ্ট্র)
সােভিয়েত হাইড্রোজেন বােমা আন্দ্রে দিমিত্রিভিচ শাখারভ
পাকিস্তানের পারমাণবিক বােমা ড. আবদুল কাদির খান
ভারতের পারমাণবিক বােমা এপিজে আব্দুল কালাম
ইরানের বােমা মােহসেন ফাখরিজাদেহ

বােমা

বােমা আবিষ্কার ও বিবর্তন

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Scroll to top