নৃবিজ্ঞান

নৃবিজ্ঞান : সাধারণ সংজ্ঞা বা পরিচিতি

নৃবিজ্ঞান : সাধারণ সংজ্ঞা বা পরিচিতি

পাঠ্যবই, বিশ্বকোষ, এবং নৃবিজ্ঞান সংক্রান্ত আরাে অনেক বইতে আমরা সাধারণত নৃবিজ্ঞানের যে সংজ্ঞা পাই তা এই জ্ঞানকাণ্ডের বিষয়বস্তুকে মনুষ্য প্রাণী, মানব সমাজ, মানব সংস্কৃতি, অতীত ও বর্তমান কালের মানুষজন কিংবা, সকল স্থান ও সকল কালের মানুষজন—এভাবে চিহ্নিত করে। আরেকটি বিষয়ের উপর জোরারােপ করা হয়, সেটি হলাে, এই জ্ঞানকাণ্ডের সমগ্রবাদী দৃষ্টিভঙ্গি বলা হয়, এটি মানব প্রাণীর/মানব জীবনের সকল দিককে নিরিখ করে (তবে, লক্ষ্য রাখবেন প্রথাগতভাবে, এই সমগ্রতার ওজন উত্তর আমেরিকা ও ব্রিটেনে ভিন্ন। বিষয়টি উপরে আলােচিত হয়েছে)। যেমন ধরুন নিচের সংজ্ঞাগুলাে:

– এনসাইক্লোপিডিয়া অফ এ্যানথ্রোপলজির সম্পাদকদ্বয় ডেভিড ই হান্টার এবং ফিলিপ হুইটেন-এর মতে, এই জ্ঞানশাস্ত্রটিকে মনুষ্য প্রাণীর প্রকৃতির একটি নিয়মতান্ত্রিক অধ্যয়ন হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে।

– কালচারাল এ্যানথ্রোপলজির লেখক সেরিনা নন্দা নৃবিজ্ঞানকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করেন: নৃবিজ্ঞান হচ্ছে মানবসমাজ ও সংস্কৃতির তুলনামূলক অধ্যয়ন। নৃবিজ্ঞানের লক্ষ্য হচ্ছে বিভিন্ন জীবনধারা কিংবা সংস্কৃতি, যার মাধ্যমে মানব দল, কিংবা সমাজ, প্রতিবেশের সাথে খাপ খায় সেটির বর্ণনা, বিশ্লেষণ, এবং ব্যাখ্যা প্রদান। তিনি আরও বলেন, নৃবিজ্ঞান হচ্ছে একটি তুলনামূলক অধ্যয়ন, কারণ এটি বর্তমান ও অতীতের মনুষ্য সমাজের মধ্যকার সমরূপতা এবং ভিন্নতা, দুটোকেই অনুধাবনের চেষ্টা করে (Nanda ১৯৮৭, ৫)।

– একই বিষয়ের উপর গুরুত্ব আরােপ করেন উইলিয়াম এ হ্যাভিল্যান্ড। তিনি বলেন: নৃবিজ্ঞান সকল স্থান এবং সকল কালের মানুষজন, এবং তাদের আচরণ সম্বন্ধে নির্ভরযােগ্য জ্ঞান উৎপাদনে চেষ্টারত, মানুষকে কী কী সমরূপী করে তােলে এবং কোনটি তাদেরকে ভিন্ন করে, নৃবিজ্ঞান উভয় বিষয়ই বুঝতে সচেষ্ট।

– ফ্রেড প্লগ, ক্লিফর্ড জে জলি এবং ড্যানিয়েল জি বেইটস-এর দৃষ্টিতে নৃবিজ্ঞানের মনােযােগের জায়গা কেবলমাত্র সকল স্থান এবং সকল কালের মানুষ নয়, এটি মানুষের জীবনধারার প্রতিটি দিকের—মানুষের দৈহিক গঠন হতে শুরু করে তার উদ্ভাবিত যন্ত্রপাতি, আচারপ্রথা, অথবা তাদের সৃষ্টি/বিশ্ব-তত্ত্ব-প্রতি মনােযােগী (Plog, Jolly and Bates ১৯৭৬, ৫)। এবং, লেখকদ্বয় বলেন, এ কারণেই নৃবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে সমগ্রবাদী; এটির লক্ষ্য হচ্ছে অন্যান্য সেসকল শাস্ত্র, যেগুলাে মনুষ্যত্বের বিশেষ বিশেষ দিক নিয়ে ব্যতিব্যস্ত, সেগুলাের সৃষ্ট সীমানাগুলােকে লঙ্ন কিংবা অতিক্রম করা ।

এই ধরনের আলােচনায় ক্যারল আর এম্বার এবং মেলভিন এম্বার একটি ভিন্ন মাত্রা যােগ করেন এই বলে যে, যদিও নৃবিজ্ঞান সংজ্ঞায়িত হয় এমন একটি শাস্ত্র হিসেবে যেটির রয়েছে মনুষ্য প্রাণী সম্বন্ধে অসীম কৌতুহল, এই সংজ্ঞা সম্পূর্ণ নয় (Ember and Ember ১৯৯০, ২)।

তার কারণ এমন সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করবে বিভিন্ন শাস্ত্রের একটি দীর্ঘ তালিকাকে যেমন, সমাজবিজ্ঞান, মনােবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, ইতিহাস, মনুষ্য জীববিজ্ঞান, এবং হয়তােবা দর্শন এবং সাহিত্যের মতন মানবিক শাস্ত্রও। লেখকদ্বয় বলেন, এতে অপরাপর শাস্ত্র অখুশী হবে কারণ ওগুলাে নৃবিজ্ঞান হতে আরাে পুরাতন এবং প্রতিটির দৃষ্টিতে সেটির পরিসর হচ্ছে স্বতন্ত্র। তারা বলেন, তাহলে নিশ্চয়ই নৃবিজ্ঞান অনন্য। কারণ, এটি কেবলমাত্র একটি স্বতন্ত্র জ্ঞানকাণ্ড হিসেবে বিকশিত হয়নি, এটি গত একশত বছরের অধিক সময় ধরে তার স্বতন্ত্র সত্তা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে।

এম্বার এবং এম্বার বলেন, সাধারণত ভাবা হয়ে থাকে নৃবিজ্ঞানীগণ হচ্ছেন এমন মানুষ যারা বিশ্বের দূর-দূরান্তে যেয়ে উদ্ভট মানুষজন (exotic peoples) অধ্যয়ন করেন, কিংবা যারা মাটি খুঁড়ে অতীতের মানুষজনের জীবাশ্ম অথবা যন্ত্রপাতি, কিংবা হাঁড়ি-কুঁড়ি বের করেন। লেখকদ্বয় বলেন, যদিও এই দৃষ্টিটি গাধা তা সত্ত্বেও এটি ইঙ্গিত করে কিভাবে নৃবিজ্ঞান অপরাপর শাস্ত্রসমূহ, যেগুলাে মানুষকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে, তা হতে ভিন্ন: নৃবিজ্ঞানের ব্যাপ্তি (ভৌগােলিক ও ঐতিহাসিকভাবে) এ ধরনের আর সকল শাস্ত্র হতে অনেক বেশি। এম্বার এবং এম্বার বলেন, নৃবিজ্ঞান সরাসরিভাবে, প্রত্যক্ষভাবে এ বিশ্বের মানুষজনের মধ্যকার সকল ধরনের বৈচিত্র্যের প্রতি মনোেযােগী, কেবলমাত্র কোনাে একটি বিশেষ স্থানের কিংবা যারা নিকটে বসবাস করেন, সে ধরনের মানুষজনের প্রতি নয়।

উপরন্তু, এটি সকল কালের মানুষের প্রতি দৃষ্টিরত। কয়েক মিলিয়ন বছর আগের মানুষজনের সাক্ষাৎ পূর্বসূরী হতে শুরু করে, নৃবিজ্ঞান বর্তমানের মানুষের বিকাশ-পথের অনুসন্ধান চালায়। পৃথিবীর যে সকল স্থানে মানুষের বসবাস ছিল, নৃবিজ্ঞানের সেসব স্থানের প্রতি রয়েছে প্রবল আগ্রহ। এম্বার এবং এম্বার আরাে যােগ করেন, নৃবিজ্ঞানীগণের আগ্রহ কিন্তু সবসময়ে এত ব্যাপক ও বিস্তৃত ছিল না।

সনাতনী নৃবিজ্ঞান কিন্তু অ-পশ্চিমা সমাজের প্রতি মনােনিবেশ করেছিল; পশ্চিমা সভ্যতা এবং একই ধরনের জটিল সমাজ, যেগুলাের রয়েছে নথিভুক্ত ইতিহাস, সেগুলাে অধ্যয়ন করেছিল অপরাপর শাস্ত্রসমূহ। তবে, এম্বার এবং এম্বার বলেন, ইদানিংকালে এই পরিসর বিভাজন লুপ্ত হতে চলেছে এবং বর্তমানকালে নৃবিজ্ঞানীদের যেমন শিল্পায়িত বিশ্বের শহরগুলােতে পাওয়া যায়, ঠিক তেমনই। অ-পশ্চিমা বিশ্বের দূর-দূরান্তের গ্রামেও পাওয়া যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button