নবাব আবদুল লতিফ সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

সৈয়দ আহমদ খান ও আলীগড় আন্দোলন এবং আন্দোলনের আদর্শ ও উদ্দেশ্য

ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠার ফলে ভারতীয় মুসলমানরা তাদের ঐতিহ্য ও গৌরব হারাতে শুরু করে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে মুসলমানদের জায়গায় হিন্দু জমিদারগণ ভূমির মালিকে পরিণত হন। ফারসির বদলে অফিসে-আদালতে ইংরেজি প্রবর্তন হওয়ার ফলে ইংরেজি ভাষা-বিরােধী মুসলমানরা সরকারি চাকরি হতে বঞ্চিত হন।

এছাড়া, ১৮৫৭ সালের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য মুসলমানদের দায়ী করা হয়। মুসলমানরা সরকারের কোপানলে পড়ে। তাদের পঙ্গু করার জন্য শাসননীতি তৈরি করা হয়। এভাবে ইংরেজদের নীতি ও বিদ্বেষপরায়ণ মনােভাব মুসলমান সম্প্রদায়কে চরম দুরবস্থায় ফেলে দেয়।

মুসলমান সমাজকে যুগের উপযােগী চিন্তাধারা ও শিক্ষাদীক্ষা গ্রহণে অনুপ্রাণিত করতে প্রথম এগিয়ে আসেন নওয়াব আব্দুল লতিফ। তিনি মুসলমানদের মধ্যে পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রসারে ব্রতী হন। নওয়াব আবদুল লতিফ অনুধাবন করেন, যদি ভারতীয় মুসলমানরা বিশেষ করে বাংলার মুসলমানরা ইংরেজ সরকারের সাথে সহযােগিতা না করে এবং আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান আহরণে পিছিয়ে পড়ে তাহলে বাংলার মুসলমান সমাজ কোনাে দিনই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে না।

মুসলমান সমাজকে উন্নতির পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য নওয়াব আব্দুল লতিফ কঠোর পরিশ্রম করেন। বাংলার গণমানুষের জন্য তিনি যে সমস্ত সমাজ সংস্কারমূলক ও শিক্ষা বিস্তারমূলক কাজ করেন, সেজন্য তাকে বাংলার সৈয়দ আহমদ বলা হয়।

১৮২৮ সালে ফরিদপুর জেলার রাজাপুর গ্রামে নওয়াব আব্দুল লতিফ জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কলকাতা মাদরাসায় আরবি শিক্ষার সাথে ইংরেজি ভাষা শিক্ষালাভ করেন। তিনি ফারসি ও উর্দু ভাষাও শিক্ষালাভ করেন। মাদরাসা শিক্ষা সমাপ্ত করে তিনি কিছুদিন ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে শিক্ষকতা করেন। ১৮৪৯ সালে তিনি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পদে নিযুক্ত হন। ১৮৬২ সালে বাংলার ব্যবস্থাপক পরিষদের সদস্য মনােনীত হন।

১৮৬৩ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ফেলাে’ মনােনীত হন। ১৮৮৫ সালে তিনি সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। মুসলমান সমাজের প্রতি তার অবদানের জন্য সরকার তাঁকে ‘খান বাহাদুর’ উপাধি প্রদান করে। বাংলার এই মনীষী ১৮৯৩ সালের ১০ই জুলাই ইন্তেকাল করেন।

শিক্ষা বিস্তারে অবদান :

অধঃপতিত বাংলার মুসলমানদের মধ্যে আধুনিক পাশ্চাত্য-শিক্ষার প্রসারে এবং সমাজ-সংস্কারে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তার চেষ্টায় কলকাতার আলিয়া মাদ্রাসায় ইংরেজি ও ফারসি বিভাগ খােলা হয় এবং মাদরাসাকে এক উন্নত ও আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করা হয়। তাঁর প্রচেষ্টায় ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রামে মাদরাসা স্থাপিত হয়। এগুলােতে ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক শিক্ষাও প্রবর্তন করা হয়।

তিনি মুসলমানদেরকে ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণে অনুপ্রাণিত করেন। তার প্রচেষ্টায় কলকাতার হিন্দু কলেজ প্রেসিডেন্সি কলেজে রূপান্তরিত হয় এবং হিন্দু-মুসলিম সকলে সেখানে প্রবেশাধিকার পায়। মুহসীন ট্রাস্টের টাকায় সকল সম্প্রদায়ের ছাত্রগণ উপকৃত হলেও মুসলমান ছাত্ররা বিশেষ উপকৃত হয়নি। মুহসীন ট্রাস্টের সমুদয় অর্থ শুধু মুসলমান ছাত্রদের জন্য ব্যয় করার প্রতাব তিনি সরকারের কাছে পেশ করেন এবং এ ফান্ড পুনর্গঠনের ব্যবস্থা করেন।

নওয়াব আব্দুল লতিফের চেষ্টায় মুহসীন ট্রাস্টের অর্থ শুধু বাংলার মুসলমানদের শিক্ষা বিস্তারে, বিশেষ করে দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্রদের বৃত্তি প্রদানে ব্যয় করার ব্যবস্থা হয়। গরিব ও মেধাবী মুসলমান ছাত্রদেরকে পুরস্কার ও বৃত্তি প্রদানের জন্য নওয়াব আবদুল লতিফ ধনী মুসলমানদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করতেন। শিক্ষাক্ষেত্রে তার অবদানের জন্য সরকার তাকে ‘এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকা’ স্বর্ণপদকে পুরস্কৃত করেন।

মােহামেডান লিটারারি সােসাইটি

১৮৬৩ সালে নওয়াব আবদুল লতিফ মুসলিম সাহিত্য সমাজ মােহামেডান লিটারারি সােসাইটি) প্রতিষ্ঠা করেন। মুসলমানদের পশ্চিমা ভাবধারায় অনুপ্রাণিত করা, তাদের মধ্যে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার ঘটানাে এবং তাদের প্রতিভা বিকাশের সুযােগ করে দেওয়ার জন্য মােহামেডান লিটারারি সােসাইটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সমিতিতে মুসলমানদের শিক্ষা-সংক্রান্ত, সামাজিক ও ধর্মীয় সমস্যার ওপর আলােচনা হত। এ সমিতি মুসলমানদের ভাবধারার সাথে পাশ্চাত্য সভ্যতার সমন্বয় সাধনে বিশ্বাসী ছিল। নওয়াব আবদুল লতিফ অসাম্প্রদায়িক ছিলেন। তিনি হিন্দু-মুসলিম সম্পীতি দৃঢ় করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। তাঁর প্রচেষ্টা ও পরিশ্রমে মুসলমানদের প্রতি ইংরেজ-বিদ্বেষ অনেক লাঘব হয়। বাংলার মুসলমানদের পুনর্জাগরণে নওয়াব আবদুল লতিফের ভূমিকা অনন্য।

নবাব আবদুল লতিফ সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Scroll to top