ডিসেম্বর মাসের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস ও প্রতিপাদ্য বিষয়

গৃহযুদ্ধের কবলে ইথিওপিয়া

হর্ন অব আফ্রিকা’ খ্যাত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র ইথিওপিয়া এখন আত্মহননের এক গৃহযুদ্ধে ক্ষত-বিক্ষত। দেশটির ইরিত্রীয় সীমান্তবর্তী টাইগ্রে (Tigray) অঞ্চলের টাইগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট (TPLF)-এর বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের ফেডারেল বাহিনী অভিযান পরিচালনার পর TPLFর পাল্টা আঘাতে এখন খােদ রাজধানী আদ্দিস আবাবার নিরাপত্তা শঙ্কাকুল। টাইগ্রে বাহিনী রাজধানীর অদূরের দু’টি শহরের নিয়ন্ত্রণ নেয়। ২ নভেম্বর ২০২১ তাৎক্ষণিকভাবে জরুরি অবস্থা কার্যকরের ঘােষণা জারি করে ইথিওপিয়া সরকার।

গৃহযুদ্ধের পথ পরিক্রমা

ইথিওপিয়ার সাথে প্রায় দু’দশক ধরে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলছিল ইরিত্রিয়ার। ২ এপ্রিল ২০১৮ ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আবি আহমেদ শপথ নেওয়ার পর পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে। তার মধ্যস্থতায় ৯ জুলাই ২০১৮ ইরিত্রিয়ার সঙ্গে শান্তিচুক্তি হয়। আর এ শান্তিচুক্তির কারণেই ২০১৯ সালে আবি আহমেদকে শান্তিতে নােবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। নােবেল পুরস্কার পাওয়ার পর থেকেই আবি আহমেদ নিজ দেশের রাজনীতিতে ব্যাপক সংস্কার শুরু করেন।

জাতিগত ফেডারেলিজম এবং জাতীয়তাবাদী রাজনীতি থেকে দেশকে দূরে রাখতে প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ ইথিওপিয়ান পিপলস রেভল্যুশনারি ডেমােক্র্যাটিক ফ্রন্ট (EPRDF) ও অঞ্চলভিত্তিক দলসহ কয়েকটি বিরােধী দলকে তার নতুন প্রসপারিটি পার্টিতে একীভূত করেন। তবে এই উদ্যোগ থেকে বাইরে রাখা হয় TPLF’কে ৩ নভেম্বর ২০২০ ইথিওপিয়ায় চলমান গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত।

প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ উত্তর টাইগ্রে অঞ্চলের স্থানীয় বিদ্রোহী গােষ্ঠীর বিরুদ্ধে সামরিক হামলার নির্দেশ দিলে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ শুরু হয়। এরপর ২৮ নভেম্বর ২০২০ টাইগ্রে অঞ্চলের রাজধানী মেকেলে দখল করার পরে প্রধানমন্ত্রী টাইগ্রে অপারেশন সমাপ্ত ঘােষণা করেন। কিন্তু টাইগ্রে সরকার নভেম্বরের শেষ দিকে ‘হানাদারদের বের না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ঘােষণা দেয়। ২৮ জুন ২০২১ টাইগ্রে প্রতিরক্ষা বাহিনী মেকেলে পুনরুদ্ধার করে এবং জুলাই মাসে আমহারা এবং আফার অঞ্চলে অগ্রসর হয়।

২০২১ সালের নভেম্বরের শুরুতে TDF এবং ওরােমাে লিবারেশন। আর্মি (OLA) একত্রে টাইগ্রে অঞ্চলের দক্ষিণে বেশ কয়েকটি শহরের নিয়ন্ত্রণ নেয়। TPLF এখন আদ্দিস আবাবার দিকে এগােচ্ছে। সাতটি ছােট বিদ্রোহী গােষ্ঠীর সাথে ঐক্যবদ্ধ TPLF ও OLA জোট ঘােষণা করে যে তাদের লক্ষ্য হলাে, শক্তি প্রয়ােগে বা আলােচনার মাধ্যমে আবির সরকারের পতন ঘটানাে এবং তারপর একটি ক্রান্তিকালীন কর্তৃপক্ষ গঠন করা।

TPLF ও টাইগ্রেয়ান কারা?

৭০-এর মাঝামাঝি সময়ে ইথিওপিয়ার মার্কসবাদী সামরিক একনায়কত্বের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক প্রান্তিক জনগােষ্ঠী টাইগ্রেয়ানদের একটি ছােট মিলিশিয়া বাহিনী হিসেবে ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৫ টাইগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট (TPLF) জন্ম নেয়। দেশটির দু’টি বৃহত্তম জাতিগােষ্ঠী ‘ওরােমাে’ ও ‘আমহারা’ মিলিতভাবে জনসংখ্যার ৬০% আর তৃতীয় বৃহত্তম টাইগেয়ানরা ৭% এর মতাে। এর পরও TPLF দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী বিদ্রোহী বাহিনী হয়ে ওঠে এবং একটি জোটের নেতৃত্ব দেয়, যা ১৯৯১ সালে সরকারের পতন ঘটায়।

TPLF’র সাথে ঐক্যবদ্ধ বিদ্রোহী জোট ইথিওপিয়ার ক্ষমতাসীন জোটে পরিণত হয়। TPLF’র নেতৃত্বদানকারী মেলেস জেনাভি, ২৮ মে ১৯৯১-২০ আগস্ট ২০১২ তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ইথিওপিয়াকে নেতৃত্ব দেন। এ সময় অশান্ত অঞ্চলে ইথিওপিয়া একটি স্থিতিশীল দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং উল্লেখযােগ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দেশে পরিণত হয়। কিন্তু ২০১৬ সালে শুরু হওয়া সরকারবিরােধী বিক্ষোভ আবি আহমেদের ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথ প্রশস্ত করে। তার সরকার টাইগ্ৰেয়ান কর্মকর্তাদের ওপর শুদ্ধি অভিযান শুরু করে, যা টাইগ্ৰেয়ান নেতৃত্বকে ক্ষুব্ধ করে। ১৮ জানুয়ারি ২০২১ TPLF কে নিষিদ্ধ করা হয়।

Scroll to top