গ্রন্থ-সমালোচনা

‘কাঁদো নদী কাঁদো’ : সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্

‘কাঁদো নদী কাঁদো বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী একজন কথাসাহিত্যিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্। তিনি কথাসাহিত্যে স্বতন্ত্র এক স্বর প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি একজন নাট্যকারও। তাঁর লেখা উপন্যাস ‘লালসালু’ কিংবা গল্প ‘একটি তুলসীগাছের কাহিনী বাংলা সাহিত্যে উচ্চাসনে সমাসীন। ধর্মীয় গোঁড়ামি, বাঙালি সমাজব্যবস্থা ও জনজীবনের প্রকৃত চিত্র তাঁর রচনায় পাওয়া যায়। সুগভীর অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে মানুষের মনের ভেতরকার নানামুখী জটিলতা ও সংকট তিনি চিহ্নিত করে তার রচনায় ধরতে চেয়েছেন। তাঁর রচনা পাঠে বাঙালি সমাজব্যবস্থার অনুপুঙ্খ চিত্রই মেলে।

‘কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসটি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র একটি গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টিকর্ম। ১৯৬৫ সালে এটি প্রকাশিত হয়েছে। এটি চেতনাপ্রবাহরীতির একটি উপন্যাস। পাশ্চাত্যের প্রভাব উপন্যাসে থাকলেও এতে বর্ণিত সমাজ ও চরিত্র এবং সংস্কৃতি ও পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করলে এটিকে পুরােপুরি দেশীয় হিসেবে মনে হবে। এ উপন্যাসের চরিত্রগুলাের মধ্য দিয়ে অস্তিত্ববাদ আর নিয়তিবাদই মূলত প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।

কথাসাহিত্যিক ইমতিয়ার শামীম এক বক্তৃতায় বলেছেন, সাম্প্রদায়িকতা, দেশভাগ ইত্যাদির নেতিমূলক অভিঘাত সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র সাহিত্যে উঠে এসেছে অনন্যমাত্রায়। একই সঙ্গে তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার বিষয়টিও ‘লালসালু’ থেকে ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসের পরম্পরায় বিস্তৃত। ‘কাঁদো নদী কাঁদো’তে তিনি নদীর রূপকে ভূখণ্ডের অব্যক্ত কান্নাকে ভাষায় রূপ দিয়েছেন। ইমতিয়ার শামীম আরও বলেন, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ ইতিহাসের এক ক্রান্তিকালে সাহিত্যসাধনা শুরু করেন।

গ্রন্থ-সমালোচনা থেকে আরো কিছু পড়ুন

শিক্ষাজীবনে বামপন্থী চিন্তার সংশ্রব সমকালীন সমাজে তাঁর স্বতন্ত্র মানস-ভূগােল নির্মাণে ভূমিকা রাখে। তিনি নিজে অগ্রসর হয়েও তার সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য নিজের রচনাকে সচেতনভাবে পিছিয়ে রাখতেও দ্বিধাহীন ছিলেন; অর্থাৎ লেখক হিসেবে গণমানুষের সমানুপাতিক অগ্রযাত্রায় বিশ্বাসী ছিলেন তিনি।

কাহিনি সংক্ষেপ

তবারক ভুইঞা নামের এক যাত্রী চলন্ত স্টিমারে বসে ছােট হাকিম মুহাম্মদ মুস্তফার জীবনবৃত্তান্ত শােনাচ্ছিলেন অন্য যাত্রীদের। মুস্তফার বাড়ি কুমুরডাঙ্গায়। সেই স্টিমারে তবারক নিয়তিতাড়িত মুস্তফার জীবনের করুণ বৃত্তান্ত শােনানাের পাশাপাশি কুমুরডাঙ্গার অসহায় মানুষের জীবনচিত্রও উপস্থাপন করেন।

উপন্যাসে মুস্তফা আর কুমুরডাঙ্গার গল্প সমান্তরালভাবে বর্ণিত হয়েছে। বাধাবিপত্তি ঠেলে মুস্তফার উচ্চশিক্ষা লাভ করে সমাজে প্রতিষ্ঠা পাওয়া এবং বাকল নদীতে চর জেগে কুমুরডাঙ্গার মানুষের অনিশ্চিত জীবনের ঘটনা সমান্তরালভাবে উপন্যাসটিতে উঠে এসেছে। মুস্তফা ছােট হাকিম হিসেবে কুমুরডাঙ্গায় যখন যােগ দেন, তখন এখানকার উচ্চপদস্থ কর্মচারী আশরাফ হােসেনের মেয়ের সঙ্গে তার পরিচয় হয়।

একসময় তাদের বিয়ে ঠিক হয়। সেটা চিঠি দিয়ে মুস্তফা তাঁর বাবা খেদমতুল্লাকে জানালে বিপত্তি বাধে। কারণ, বেশ আগেই খেদমতুল্লার বােন যখন বিধবা হন, তখন বােনের মেয়ে খােদেজার সঙ্গে মুস্তফার বিয়ে দেবেন বলে খেদমতুল্লা তার বােনকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন। এ অবস্থায় মুস্তফার চিঠি বাড়িতে পৌঁছালে খােদেজা আত্মহত্যা করেন। ঘটনার পরম্পরায় উপন্যাসে এসেছে কালু মিঞা, ফনু মিঞা, সকিনা খাতুন, মােছলেহউদ্দিন, কফিলউদ্দিন, আমেনা খাতুনসহ নানা চরিত্র।

মুস্তফাকে উপন্যাসে নানা দুঃখ-যন্ত্রণা সইতে দেখা যায়। তার বাবা খেদমতুল্লার খুন হওয়া এর মধ্যে একটি ঘটনা। এদিকে নদীতে চর জাগায় জীবনযাপনের বিপন্নতায় আতঙ্কিত কুমুরডাঙ্গার মানুষের হাহাকারের সঙ্গে মুস্তফার জীবনের দীর্ঘশ্বাসও মিলেমিশে একাকার হয়ে পড়ে উপন্যাসটিতে।

ভাগ্য আর নিয়তি, বাস্তবতা ও যুক্তি, চেতন আর অবচেতন, বিশ্বাস ও সংস্কার— সব বিষয়ই ঘটনার পরম্পরায় ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসের চরিত্রগুলাের মধ্য দিয়ে উপস্থাপিত হয়েছে। এখানে মুস্তফা আর কুমুরডাঙ্গার ঘটনার উপস্থাপনকারী কথকরূপী এক ব্যক্তিই গল্পচ্ছলে উপন্যাসটিকে শেষ পর্যন্ত সমাপ্তিতে টেনে নিয়ে যান।

প্রশ্ন-উত্তর

প্রশ্ন : সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র জন্ম কবে ও কোথায়?
উত্তর : ১৯২২ সালের ১৫ আগস্ট, চট্টগ্রাম শহরে।

প্রশ্ন : সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র স্ত্রীর নাম কী?
উত্তর : আন্-মারি লুই রােজিতা মার্সে তিবাে। তাঁর স্ত্রী ফরাসি বংশােদ্ভূত

প্রশ্ন : সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র শিক্ষাজীবন সম্পর্কে বলুন।
উত্তর : সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ডিষ্টিংকশনসহ বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। এ ছাড়া অর্থনীতি বিষয়ে এমএ ক্লাসে ভর্তি হয়েও তা সম্পন্ন করেননি।

প্রশ্ন : সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহুকী কী পুরস্কার পেয়েছিলেন?
উত্তর : পিইএন পুরস্কার (১৯৫৫), বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬১), আদমজী পুরস্কার (১৯৬৫), একুশে পদক (মরণােত্তর, ১৯৮৪) উল্লেখযােগ্য।

প্রশ্ন : সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র উল্লেখযোেগ্য কয়েকটি গ্রন্থের নাম লিখুন।
উত্তর : ‘নয়নচারা’ (ছােটগল্প, ১৯৪৫), ‘লালসালু’ (উপন্যাস, ১৯৪৯), বহিপীর’ (নাটক, ১৯৬০), ‘চাদের অমাবস্যা’ (উপন্যাস, ১৯৬৪), ‘সুড়ঙ্গ (নাটক, ১৯৬৪), ‘তরঙ্গভঙ্গ’ (নাটক, ১৯৬৫), ‘দুই তীর ও অন্যান্য গল্প (ছােটগল্প, ১৯৬৫) উল্লেখযােগ্য।

প্রশ্ন : সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ মৃত্যুবরণ করেন কবে?
উত্তর : ১৯৭১ সালের ১০ অক্টোবর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button