সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২১
Home » একটি কলমের আত্মকথা
এসএসসি বাংলা রচনা সম্ভার

একটি কলমের আত্মকথা

রেলভ্রমণের একটি অভিজ্ঞতা

একটি কলমের আত্মকথা

আমি একটি ছােট্ট কলম। এতকাল আমি অন্যের কথা বলেছি। লিখেছি তাদের সুখের কথা, দুঃখের কাহিনী । উত্তর লিখেছি ছাত্রের পরীক্ষার খাতায়। ডাক্তার, উকিল, মাস্টার, কেরানি, জজ-ব্যারিস্টার আমাকে দিয়ে লিখিয়েছেন কত বিচিত্র বিষয়ে। গল্প, কবিতা লিখিয়েছেন কেউ বা আমাকে দিয়ে। আমি সারাটা জীবন মানুষের মনের কথা লিখলাম কিন্তু কেউ আমার কথা লিখল না।

আমি নিতান্তই ভাষাহীন। তবু আমারও তাে জীবন বলে একটা কিছু আছে। কলম হলেও আমার জন্মের একটি ইতিহাস আছে। সেই ইতিহাস খুব গৌরবের নয়। কিন্তু শিক্ষা ও সভ্যতা বিকাশে আমার বংশের অবদান কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। প্রবাদে আছে, ‘জন্ম হােক যথা তথা কর্ম হােক ভালাে। আমার কর্মের গুণেই আজ আমি মানুষের নিত্যসঙ্গী।

আমাকে ছাড়া শিক্ষিত, সভ্য মানুষের একমুহূর্তও চলে না। আমার এই অনিবার্য ভূমিকার কথা বলছি বলে, কেউ মনে করবেন না যে, আমি নিজের মূল্য ও মর্যাদার কথা বাড়িয়ে বলছি। এতদিন মানুষ আমাকে দিয়ে নিজের মনের কথা লিখেছে। আমার কথা ভুলেও কেউ মনে করেনি। গান শেষে বীণা যেমন পড়ে থাকে মাটিতে অনাদরে, তেমনি অবস্থার শিকার আমিও।

আরো পড়ুন : রেলভ্রমণের একটি অভিজ্ঞতা

সবাই আমাকে কাজেই লাগিয়েছে কেউ আমাকে নিয়ে ভাবেনি। আমার কথা কারাে মুখে আসেনি। তাই আজ আমি নিজেই আমার কথা বলব। মন খুলে বলব। হৃদয় উজাড় করে বলব আমার জীবনকথা। আমি ছিলাম একটা দোকানের শাে-কেসের ভেতরে। লাল একটা সুন্দর প্লাস্টিকের বাক্সে। অনেকদিন পড়েছিলাম এ অবস্থায়। একদিন সুবেশধারী এক ভদ্রলােক আমাকে তুলে নিলেন।

আরো পড়ুন :   সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই

পছন্দ হতেই কিনে নিলেন। আমাকে বাক্সসহ রেখে দিলেন ব্যাগে। বাড়িতে এসে তিনি বড়ছেলেকে উপহার হিসেবে দিলেন। ছেলেটি আমাকে পেয়ে খুব খুশি হলাে। পার্কার কলম, অনেক দামি। দেখতেও খুব সুন্দর। দ্রলােক হেসে বললেন, ‘খােকা, সামনে তােমার পরীক্ষা। ভালাে কলম দিয়ে লিখলে তােমার পরীক্ষা ভালাে হবে। এভাবে আমি ছেলেটির ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেলাম।

পরদিন খােকা আমাকে স্কুলে নিয়ে গিয়ে তার বন্ধুদের দেখালাে। সবাই আমাকে নেড়েচেড়ে দেখল। বলল, “বেশ দামি কলম, দেখতেও কী সুন্দর! খােকা আমাকে খুব যত্নে বুকপকেটে আটকে রেখে রােজ স্কুলে যায়। কতরকম লেখা লেখে। গদ্য-পদ্য প্রশ্নের উত্তর। ইংরেজি, বাংলা, কখনাে অঙ্ক বা জ্যামিতি। এভাবে লিখতে লিখতে আমার প্রতি খােকার বেশ মায়া জন্মে গেল। একদিন ক্লাসের এক শিক্ষকও আমাকে ধরে নেড়েচেড়ে লিখে দেখে বেশ প্রশংসা করলেন। খােকাকে বললেন, ‘সাবধানে রেখাে, যেন হারিয়ে না যায়।

আরো পড়ুন : আমার জীবনের লক্ষ্য

ইতােমধ্যে আমার প্রতি অনেকের নজর পড়ল। একদিন টিফিন পিরিয়ডে থােকা আমাকে ভুলে টেবিলে রেখে পানি খেতে গেছে। এমন সময় একটি দুষ্ট ছেলে আমাকে নিয়ে গেল। লুকিয়ে ফেলল তার প্যান্টের পকেটে। আমাকে হারিয়ে খােকার মন খারাপ হয়ে গেল। অস্থির হয়ে সে ক্লাসের আনাচে কানাচে, বন্ধুদের কাছে অনেক খোঁজাখুঁজি করল। তারপর তার কলম হারিয়ে যাওয়ার ঘটনাটা স্যারকে জানালাে। স্যার ক্লাসে কলম হারানাের ঘটনায় বেশ রেগে গেলেন। এতে দুষ্ট ছেলেটি খুব ভয় পেয়ে গেল।

আরো পড়ুন :   বাংলাদেশের ঋতুবৈচিত্র্য

সবার অজান্তে সে আমাকে নিচে ফেলে পা দিয়ে আস্তে ঠেলে দিল খােকার পায়ের দিকে। আমি খােকার পায়ের কাছে গড়িয়ে গিয়ে পড়ে থাকলাম। মনে মনে বললাম, ‘খােকা, এই তাে আমি, আমাকে কুড়িয়ে তুলে নাও। কিন্তু আমার কথা তাে খােকার কানে যায় না। একসময় খােকার পায়ের সাথে লাগতেই সে নিচু হয়ে আমাকে তুলে নিল। আনন্দে সে বলে উঠল, ‘স্যার, এই তাে আমার কলম। দুষ্ট ছেলেটি সাথে সাথে বলে উঠল, ‘স্যার, খােকা নিজেই কলম লুকিয়ে শুধু শুধু আমাদের বকা শুনিয়েছে।

খােকা তখন থতমত খেয়ে, আমতা আমতা করতে লাগল। খােকার অবস্থা দেখে আমার খুব কষ্ট হলাে। খােকার কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে খােকার মা বাজারের লিস্ট লেখেন আমাকে দিয়ে। বড়বােন রুমানা কখনাে আমাকে দিয়ে বন্ধুর কাছে চিঠি লেখে । এভাবে বছর গড়িয়ে খােকার এসএসসি পরীক্ষা এলাে। খােকা আমাকে দিয়ে একে একে তার সমস্ত পরীক্ষার উত্তর লিখল। তারপর আমি বেশ কিছুদিন খােকার টেবিলে অলস পড়ে থাকলাম। খােকার পড়ালেখা নেই, আমার ব্যবহারও তাই বন্ধ। এসএসসি পরীক্ষায় থােকা খুব ভালাে ফল করল।

আরো পড়ুন : আমার শৈশবস্মৃতি

পুরাে স্কুলের মধ্যে প্রথম হয়েছে খােকা। সবাই আনন্দে আত্মহারা। রুমানা বলল ‘খােকা, এটা তাের লাকি পেন। তাের সাফল্যের কিছু কৃতিত্ব এই কলমটাকে দেওয়া উচিত।’ শুনে আমার কী যে আনন্দ হল। একদিন বিকেলে খােকার মা চিঠি লেখার জন্য আমাকে চেয়ে নিয়ে গেলেন। চিঠি লেখার পর তিনি আমাকে রেখে দিলেন টেবিলের ওপর। খােকার তিন বছরের ছােটবােন আমাকে হাতড়ে নিয়ে প্রথমে মুখে দিল। ঢাকনাটা খুলে ফেলে দিল একদিকে। তারপর ঘরের পাকা মেঝেতে ইচ্ছেমতাে ঘষল।

আরো পড়ুন :   তরুলতা সহজেই তরুলতা পশুপাখি সহজেই পশুপাখি কিন্তু মানুষ প্রাণপণ চেষ্টায় তবে মানুষ

আমার লেখার নিব ভোঁতা হয়ে দুমড়ে মুচড়ে গেল। শুধু তাই নয়, একসময় সে মুখে পুরে শক্ত দাঁতে কামড় দিয়ে ভেঙে ফেলল আমার দেহখানি। আমি খুব ব্যথা পেয়েছি। আমাকে এভাবে ভেঙে ফেলতে খােকার বুক যেন চুরমার হয়ে গেল। আমার এরকম পরিণতিতে খােকা কেঁদে ফেলল। এখন আমি থােকাদের ময়লা ফেলার ঝুড়িতে পড়ে আছি। আমার শরীরের বিভিন্ন অংশ টুকরাে টুকরাে অবস্থায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ঢাকনাটা অবশ্য এখনাে খাটের পায়ার কাছে।

কিছুক্ষণ পর হয়তাে কাজের মেয়েটা অন্য ময়লার সাথে আমাকেও ফেলে আসবে রাস্তার পাশে ডাস্টবিনে। এভাবে আমার মূল্যবান জীবনের অবসান হবে। তবু, বলতে পারি আমার জীবন ব্যর্থ হয়নি। তিন বছরের বেশি সময় ধরে আমি বাসা, মায়া-মমতা পেয়েছি। পেয়েছি লাকি পেন’ হওয়ার সম্মান। আমি খােকার বুকপকেটে নিত্যসঙ্গী হয়ে ছিলাম। আমার দুঃখে একটি মানুষ যে চোখের জল ফেলেছে এতেই আমি ধন্য।

আরো পড়ুন

আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে

Bcs Preparation

যেখানে দেখিবে ছাই উড়াইয়া দেখ তাই পাইলেও পাইতে পারাে অমূল্য রতন

Bcs Preparation

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

Bcs Preparation